🕓 সংবাদ শিরোনাম

গাছ থেকে যুবকের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার * পবিত্র ঈদে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে ইসলামিক ফাউন্ডেশনের পক্ষকালব্যাপী অনুষ্ঠানমালা * যে সংবাদের শিরোনামে ‘বিব্রত’ সময়ের কণ্ঠস্বর ! * গিনেস রেকর্ডে ফের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করলেন ঠাকুরগাঁওয়ের রাসেল * অনিশ্চয়তার বেড়াজাল পেরিয়ে অবশেষে ঢাকা আসছেন ‘ড্যান্স কুইন’ নোরা ফাতেহি * বাসের ধাক্কায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত * বড়দের সামনে সিগারেট খাওয়া নিয়ে দ্বন্দে কয়েকদফা সংঘর্ষ, আহত ১১ জন * বগুড়ায় ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে সাবেক সেনা সদস্য খুন * পণ্ড বিয়ের আয়োজন, বর গেলো শ্রীঘরে, অর্থদণ্ড হলো কনের বাবার * মসজিদে নামাজরত অবস্থায় যুবককে ছুরিকাঘাত, হামলাকারী গ্রেপ্তার *

  • আজ শনিবার, ২৩ আশ্বিন, ১৪২৯ ৷ ৮ অক্টোবর, ২০২২ ৷

কক্সবাজারে অনলাইন জুয়াড়ির ফাঁদ, নিঃস্ব তরুণ থেকে বৃদ্ধ

Cox's Bazar news
❏ বৃহস্পতিবার, জুলাই ২১, ২০২২ চট্টগ্রাম

শাহীন মাহমুদ রাসেল, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট (কক্সবাজার): নেই খেলার সরঞ্জাম। দরকার হয় না নির্দিষ্ট সময়। ২৪ ঘণ্টাই চলে জুয়ার কারবার। যেখানে-সেখানে বসেই অনলাইনে খেলা যায় বেটিং বা গ্যাম্বলিং নামের এই জুয়া। নির্দিষ্ট ওয়েবসাইটে গোপন লিংকে চলা এই জুয়া অনলাইন ক্যাসিনো নামে পরিচিত।

কক্সবাজার শহর কেন্দ্রিক একটি সিন্ডিকেট বেট- ৩৬৫, টি-২১ এবং পি২৪ নামের অনলাইন গ্যাম্বলিং সাইট দিয়ে ভয়ংকর কারবার চালিয়ে যাচ্ছেন। আর এসব জুয়া খেলায় বাজিতে হেরে নিঃস্ব এবং মনোকষ্টে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে অনেকে।

প্রত্যন্ত অঞ্চলে কিভাবে ছড়িয়ে পড়লো অনলাইন জুয়া। কারা এর সঙ্গে জড়িত। জড়িয়ে পড়ছে কোন শ্রেণির মানুষ। এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে মিলেছে চাঞ্চলকর তথ্য। অনুসন্ধানে মিলেছে, তরুণ থেকে বৃদ্ধ, অক্ষর-নিরক্ষর সবাই জড়িয়েছে অনলাইন জুয়ার জালে। অল্প ব্যয়ে দ্রুত আয়ের কারণে জনপ্রিয়ও হচ্ছে বেশ। যদিও অতি লোভে তাতি নষ্টের মত ঘটনাও আছে। নিঃস্ব হয়েছেন অনেকেই। ৫০০ টাকার বিনিময়ে খোলা হয় আইডি। এরপর বিভিন্ন প্লাটফর্মে চলে জুয়ার রমরমা আসর।

আইপিএল, বিপিএল কিংবা আন্তর্জাতিক খেলা ঘিরে বাড়তে থাকে জুয়ায় বিটের পরিমান। ডিজিটাল যুগে যে কোন সময়ে এই খেলায় অংশগ্রহণ করা যাচ্ছে। ফলে পিত-মাতাও জানতে পারছে না নিজ সন্তানেরা কখন এসব কাজে জড়িত হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন অংকের টাকা, মোবাইল, মোটর সাইকেলসহ বিভিন্ন মূল্যবান জিনিস বাজিতে রেখে হেরে যাওয়ায় নিঃস্ব হচ্ছে অনেক পরিবার। সুযোগ বুঝে কারবার করছেন বাকীতেও। আর এইসব টাকা দিতে দেরি হলে বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্টান তালাবদ্ধ করে দেওয়ার ঘটনাও ঘটছে অহরহ।

