• আজ বৃহস্পতিবার, ১৬ অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ ৷ ১ ডিসেম্বর, ২০২২ ৷

মালয়েশিয়া থেকে দেশে সিংহ ভাগ রেমিট্যান্স যাচ্ছে হুন্ডিতে!

International news
❏ শুক্রবার, আগস্ট ৫, ২০২২ প্রবাসের কথা

আশরাফুল মামুন, মালয়েশিয়া প্রতিনিধি: বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসী রেমিট্যান্স এখন গুরুত্বপূর্ণ একটি খাত। প্রথমদিকে এটিকে হালকা ভাবে নিলেও এখন রেমিট্যান্স ছাড়া জিডিপির প্রবৃদ্ধি কল্পনার বাইরে। প্রতি বছরই রেমিট্যান্স প্রবাহের রেকর্ড তৈরী হচ্ছে। এটি যেমন নিঃসন্দেহে দেশের জন্য সুখকর তেমনি অশুভ ছায়ার প্রভাবও রয়েছে। প্রবাসীরা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে নায়কের ভূমিকায় থাকলেও খলনায়কের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে হুন্ডি ব্যবসায়ীরা। একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে বৈধ চ্যানেলে ৩৫ ভাগ রেমিট্যান্স আসলেও অবৈধ বা হুন্ডির মাধ্যমে আসছে ৬৫ ভাগ।

মাননীয় অর্থ মন্ত্রীর ধারণা ৪১ শতাংশ রেমিট্যান্স আসছে হুন্ডির মাধ্যমে। কিন্তু রেমিট্যান্স বিশেষজ্ঞদের মতে এই সংখ্যা আরো বেশি।

এতে করে সরকার যেমন রেমিট্যান্স প্রবাহের সঠিক পরিসংখ্যান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে তেমনি একজন প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা ও প্রাপ্য বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত। বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার মালয়েশিয়া। দেশটিতে চাকুরী, ব্যবসা, স্থায়ীভাবে বসবাস বা মাই সেকেন্ড হোম সহ যে সমস্ত অনূকূল সুযোগ সুবিধা রয়েছে যা বিশ্বের অন্য কোন দেশে নেই বাংলাদেশিদের জন্য। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স পাঠিয়ে বড় ভুমিকা রাখছে মালয়েশিয়া প্রবাসীরা।

কিন্তু প্রবাসীরা বৈধ পন্থায় অর্থ না পাঠিয়ে কেন হুন্ডির আশ্রয় নিচ্ছেন? এই অবৈধ কালো পথ থেকে প্রবাসীদের ফেরানোর উপায় কি? এসব প্রশ্নের উত্তর খোঁজতে প্রতিবেদক কুয়ালালামপুরের ব্যাংক, মানিট্রান্সফার, মানি এক্সচেঞ্জ, রেমিট্যান্স হাউজে প্রায় এক মাস সরজমিনে তথ্য সংগ্রহ করেছেন। রেমিট্যান্স সংশ্লিষ্ট সেন্টার গুলোতে গিয়ে প্রবাসীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে চমকপ্রদ তথ্য। হুন্ডি ব্যবসায়ীরা ঘরে বসে আবার কিছু কিছু এলাকায় প্রকাশ্যে অফিস খুলে নির্বিঘ্নে ব্যবসা করছে। শহরের আনাচে কানাচে হাতের নাগালেই রয়েছে হুন্ডি চক্র।

হুন্ডি ব্যবসায়ীদের বিষয়ে মালয়েশিয়ার সরকারের যেমন কোন অভিযান নেই তেমনি করে হুন্ডি ব্যবসায়ীদের নিয়ন্ত্রণে কোন দৃশ্যমান সচেতনতামূলক উদ্যেগ কখনো চোখে পড়েনি। বেশিরভাগ প্রবাসী ভালো করে জানেই না বৈধভাবে টাকা পাঠালে কি লাভ আর হুন্ডি তে টাকা পাঠালে কি ক্ষতি। তাদের সচেতন না করা গেলে কালো পথ থেকে ফেরানো সম্ভব নয়। বৈধপথে পাঠানো টাকার রেট থেকে হুন্ডি তে পাঠানো টাকার রেট সবসময় ১ টাকা বেশি প্রদান করে প্রবাসীদের প্রলুব্ধ করা হয়। সহজ সরল প্রবাসীরা নগদ লাভ টা আগে দেখে পিছনে কি সুবিধা সরকারের পক্ষ থেকে পাওয়া যাবে সে চিন্তা করে না।

