• আজ বৃহস্পতিবার, ১৬ অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ ৷ ১ ডিসেম্বর, ২০২২ ৷

কক্সবাজারে পর্যটক টার্গেট করে সক্রিয় দালাল চক্র, আটক-১৯

Cox's Bazar news
❏ শুক্রবার, আগস্ট ৫, ২০২২ চট্টগ্রাম

শাহীন মাহমুদ রাসেল, কক্সবাজার: কক্সবাজারে বেড়াতে আসা পর্যটকদের হয়রানি ও ভোগান্তিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে। কক্সবাজার বাস টার্মিনাল ও কলাতলী ডলফিন মোডে পর্যটক নামামাত্রই ভাল হোটেলে নিয়ে যাওয়ার কথা বলে এক শ্রেণির দালাল চক্র তাদের টানা-হেঁচড়াসহ নানাভাবে হয়রানি করছে। বেশকিছু ট্যাক্সি, টমটম ও রিকশাচালক এ চক্রের সঙ্গে জড়িত।

এতে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করে হোটেল-মোটেল, গেস্ট হাউস মালিকরা প্রচুর আর্থিক ক্ষতির সম্মুখিন হওয়ার পাশাপাশি পর্যাপ্ত পর্যটন সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে পর্যটকরা। অন্যদিকে পর্যটন শিল্প বিকাশে প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছেন পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

ভুক্তভোগী পর্যটক ও স্থানীয়রা জানান, কক্সবাজার বাস টার্মিনাল ও কলাতলী হোটল-মোটেল জোন কেন্দ্রিক একটি শক্তিশালি সিন্ডিকেট এক শ্রেণির হোটেল মালিকদের সহযোগিতায় দীর্ঘদিন ধরে এই অপকর্ম চালিয়ে আসছে। কক্সবাজার ভ্রমণে কোনও পর্যটক ডলফিন মোড় অথবা বাস টার্মিনালে পৌঁছালেই ওঁৎ পেতে থাকা এসব চক্র কম খরচে ভাল হোটেলে থাকার কথা বলে কৌশলে নিয়ে যায় নির্ধারিত হোটেলে। আবার মাঝপথে নিয়ে গিয়ে পর্যটকদের কাছে থাকা দামি জিনিসপত্র নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনাও রয়েছে অহরহ। শহরের বাস টার্মিনাল, কলাতলী মোড় ও সুগন্ধা পয়েন্টসহ বিভিন্ন পয়েন্টে প্রতিদিনই এসব চিত্র দেখা যায়।

ঢাকা-চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বেড়াতে আসা পর্যটকরা গাড়ি থেকে নামার সময় রীতিমত টানা-হেঁচড়া শুরু করে কিছু সিএনজি, টমটম ও রিকশাচালক। এসব চালকরা পর্যটকদের কলাতলীর হোটেল-মোটেল জোনে নিয়ে যাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। আর গাড়িতে ওঠানোর পরেই শুরু হয় প্রতারণার নকশা। তারা পর্যটকদের নানাভাবে প্রলোভন দেখানো শুরু করে। এছাড়াও পর্যটকের ধরন দেখে মাদক ও যৌনকর্মী সংগ্রহ করে দেওয়ার কথা বলেও হাতিয়ে নেয় টাকা। কমিশনের জন্য ওইসব দালাল চালকরা পর্যটকদের যেসব আবাসিক হোটেল বা কটেজে তুলে দেয়, সেগুলো টাকার তুলনায় খুবই নিন্মমানের। একইভাবে দালালরা খাবারের হোটেলেও নিয়ে যায় কমিশনের জন্য।

সরেজমিনে দেখা যায়, শহরের সুগন্ধা পয়েন্টে অপেক্ষামান কয়েকজন রিকশাচালককে স্থানীয় এক যুবক শহরের বাহারছড়া যাওয়ার কথা বললে তারা সাফ জানিয়ে দেয় স্থানীয়দের রিকশায় উঠাবে না। তারা অপেক্ষা করছে পর্যটকের জন্য। পরে এ প্রতিবেদক কাউছার নামে এক রিকশাচালকের কাছে বিষয়টি জানতে চাইলে তিনি জানান, তিনি পেশাদার রিকশাচালক না। শহরের কয়েকটি হোটেল ও কটেজের সঙ্গে কমিশন ভিত্তিক মৌখিকভাবে চুক্তিবদ্ধ।