শুধু তরুণ-বৃদ্ধ নয়, কক্সবাজারের শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা অনলাইন জুয়ার আসরে ঝুঁকে পড়েছে। জুয়া খেলার একটি বিদেশী অ্যাপস এর মাধ্যমে ডলার কিনে বড় বড় মাদক ব্যবসায়ী ও বিভিন্ন এলাকার উঠতি বয়সি ছেলেদের এই খেলায় অংশ গ্রহণ করতে উৎসাহ প্রদান করছে। আর ইদ্রিস নামের একজন পুরাতন রোহিঙ্গা প্রধান হিসেবে চক্রটি নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।

সূত্র জানিয়েছে, অনলাইনে জুয়া খেলার জন্য ইংল্যান্ডের একটি অ্যাপস যার নাম ইবঃ৩৬৫ (বেট৩৬৫) তা ব্যবহার করা হয়। এছাড়াও জুয়া খেলার দেশী অ্যাপস নাইন এক্সচেঞ্জ ব্যবহার করে খেলা চলছে হরদম। খেলায় অংশগ্রহণ করে হার জিতে যত টাকার বাজি ধরা হয় তার দ্বিগুণ হতে ৫ গুণ টাকা লাভ ক্ষতি হয়। যারা জিতে যায় তারা আরো বেশী পরিমাণ জুয়ার নেশায় মেতে উঠে আর যারা হেরে যায় তারা ক্ষতি পুষিয়ে নিতে খেলা চালিয়ে থাকে। এই অ্যাপসটি বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এই খেলায় বিদেশীরা বাংলাদেশী এজেন্ট ঠিক করে রেখেছে।

কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ইদ্রিসসহ এদের বেশ কয়েকজন মূল সিন্ডিকেটটি নিয়ন্ত্রক আছে। এরা আবার বিভিন্ন উপজেলার এজেন্ট ঠিক করে বেট৩৬৫ নামক অ্যপস দিয়ে জুয়া খেলার একাউন্ট খুলে রেখেছে। এরা আবার পুনরায় শহর বা ইউনিয়ন পর্যায়ে এজেন্ট ঠিক করে খেলা পরিচালনা করে আসছে। এই অ্যাপস এর একাউন্টে লক্ষ লক্ষ ডলার জমা থাকে বলে জানা গেছে। এভাবে অনলাইনে জুয়ার খেলার কারণে নিরবেই কোটি কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। ফলে সরকার অর্থনৈতিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কক্সবাজার শহর ও বাস টার্মিনাল কেন্দ্রিক অনলাইন জুয়ার মূল হোতা যিনি আছে তার নাম রোহিঙ্গা ইদ্রিস। সে শহরের প্রবেশ পথ লারপাড়া এলাকায় নিজ বাড়িতে বসে পরিচালনা করে আসছে জুয়ার কারবার। এই ইদ্রিসেরই এজেন্ট রয়েছে বেশ কিছু মাদক ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ। সে চার বছর আগে বীচে ঝিনুক বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতো। বর্তমানে সে এই জুয়ার কারবার করে প্রায় কয়েক কোটি টাকার মালিক বলে জানা গেছে। সে আবার তার অধিনস্থ বেশ কয়েক জনকে এই খেলায় এজেন্ট হিসেবে রেখেছে। এই ইদ্রিস ইন্টারন্যাশনাল পর্যায়ের জুয়াড়ী। তার অনলাইন আ্যাপস এ সবসময় ৪০-৫০ হাজার ডলার রিজার্ভ থাকে। এলাকার ছোট বড় জুয়াড়ীদের বিকাশের মাধ্যমে টাকা পরিশোধ করে থাকে।

গত কিছুদিন আগে রুবেল নামের এক সেলুন ব্যবসায়ী ইদ্রিসের মাধ্যমে বাকিতে জুয়া খেলে বাজিতে হেরে যায়। রুবেলের অভিযোগ, নিয়মিত ইদ্রিসের মাধ্যমে বিভিন্ন খেলার জুয়ায় বাজি ধরেন। ওইদিন টাকা দিতে দেরি হওয়ায় ইদ্রিস তার দোকান তালা বদ্ধ করে দেয়। রুবেল ধার দেনা করে হেরে যাওয়া বাজির টাকা ফেরত দিলে দোকানের চাবি ফেরত দেন। রুবেলের দাবী, ইদ্রিসের কাছে তিনি আইপিএল চলাকালে কমপক্ষে কয়েক লাখ টাকা বাজিতে হেরেছেন।

