• আজ বুধবার, ২০ আশ্বিন, ১৪২৯ ৷ ৫ অক্টোবর, ২০২২ ৷

যাত্রীতে ঠাসা ১৪ লঞ্চ বরিশালে, ভাড়া আগের মতোই


❏ শুক্রবার, জুলাই ৮, ২০২২ প্রধান খবর

সময়ের কন্ঠস্বর ডেস্ক: শুক্রবার ভোররাত সা‌ড়ে ৩টা ছুঁই ছুঁই। ঘটনাস্থল ব‌রিশাল নৌবন্দর। কীর্তন‌খোলার দূ‌রে তখন আলোর ছটা। সময় যতো গড়া‌চ্ছে আলো ততো স্পষ্ট হ‌চ্ছে।

মাত্র ১৫ মি‌নি‌টের ব্যবধা‌নে বন্দ‌রে ভিড়‌তে শুরু করল যাত্রীবা‌হী লঞ্চ। ল‌ঞ্চে ঘরমু‌খো যাত্রী।

ঠাসাঠা‌সি ক‌রে সবাই ঢাকা থে‌কে বা‌ড়ি ফির‌ছেন। ডে‌কে যাত্রী, কে‌বি‌নের ফাঁকে যাত্রী, ল‌ঞ্চের সাম‌নে যাত্রী, এম‌নকি ল‌ঞ্চের ছা‌দের যাত্রী হ‌য়ে ফি‌রে‌ছেন নাড়ির টা‌নে গ্রা‌মে। এক‌টি দু‌টো নয়, একে একে ১৪টি লঞ্চ শুক্রবার ভোররা‌তে ঢাকা থে‌কে ব‌রিশাল নৌবন্দ‌রে নোঙর ক‌রে‌ছে।

ভো‌রের আলো ফোটার আগেই যাত্রী না‌মি‌য়ে খা‌লি লঞ্চগুলো ঢাকার উদ্দে‌শে ব‌রিশাল নৌবন্দর ত্যাগ ক‌রে‌ছে। বরিশাল নদীবন্দরে ঢাকা-বরিশাল সরাসরি রুটে ১০টি লঞ্চ এসেছে। এছাড়া চারটি ভায়া লঞ্চ নদী বন্দরে যাত্রী নামিয়েছে।

সরাস‌রি যাত্রী প‌রিবহ‌নে ঈদের বি‌শেষ সা‌র্ভি‌সে থাকা লঞ্চগুলো হলো- এমভি মানামী, সুরভী-৭, সুরভী-৯, পারাবত-৯, পারাবত-১২, সুন্দরবন-১১, কুয়াকাটা-২, এ্যাডভেঞ্জার-৯, এ্যাডভেঞ্জার-১ এবং কীর্তনখোলা-২।

পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর থেকে ঢাকা-বরিশাল নৌরুটে লঞ্চযাত্রী প্রায় ১০ ভাগের একভাগে নেমে এসেছিল। আর যাত্রী ধরে রাখতে লঞ্চ কর্তৃপক্ষও ভাড়া কমিয়েছিল। কিন্তু আজ ভোররাতে ঢাকা থেকে বরিশালে পৌঁছানো লঞ্চগুলোর যাত্রীও কমেনি, ভাড়াও কমেনি। লঞ্চের বেশ কয়েকজন যাত্রী জানান, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর থেকে কম ভাড়ায় যাত্রী তুলছিল লঞ্চ কর্তৃপক্ষ। কিন্তু ঈদ উপলক্ষে ভাড়া আগের মতোই রাখা হয়েছে- ডেকে ভাড়া ৩৫০ টাকা, ডাবল কেবিন ২৫শ এবং সিঙ্গেল ১৪শ টাকা।

এছাড়া গত দুই বছর ধরে যাত্রীদের দুর্ভোগ লাঘবে লঞ্চঘাট থেকে নথুল্লাবাদ বাস টার্মিনাল ও রুপাতলী বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত মেয়রের পক্ষ থেকে ফ্রি বাস সার্ভিসের ব্যবস্থা ছিল। কিন্তু এবার ঈদুল আজহায় মেয়রের ফ্রি বাস সার্ভিস না থাকায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায়সহ নানা ধরনের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে যাত্রীদের।

সরেজমিনে আজ শুক্রবার ভোররাতে লঞ্চঘাটের গিয়ে দেখা যায়, রাত আড়াইটা থেকে একে একে লঞ্চ বরিশাল টার্মিনালে ভিড়ছে। সরাসরি ১০টি এবং ভাড়া রুটের চারটি ও সরকারি একটি লঞ্চ ভোর সাড়ে ৪টার মধ্যে ঘাটে এসে ভেড়ে। পদ্মা সেতু চালুর আগে ঈদ ও কোরবানিতে যাত্রীর যেমন চাপ ছিল, তেমনটাই দেখা গেছে লঞ্চগুলোতে।

