🕓 সংবাদ শিরোনাম
  • আজ রবিবার, ১৭ আশ্বিন, ১৪২৯ ৷ ২ অক্টোবর, ২০২২ ৷

‘সি ইজ ডেড’: সিনেমাকেও হার মানালো যে প্রেম!

Sherpur News
❏ রবিবার, জুলাই ৩১, ২০২২ ময়মনসিংহ

মিজানুর রহমান, শেরপুর জেলা প্রতিনিধি: দশম শ্রেণি পড়ুয়া সনাতন ও মুসলিম ধর্মাবলম্বী প্রেমিক যুগলের ফেসবুকে প্রেমের পর অভিনব গল্প বানিয়ে বিয়ের ঘটনা হার মানিয়েছে সিনেমাকেও। প্রায় আট মাসের প্রেমকে শুধু গল্পই বানায়নি তারা, রীতিমতো আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ঘুম হারাম করে ঝড় তুলেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ গণমাধ্যমেও। ‘সি ইজ ডেট’ শিরোনামে ভাইরাল হওয়া এ গল্পের শুরু শেরপুরের নালিতাবাড়ী উপজেলার ভটপুর গ্রাম ও গাজিপুরের হোতাপাড়া থেকে। ভটপুরের সনাতন ধর্মাবলম্বী এক কৃষক পরিবারের দশম শ্রেণি পড়ুয়া ছাত্রী কন্যা ধর্মান্তরিত তাবাচ্ছুম মৃধা ও গাজিপুরের হোতাপাড়া এলাকার একটি সিরামিক কারখানা শ্রমিক ও দশম শ্রেণি পড়ুয়া যুবক মাহদি মৃধা রানাকে ঘিরে এ গল্প।

ঘটনার শুরু প্রায় আট মাস আগে। রাইফা নামে নবম শ্রেণি পড়ুয়া এক বালিকার সাথে ফেসবুকে পরিচয় ও যোগাযোগ। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই অনলাইন মার্কেটিং করতো নালিতাবাড়ীর ভটপুর গ্রামের সনাতন ধর্মাবলম্বী বালিকা ও আন্দারুপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাবাচ্ছুম মৃধা (বর্তমান নাম)। সে সুবাদে রাইফার মিউচ্যুয়াল ফ্রেন্ড হিসেবে সামনে পেয়ে তাবাচ্ছুমের ব্যবহৃত ‘অনুরাধা সেন’ নামে ফেসবুক আইডিতে ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠায় মাহদি মৃধা। রিকুয়েস্ট গ্রহণ করার পর মাহদি ও তাবাচ্ছুম এর মাঝে যোগাযোগ শুরু। একপর্যায়ে প্রেমের গল্প গড়ে উঠে দু’জনার মাঝে। ম্যাসেঞ্জার ও মোবাইল ফোনসহ ভার্চুয়াল মাধ্যমে দু’জনের মাঝে গভীরতা বাড়ে।

২৪ জুলাই রোববার তাবাচ্ছুম এর শিখিয়ে দেওয়া কথামতো গল্প তৈরি করে মাহদি। মাহদি তার মোবাইল নাম্বার থেকে তাবাচ্ছুম এর মায়ের ফোনে কল করে। বলা হয়, ‘স্থানীয় এমপির পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের জন্য স্কুলে বৃত্তির টাকা দেওয়া হচ্ছে। তাবাচ্ছুমকে বিদ্যালয়ে পাঠাতে হবে। তাই বাড়ি থেকে তাবাচ্ছুমকে আন্দারুপাড়া উচ্চ বিদ্যালয়ে আসতে দেওয়া হয়। ঘটনা সকাল দশটার দিকে। তাবাচ্ছুম বিদ্যালয়ে এলেও ফিরে যায়নি বাড়িতে। দিনভর না আসার একপর্যায়ে খোঁজাখুঁজি। পরদিন পর্যন্ত তাবাচ্ছুম এর সন্ধান মেলেনি। ফোনে বারবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয় তার পরিবার। একপর্যায়ে তার বাবা কোটেশ্বর বর্মণ সোমবার রাতে নালিতাবাড়ী থানায় সাধারণ ডায়েরি করে। শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। কিন্তু সাড়া পাচ্ছিল না কেউ।