ঢাকার বাড্ডা থেকে আসা ভুক্তভোগী পর্যটক দম্পতি কাশেম চৌধুুরী ও শামীমা জানান, তারা কক্সবাজার এসেছেন দুদিন আগে। আসার পথে বাস টার্মিনালে টমটম চালকের সহযোগিতায় যে আবাসিক হোটেলে উঠেছেন, ওই হোটেলের ব্যবস্থাপনা খুবই বাজে। যদিও তাদের কাছ থেকে রুম ভাড়া রাখা হয়েছে নির্দিষ্ট মূল্যের চেয়েও বেশি। একদিন পরে ওই হোটেল ছেড়ে দিয়ে তারা অন্য একটি আবাসিক হোটেলে ওঠেন এবং সেখানে ভাল আছেন।

লাবনী পয়েন্টে কথা হয় ঢাকা থেকে আসা আরেক দম্পতি লাবনী জাহান ও আসিফের সঙ্গে। তারা বলেন, বাস কলাতলীর ডলফিন মোডে নামামাত্রই টানা-হেঁচড়ায় বিব্রতকর পরিস্থিতির শিকার হতে হয়।

একইভাবে আরেক ব্যবসায়ী পর্যটক লিটন জানান, তিনি এই পর্যন্ত তিনবার কক্সবাজার এসেছেন। গত বছর তার দুই বন্ধুকে ভাল রেস্টুরেন্টে খাবারের কথা বলে সমুদ্রের পাড়ের কবিতা চত্বরে নিয়ে ছিনতাইকারীর কবলে ফেলে এক রিকশাচালক পালিয়ে যায়।

কক্সবাজার হোটেল মোটেল গেস্ট হাউস মালিক সমিতির একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এক শ্রেণির হোটেল ও কটেজ ব্যবসায়ীরা রিকশা, টমটম ও সিএনজি চালকদের আর্থিকভাবে প্রলোভন দেখিয়ে শহরের বিভিন্ন স্থানে পর্যটকদের পেছনে লেলিয়ে দিয়েছে। এ কারণে পর্যটক হয়রানি বেড়েছে।

এদিকে এসব অভিযোগ আমনে নিয়ে শুক্রবার ভোরে দূরপাল্লার বিভিন্ন বাসের যাত্রী হয়েই শহরের একটু বাইরে থেকেই পর্যটক বেশ ধরে উঠে আসে কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের সদস্যরা। গাড়ি থেকে নামতেই পর্যটক ভেবেই তাদেরকে নিয়েই টানাহ্যাচড়া শুরু করে পর্যটন জোনের দালাল চক্রের সদস্যরা। তখনই ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার শহরের কলাতলীর হোটেল মোটেল জোনের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে ১৯ জন দালালকে আটক করে। এসময় ১৪টি ইজিবাইকও (টমটম) জব্দ করা হয়েছে।

আটকরা হলেন, জাফর আলম (৩৮), মো. আব্দুলাহ (১৮), ইসমাইল (২৪), ইব্রাহীম (৩৭), নুর আলম (২৬), চাঁদ মিয়া (১৯), নজু আলম (৩৫), রুবেল (২৬), জুয়েল মিয়া (৩২), সাদেকুর (২৬), সৈয়দ নুর (৩০), সাহিদ (২৬), হেলাল উদ্দিন (৪০), সাগর (২৩), গিয়াস উদ্দিন (৩৩), সৈয়দ আলম (৩৬), মো. হোসেন (৪৭), রবিউল হাসান (২০), ও ইমরান (২১)।

কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রেজাউল করিম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে অটোরিকশার চালকের বেশ ধরে একটি চক্র পর্যটকদের হয়রানি করে আসছে। তারা পর্যটকদের অল্প ভাড়ায় ভালো হোটেলে নিয়ে যাবে বলে মৌখিক চুক্তি করা হোটেলে নিয়ে যেত এবং অতিরিক্ত ভাড়া আদায়সহ ব্ল্যাকমেইল করতো। পর্যটকদের মালামাল ছিনতাই করা, ইভটিজিং করা, এমনকি ধর্ষণের মত ঘটনার সাথেও তারা জড়িত। এই চক্রের কিছু সদস্য পর্যটকদের ফাঁদে ফেলে আপত্তিকর ছবি তুলে টাকা হাতিয়ে নিত। এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রেজাউল করিম আরও বলেন, অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে অভিযান চালাতে শুক্রবারকে বেছে নেওয়া হয়। পরিকল্পনা মতো পর্যটক বেশী পুলিশের হাতে আটকরা প্রাথমিকভাবে স্বীকার করেছেন তারা দীর্ঘদিন ধরে এ কাজ করছেন। তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। ট্যুরিস্ট পুলিশের এ ধরণের অভিযান নিয়মিত চলবে। কক্সবাজারে পর্যটকদের নানাভাবে হয়রানি করা কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না বলে উল্লেখ করেন এ পুলিশ কর্মকর্তা।