🕓 সংবাদ শিরোনাম

রোববার পর্যন্ত ইরানে হিজাববিরোধী বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা ৯২ * নিজের মেয়েকে হত্যা করে প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে যেভাবে নাটক সাজায় বাবা! * কান্নাকাটি করায় বিরক্ত হয়ে ৩৫ দিনের শিশু কন্যাকে পুকুরে ফেলে দেন মা ! * তৃতীয়বারের মতো প্রেমিকের বাড়িতে প্রেমিকার অনশন, দুজনকেই শ্রীঘরে নিলো পুলিশ * বন্দরে মিশুক চালক কায়েস’র লাশ উদ্ধারের ১২ ঘন্টার মধ্যে গ্রেপ্তার ৩ * মঙ্গলবার দেশে ফিরবেন প্রধানমন্ত্রী * ইবির পরিবহন নিয়ে যত অভিযোগ * ফরিদপুরে আলোচিত দুই হাজার কোটি টাকা পাচার মামলায় ছাত্রলীগ নেতা কারাগারে * এবার রাজশাহীতে চলন্ত বাসে ঢুকে গেলো বৈদ্যুতিক খুটি * চলতি সপ্তাহেই বাড়ছে বিদ্যুতের দাম *

  • আজ সোমবার, ১৮ আশ্বিন, ১৪২৯ ৷ ৩ অক্টোবর, ২০২২ ৷

চলছে দুর্যোগ মৌসুম, উৎকন্ঠায় জেলে পরিবার

Bhola news
❏ সোমবার, আগস্ট ৮, ২০২২ বরিশাল

এস আই মুকুল, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট (ভোলা) : প্রাকৃতিক বৈরিতা, ঝড়-বন্যা আর জলদস্যুদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে বাঁচতে হয়ে উপকূলীয় এলাকার জেলেদের। নদী থেকে ধেয়ে আসা দুর্যোগ-দুর্বিপাকগুলো নিত্যদিনের সঙ্গী। আবার বেঁচে থাকার সব খোড়াক মেলে নদী থেকে। নদীর সঙ্গে ওদের যেমন প্রেম, বেঁচে থাকার লড়াইও সেই নদীর সঙ্গেই। কখনো কখনো ঢেউয়ের বিধ্বংসী রূপ নিয়ে রাক্ষুসী হয়ে ওঠে মেঘনা ও তেতুলিয়া। চরফ্যাশন ‍উপজেলার মেঘনা ও তেতুলিয়া নদীরপাড়ের জেলেদের জীবনযাত্রা এমনি। নদী ও সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে প্রতিবছর অনেক জেলে নিখোঁজ হন। এদের কারো লাশ ফিরে আসে পরিবারের কাছে, আবার অনেক জেলে পরিবার নিখোঁজ জেলেদের ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকেন। হয়তো একদিন ফিরে আসবে তার স্বজন। এমন অপেক্ষার প্রহর তাদের শেষ হয় না।

গত ছয় বছর ধরে এমন অপেক্ষার প্রহর গুনছেন চরফ্যাশন উপজেলার নিখোঁজ জেলেদের স্বজনরা। বিশেষ করে দুর্যোগ মৌসুমে নিখোঁজ জেলে পরিবারে স্বজনদের কান্নার শব্দ শোনা যায়।

জানা গেছে, সাগর উপকূলীয় অঞ্চলে জুন থেকে নভেম্বর মাস পর্যন্ত দুর্যোগ মৌসুম। আর এই দূর্যোগ মৌসুম মানেই উপকূলবাসীর জন্য বন্যা কিংবা জলোচ্ছ্বাসের আতঙ্ক। সেই সাথে জেলে পরিবারগুলোতে থাকে স্বজন হারানোর ভয়।

হাজারীগঞ্জ এলাকার জেলে মো: জাফর মাঝি বলেন, সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে দুই ধরনের বিপদের মুখে পড়তে হয় জেলেদের। বিশেষ করে জলদস্যু কবলে পড়ে নিঃস্ব ও ঝড়ের কবলে পড়ে নিখোঁজ হন জেলেরা। অন্য জেলেরাও একই আতঙ্কের কথা জানিয়েছেন। দুর্যোগ মৌসুমে সাগরে ট্রলার ডুবে অনেক জেলে নিখোঁজ হয়েছে। ভারি হয়েছে নিখোঁজ জেলেদের পাল্লা।