তাছাড়া ব্যাংকের মাধ্যমে বৈধভাবে টাকা পাঠানোর কিছু জটিলতার চেয়ে হুন্ডি তে টাকা প্রেরণ খুবই সহজ। ব্যাংকে গিয়ে নিদিষ্ট ডকুমেন্টসসহ যাবতীয় তথ্য পূরণ করতে হয়। হুন্ডি তে ঘরে বসেই যে কোন মোবাইলের মাধ্যমে মুহুর্তে ই টাকা প্রেরণ করতে পারছে। লেনদেন করা হচ্ছে অনলাইন মোবাইল ব্যাংকিং এর মাধ্যমে। তাই এর কোন রেকর্ড না থাকায় সঠিক পরিসংখ্যান কারো জানা নেই। যতটুকু জানা গেছে সেটা অনুমান নির্ভর। তবে অজ্ঞতা ও অসচেতনতার কারণেই হুন্ডি তে ঝুকছে দাবি রেমিট্যান্স বিশেষজ্ঞদের।

ছুটির দিনে কুয়ালালামপুরের কোতারায়া ও বুকিত বিনতাং এর বাংলাদেশি মার্কেটে একটু বেশি ভির থাকে। প্রবাসীরা রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে এখানে কেনাকাটা ও টাকা প্ররণ করতে আসে। একটি মানি ট্রান্সফার সেন্টারের সামনে কুমিল্লার প্রবাসী মোঃ রফিকুল হাসান তার ২ সহকর্মী কে নিয়ে এসেছেন দেশে টাকা পাঠাবেন। মোবাইল ফোনে অপরপ্রান্তে বলছে আজ ব্যাংকের রেট ১ রিগিত সমান বাংলাদেশি ২৪ টাকা ২০ পয়সা চলছে হুন্ডি তে পাঠালে কত রেট দিবেন? অপরপ্রান্ত থেকে উত্তর আসলো ২৬ টাকা ১০ পয়সা। তখন আমি হুন্ডির কথা শুনে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম। হুন্ডি তো অবৈধ ব্যাংকে টাকা পাঠাচ্ছেন না কেন? ব্যাংকে পাঠালে তো প্রবাসী কল্যান ব্যাংক ঋণ সুবিধা, ওয়েজ আনার্স বোর্ড থেকে বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা সহ পাঠানো টাকার বৈধতা পাওয়া যায়। রফিকুল হাসান বললেন, আমাদের টাকা হুন্ডি তে পাঠালে নগদ লাভ পেয়ে থাকি, আর ব্যাংকে পাঠাতে বিভিন্ন ডকুমেন্টস ও সময় লাগে। তিনি আরো বলেন, আমি এখন মারা গেলে চাঁদা তুলে আমার দেশে পাঠাবে হবে, সকসো, ইন্সুরেন্স, এসবের সহযোগিতা পেতে হয়রানি হওয়া লাগে, আর শর্তের বেড়াজালে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংকের ঋন কেউ পায় না, তাছাড়া ওয়েজ আনার্স বোর্ড থেকে বিভিন্ন সুবিধা পাওয়া দুরূহ, এসব প্রতিষ্ঠান থেকে প্রবাসীরা সহজে সুবিধা পায় না, তাই আমরা এসব আশা করি না।

মালয়েশিয়ায় প্রবাসীদের রেমিট্যান্স বৈধভাবে দেশে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে রাষ্ট্রীয় ব্যাংক অগ্রনী ব্যাংকের “অগ্রনী রেমিট্যান্স হাউজ ” তারা বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা দিয়ে প্রবাসীদের বৈধভাবে টাকা প্রেরণে উৎসাহিত করে থাকে। মালয়েশিয়ায় সারাদেশে অগ্রনী রেমিট্যান্স হাউজের ৬ টি ব্রাঞ্চ রয়েছে। মালয়েশিয়া অগ্রনী রেমিট্যান্স হাউজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও পরিচালক মোঃ খালেদ মোর্শেদ রিজভী দীর্ঘ ৯ বছর যাবত রেমিট্যান্স নিয়ে কাজ করছেন।

হুন্ডির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সাধারণ প্রবাসীরা নগদ লাভ টা কে আগে দেখে, অবৈধ চ্যানেলে টাকা পাঠিয়ে কি ক্ষতি হচ্ছে এবিষয়ে তারা অজ্ঞ, বৈধ চ্যানেলে অর্থ প্রেরনে দেশের কি মঙ্গল হচ্ছে তারা তা বুঝেন না, এটা আসলে অসচেতনতার অভাব, হুন্ডি আগেও ছিল এখনও আছে।

তিনি আরো বলেন, আমার ৯ বছর প্রবাস জীবনে অভিজ্ঞতা থেকে একটি জড়িপে আমি যে তথ্য পেয়েছি সেটা হলো ৩৫ ভাগ রেমিট্যান্স বৈধ চ্যানেলে পাঠানো হয় আর বাকি ৬৫ ভাগ হুন্ডি ও বিকাশে পাঠানো হয়, আমরা সম্প্রতি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয়ের সাথে আলোচনা করে সুপারিশ করেছি প্রবাসীদের প্রনোদনা শতকরা আড়াই ভাগ থেকে বাড়িয়ে ৫ ভাগ করার জন্য, তাহলে প্রবাসীরা ব্যাংক মূখী হবে ঐদিকে হুন্ডি ব্যবসায়ীরা আর কোন সুবিধা করতে পারবে না।