একপর্যায়ে মঙ্গলবার (২৬ জুলাই) ‘অনুরাধা সেন’ নামে ফেসবুক আইডিতে (তাবাচ্ছুম এর আইডি) তাবাচ্ছুম এর মুখ বাঁধা মৃত লাশের মতো পড়ে থাকা একটি ছবি আপলোড করা হয়। সেখানে বলা হয়, ‘না খুঁজলেই ভালো। খুঁজেও লাভ হবে না। সি ইজ ডেড।’ এ পোস্ট দেখে তাবাচ্ছুম এর পরিবারের পক্ষ থেকে ওই আইডতে কল করা হয়। তখন দুইজন পুরুষের কণ্ঠ শোনা যায়। ৪৯ সেকেন্ডের কথায় সেখান থেকে বলা হয়, ‘আমার বান্ধবী আর বেঁচে নেই।’ এরপর ওই আইডিও ডিএ্যাক্টিভ করে দেওয়া হয়।

এরপরই শুরু হয় তোলপাড়। দুঃশ্চিন্তায় ভেঙে পড়ে তাবাচ্ছুম এর পরিবার। মুখ বাঁধা মৃত লাশের মতো পড়ে থাকা ছবি ছড়িয়ে যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ঝর ওঠে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী থেকে সর্বত্র। অনিশ্চয়তায় পড়ে যান সকলেই।

অপরদিকে ঘটনার দিন ২৪ জুলাই বিকেল চারটার দিকে তাবাচ্ছুম পৌছে যায় গাজিপুরে। মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করে মিলিত হয় মাহদি ও তাবাচ্ছুম। ভালোবাসার টানে পরিকল্পনামাফিক তাবাচ্ছুমকে মাহদি নিয়ে যায় তার বাসায়। প্রথমে পরিবারের লোকজন সম্মত না হলেও একপর্যায়ে উভয়ের বিয়ে দিতে সম্মত হয়। সোমবার গাজিপুরের আদালতে গিয়ে এফিডেভিট করে সনাতন ধর্ম পাল্টে মুসলিম হয় তাবাচ্ছুম। এরপর তারা বিয়ে করে সোমবার থেকেই সংসার জীবন শুরু করে।

এদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ গণমাধ্যমে অপহরণের পর হত্যা’র খবর ছড়িয়ে পড়লে থানা পুলিশ হন্য হয়ে মাঠে নামে। তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার করে পুলিশের একটি দল চলে যায় গাজিপুরে। ২৯ জুলাই শুক্রবার রাত থেকে ৩০ জুলাই শনিবার দুপুর পর্যন্ত তারা গাজিপুরে অভিযান অব্যাহত রাখে। বেলা দুইটার দিকে প্রথমে বাড়ি পৌছে উদ্ধার করে তাবাচ্ছুমকে। এর কিছুক্ষণ পর বাড়ির কাছ থেকেই আটক করে মাহদিকে। রাতে আনা হয় নালিতাবাড়ী থানায়। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে উঠে আসে রোমাঞ্চকর প্রেমের পুরো ঘটনা। তবে গল্পের রচয়িতা হিসেবে উঠে আসে তাবাচ্ছুম এর নাম। অনেকটা সাদাসিদে টাইপের মাহদি প্রেম করে প্রেমিকাকে পাওয়ার জন্যই আবেগী। কিন্তু তাবাচ্ছুম এটিকে পরিণয়ে রূপান্তর করতে পুরো গল্প বানায়। তার শেখানো গল্পেই দু’জনের মিলে তৈরি করে ভিন্নধর্মী লাভ স্টোরি। বারবার জিজ্ঞাসাবাদেও নিজে এ পরিকল্পনার দায় নেয় তাবাচ্ছুম।