নৌপ‌থে যাত্রী‌দের ঘ‌রে ফেরা
শুক্রবার নৌবন্দ‌রে ঘরমু‌খো অন্তত ১০ জন যাত্রীর স‌ঙ্গে সাংবা‌দিক‌দের কথা হ‌য়ে‌ছে। তারা জানান, ঢাকা থেকে লঞ্চগুলো কানায় কানায় যাত্রী পূর্ণ করে নির্দিষ্ট সম‌য়ের আগেই রাজধানীর সদরঘাট ত্যাগ করে। ‌যে যেভা‌বে পে‌রে‌ছেন লঞ্চ উঠে প‌ড়ে‌ছেন। তা‌দের একটাই উদ্দেশ্য ছিল, যেভা‌বেই হোক বা‌ড়ি ফির‌তে হ‌বে।

কোনো লঞ্চ অতি‌রিক্ত যাত্রী প‌রিবহ‌নের ব্যাপা‌রে বিআইডব্লিউটিএ’র নির্দেশনা মানেনি। লঞ্চগুলো ছিল যাত্রীতে ঠাসা। প্রতিটি লঞ্চের ধারণক্ষমতা এক হাজারের ঊর্ধ্বে থাকলেও তারা দুই থেকে আড়াই গুণ বেশি যাত্রী নিয়ে বরিশালে পৌঁছায়।

কয়েকজন যাত্রী বলেন, আজ শুক্রবার ও আগামীকাল শনিবার থেকে নৌপথে ভিড় আরও বেড়ে যাবে। তখন যদি নৌযানগুলোকে অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন থেকে বিরত না করা যায়, তবে যেকোনো মুহূর্তে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা বাড়বে। এ জন্য নৌবন্দরগুলোতে স্থানীয় প্রশাসন ও বিআইডব্লিউটিএ’র নজরদারি কঠোর করা প্রয়োজন।

ঘরমু‌খো যাত্রীরা যা বল‌লেন
পারাবাত-১২ লঞ্চে আসা যাত্রী মোবারক হোসেন বলেন, সব কটি লঞ্চই ঢাকা সদরঘাট ছাড়ার সময় ছিল যাত্রীতে ঠাসা। কিন্তু কিছু করার নেই। ভোগান্তি হয়েছে, তবু স্বস্তি যে বাড়িতে ফিরতে পেরেছি। কিন্তু সামনে দিন যত যাবে, ভিড় আরও বাড়বে। এমন পরিস্থিতি সামাল দিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কঠোর নজরদারি থাকা উচিত।

সুন্দরবন-১১ লঞ্চের যাত্রী ক‌হিনুর বেগম বলেন, লঞ্চে অনেক ভিড় ছিল। দম ফেলার মতো অবস্থা ছিল না। ওয়াশরু‌মে যে‌তে দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁ‌ড়ি‌য়ে থাক‌তে হ‌য়ে‌ছে। তবু হাজারো কষ্টের পর ঈদে বাড়িতে স্বজনদের সঙ্গে মিলতে পারবো, এটাই আপাতত স্বস্তি। যাত্রাপথের কষ্ট-ভোগান্তি মনে করে সেই আনন্দ ম্লান করতে চাই না।

কুয়াকাটা-২ লঞ্চের যাত্রী মানিক হো‌সেন বলেন, আমার মনে হয় ধারণক্ষমতার তিনগুণ বেশি যাত্রী নিয়ে লঞ্চ এসেছে। অনেক যাত্রী বসার জায়গায়ও পাননি। সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়েছে। সুরভী-৭ লঞ্চে যাত্রী ইকবাল হোসেন বলেন, লঞ্চটির ছাদেও অনেক যাত্রী ছিল।

কোতোয়ালি মডেল থানার ও‌সি (তদন্ত) লোকমান হোসেন বলেন, যাত্রীরা যেন হয়রানির শিকার না হন এবং নিরাপত্তা নিশ্চিতে পর্যাপ্ত পুলিশ নদীবন্দরে মোতায়েন করা হয়েছে। এছাড়া মোবাইল টিম দায়িত্ব পালন করছে। স্পেশাল সার্ভিসের প্রথম দিনেই যাত্রীপূর্ণ হয়ে প্রত্যেকটি লঞ্চ বরিশাল নদী বন্দরে এসেছে।

আবার বাড়‌ল লঞ্চ ভাড়া
এ্যাডভেঞ্জার-১ লঞ্চের যাত্রী হোসনেয়ারা বেগম বলেন, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর কম ভাড়ায় কয়েকদিন যাত্রী এনেছিল। এখন আবার সেই আগের ভাড়া আদায় করছে। ডেকে ৩৫০ টাকা করে ভাড়া আদায় করেছে।