গত ২৯ মে আইপিএলের ফাইনাল খেলা অনুষ্ঠিত হয়। ৬দিন পর ৫জুন সকালে পূর্ব লারপাড়া এলাকার মোজাম্মেল নামের এক যুবকের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। স্থানীয়দের দাবি, ইয়াবা ব্যবসায়ী মোজাম্মেল ইদ্রিসের মাধ্যমে আইপিএল ক্রিকেট জুয়া খেলায় বহু টাকা হেরে যায়, পাওনাদারদের চাপের মুখে আত্মহত্যা করেছেন তিনি।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বছর কয়েক আগে কুমিল্লা থেকে কক্সবাজার সদরের লারপাড়া এলাকায় আসেন ফারুক হোসেন নামের এক বেডশিট ব্যবসায়ী। সেখানে এসে আইপিএল ও ক্রিকেট জুয়া খেলায় আসক্ত হয়ে পড়েন তিনি। সম্প্রতি সে জুয়ায় প্রায় ১০ লাখ টাকা হেরে যায়। পরে বাকী টাকার জন্য ইদ্রিসের চাপের মুখে পড়ে ব্যবসায়ী ফারুক নিরুদ্দেশ হয়ে যান।

এভাবে করে হাজার হাজার যুবক, ছাত্র, মাদক ব্যবসায়ী রোহিঙ্গা ইদ্রিসের কাছে লাখ লাখ টাকা বাজিতে হেরে নিঃস্ব হয়ে যান বলে দাবী স্থানীয় সচেতন মহলের। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, জুয়ার প্রকোপ বন্ধ করা না গেলে রসাতলে যাবে তরুণ প্রজন্ম।

তাদের দাবী, প্রায় ৪-৫ বছর ধরে দৃশ্যমান কোন ব্যবসা ছাড়া শুধু মাত্র এই অনলাইন জুয়ার কারবার করে রোহিঙ্গা ইদ্রিস এখন অঢেল সম্পদের মালিক হয়ে যান। এই খেলায় তরুণ-বৃদ্ধরা ৫০০-৫০০০ টাকা বাজি ধরছে। আবার শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা ২ লাখ হতে শুরু করে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বাজি ধরে খেলায় অংশ গ্রহণ করছে। ক্রিকেট খেলায় বল, ওভার, খেলোয়াড় ও ম্যাচ ভিত্তিক বাজি লাগান। তবে পুরো জুয়ার সিন্ডিকেটটি পরিচালনা করছে ইদ্রিস। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর হতে গভীর রাত পর্যন্ত তার বাড়িতে বসে মোবাইলে জুয়া খেলার বাজিগরদের নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি।

পূর্ব লারপাড়া কেন্দ্রিয় জামে মসজিদের সভাপতি জয়নাল আবেদিন লাভলু বলেন, এই চক্র দীর্ঘদিন ধরে লারপাড়া বসে পুরো জেলায় অবৈধভাবে অনলাইন ক্যাসিনো জুয়া পরিচালনা করছে। তারা বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের কাছ থেকে প্রচুর টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে। আর এই চক্রের ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হয়ে মানসিকভাবে ভেঙ্গে পড়ে আত্মহননের পথ বেছে নিচ্ছেন অনেকে। অনলাইনে বেটিং বা জুয়ার কারবারে বিদেশে অর্থপাচারের পাশাপাশি সাইবার সিকিউরিটিও ঝুঁকির মুখে পড়েছে। তিনি প্রশাসনের হস্থক্ষেপ কামনা করেছেন।

এবিষয়ে জানতে ইদ্রিসের সাথে যোগাযোগ করা হলে এইসব তিনি কিছুই জানেন না বলে অস্বীকার করেন। পরে স্থানীয়দের দেওয়া বিভিন্ন তথ্যগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে মাঝেমধ্যে টুকটাক অনলাইনে নিজেই খেলেন বলে ইদ্রিস স্বীকার করেন। এসময় তিনি নিজেকে সৈকতের ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচয় দিয়ে জায়গা সম্পত্তির কারণে তার শ্বশুর বাড়ির লোকজন তার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করছেন বলে ইদ্রিস দাবী করেন।

এই বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো: রফিকুল ইসলাম বলেন, জেলায় সক্রিয় অনলাইন ক্যাসিনো, ফুটবল-ক্রিকেটসহ বিভিন্ন খেলার সময় বাজি ধরা এবং ওই সব খেলার আদলেই যেসব অনলাইন জুয়ার কারবারী শুণ্য থেকে কোটিপতি হয়েছে তাদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ ও নজরদারী শুরু করেছে। অনলাইন ক্যাসিনো জুয়ায় হোতাসহ তাদের শেল্টার দাতাদের বিষয়ে খোঁজ নেয়া হচ্ছে এবং জঙ্গী সংগঠনের অর্থায়নে এই অনলাইন ক্যাসিনো জুয়ায় হোতাদের মাধ্যমে লেনদেন হচ্ছে কি-না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। যাদেরই গ্রেফতার করা হবে তাদের সহযোগিদের এই সাইবার ক্রাইমের আইনের আওতায় আনা হবে।