সুন্দরবন-১১ লঞ্চের যাত্রী মনির হোসেন বলেন, সুন্দরবন ছাড়াও প্রায় সবগুলো লঞ্চের যাত্রী ছিল আগের ঈদের মতোই। ছাদও ছিল পরিপূর্ণ। ডাবল কেবিন দুই হাজার ৪০০, সিঙ্গেল এক হাজার ৪০০ টাকা করে ভাড়া নিয়েছে। তারপরও বেশ চাপ ছিল যাত্রীর।

কর্তৃপক্ষ যা বল‌ছে
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক বিভাগের ব্যবস্থাপনার পরিদর্শক কবির হোসেন। তি‌নি বলেন, ঈদের বিশেষ সার্ভিসের প্রথম দিন ভায়াসহ প্রায় ১৪টি লঞ্চ ঢাকা থেকে বরিশাল এসেছে। প্রতি লঞ্চে ছিল গড়ে আড়াই থেকে তিন হাজার যাত্রী।

অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, লঞ্চগুলো যাতে অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ছাড়তে না পারে, সে জন্য ঢাকা নদীবন্দর কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা রয়েছে। দরকার হলে ডাবল ট্রিপ দেবে। তবু অতিরিক্ত যাত্রী পরিবহন করা যাবে না। অতিরিক্ত যাত্রী নিলে সেসব লঞ্চকে জরিমানা গুণতে হবে।

‌তি‌নি আ‌রো ব‌লেন, পদ্মা সেতু উদ্বোধনের পর যাত্রী সংকটে পড়তে পারে লঞ্চ- এমন শঙ্কা ছিল। সে কার‌ণে আমা‌দের তেমন একটা প্রস্তু‌তি ছিল না। তবে প্রথম দিন লঞ্চগুলো কিছু অতিরিক্ত যাত্রী নিয়ে ফিরলেও যাত্রীদের কাছ থেকে কোনো ধরনের অভিযোগ পাওয়া যায়নি। মানুষ স্বাচ্ছন্দ্যে ফিরছেন। আমরা সব সময় বন্দরে তদারকিতে ছিলাম।

মেয়রের ফ্রি বাস নেই, যানজটেও ভোগান্তি
এদিকে, লঞ্চঘাট ও তার সামনের প্রধান সড়কে ছোট যানবাহনগুলো যত্রতত্র রাখার ফলে ঘুমকাতুরে লঞ্চযাত্রীদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়। গন্তব্যে পৌঁছানোর গাড়ি পেলেও যানজটের কারণে ঘণ্টাখানেক বিরক্তিকর অবস্থায় বসে থাকতে হয়েছে যাত্রীদের। গুণতে হয়েছে অতিরিক্ত ভাড়া। গত দুই বছরে বরিশাল সিটি করপোরেশনের মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আবদুল্লার দেওয়া ফ্রি বাস সার্ভিস থাকায় তেমন একটা দুর্ভোগ পোহাতে হয়নি। এ ঈদে সে ব্যবস্থা না থাকায় নাড়ির টানে বাড়ি আসা মানুষগুলোর ভোগান্তির শেষ নেই।

এ্যাডভেঞ্চার-৯ লঞ্চের যাত্রী মিরাজ মাহমুদ বলেন, বাড়ি আসার জন্য পরিবার-পরিজন নিয়ে ঢাকার তিন ঘণ্টা যানজট ঠেলে দুপুর ১টার মধ্যে লঞ্চে উঠি। আর লঞ্চ ছাড়ে রাত সাড়ে ৮টায়। এখন বাজে রাত ৩টা। ঘাটে ভেড়ানোর আগেই যাত্রীদের ঘুম থেকে তুলে দিয়েছে। বরিশালে ঘাটে নামিয়ে দিয়ে লঞ্চ আবার ঢাকায় ফিরে যাচ্ছে। লঞ্চঘাট থেকে বেরিয়ে রাস্তায় দেখা যায় চরম বিশৃঙ্খলতা। মাহেন্দ্র, রিকশা, ব্যাটারিচালিত রিকশাসহ গণপরিবহনগুলো রাস্তা দখলে রেখেছে।

ঝালকাঠীর বাসিন্দা ও সুন্দরবন-১১ লঞ্চের যাত্রী তাসলিমা বেগম বলেন, আগে মেয়রের দেওয়া বাস সার্ভিসের কারণে আমদের তেমন একটা বেগ পেতে হয়নি। এ বছর না থাকার কারণে ১০ টাকা ভাড়ার পথ ৫০ টাকায় যেতে হচ্ছে।

বিএমপির ট্রাফিক এডিসি শেখ মো. সেলিম জানান, ঈদযাত্রা ও ঘরমুখো মানুষের নিরাপত্তায় শুধু নৌবন্দর এলাকা নয়, গোটা বরিশাল নগরজুড়ে নেয়া হয়েছে বাড়তি নিরাপত্তাব্যবস্থা।