চরফ্যাশন উপজেলা মৎস্য কার্যালয়ের তথ্যমতে, উপজেলায় প্রায় ৯০ হাজার জেলে রয়েছে। নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪৪ হাজার ২শ’ ৮১জন। অনিবন্ধিত জেলে রয়েছে প্রায় ৪৬ হাজার। এসব জেলেরা নদী ও সাগরে মাছ শিকার করে। এ অঞ্চলে প্রায় ১২ হাজার ট্রলার ও নৌকা রয়েছে। এছাড়াও গভীর সমুদ্রগামী ৭ হাজার ট্রলার রয়েছে। এসব জেলেদের মধ্যে ২০১৫ সনে ১১ জন, ২০১৬ সনে ১৯ জন, ২০১৭ সনে ৫ জন, ২০১৯ সনে ৪৮ জন, ২০২০ সনে ৯ জন, ২০২১ সনে ৯ জন জেলে নদী ও সাগরে নৌকা ডুবে প্রাণ হারান। ২০১৫ থেকে ২০১৭ সনের মধ্যে নৌকা ডুবিতে প্রাণ হারানো সকল জেলে পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা করে অনুদানের চেক প্রদান করা হয়েছে। তবে ২০১৯ সনের শুরু থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ পর্যন্ত নদীতে ঝড়ের কবলে পড়ে নৌকা ও ট্রলার ডুবিতে নিখোঁজ ৬৬ জেলের মধ্যে ২২ জেলে পরিবারকে ৫০ হাজার টাকা করে অনুদানের চেক প্রদান করা হয়েছে।

তবে বিগত সনগুলোতে অন্যান্য জেলে পরিবার আর্থিক অনুদানের চেক পেলেও ২০১৮ সনে নৌকা ডুবিতে প্রাণ হারানো জেলে পরিবারের ভাগ্যে কোন অনুদান জুটেনি। উপজেলা মৎস্য কার্যালয় জানিয়েছেন, সরকারের পক্ষ থেকে ২০১৮ সনে নদী ও সাগরে নৌকা ডুবে প্রাণ হারানো জেলে পরিবারের জন্য কোন বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।

উপজেলা মৎস্য কার্যালয় আরো জানিয়েছেন, বিগত বছরের তুলনায় চরফ্যাশন উপজেলায় ২০১৯ সনের শুরু থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২১ পর্যন্ত ৬৬ জন জেলে ঝড়ের কবলে পড়ে নৌকা ও ট্রলার ডুবিতে নিখোঁজ হয়েছে। এদের অনেকের লাশ পাওয়ার গেলেও অন্যদের খোঁজ পাওয়া যায়নি। নিখোঁজ জেলেরা হলেন চর মাদ্রাজ, আসলামপুর, মাদ্রাজ, জিন্নাগড়, আমিনাবাদ, আবুবকরপুর, আহম্মদপুর, ওসমানগঞ্জ, এওয়াজপুর, হাজারিগঞ্জ, জাহানপুর, রসূলপুর, চর মনিকা, চর কুকরি মুকরি, চর পাতিলা, নজরুল নগর, মুজিব নগর, ঢালচর, নুরাবাদ, নীলকমল, আব্দুল্লাহপুর, চরকলমী এলাকার।

নুরাবাদ এলাকার জাকির হোসেন এর ছেলে মো. জামাল (৩৭)। ২০১৯ সালের ১২ জুলাই, সাগরে ট্রলার ডুবে নিখোঁজ হয়েছেন। তার বাবা বলেন, ‘সংসারের অভাব মেটানোর জন্য ছেলেটা দিন-রাত সাগরে পড়ে থাকতো। কূলে ফেরার দুইদিন আগেই আকস্মিক এক ঝড়ে তাদের ট্রলার ডুবে যায়। সেদিন ট্রলারে থাকা অন্য জেলেরা বেঁচে আসলেও আমার ছেলেসহ দুই জেলে খোঁজ পাওয়া যায়নি।’

জেলে জামালের মতো একই এলাকার আবদুল জলিল (৪৫), শাহাজাহান (৪২), সুলতান মাঝি (৪৬), আফসার জমাদার (২৯), শাহাজাহান মাঝি (৪১), আব্দুল হাই (৩২), কবির (২৬), নূরনবী (২৮), নজরুল ইসলাম (৩৩) নিখোঁজ রয়েছেন।

আবুদুল্লাহপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা রফিক বিশ্বাস এর ছেলে জামাল বিশ্বাস ও একই এলাকার মদিজ মুনশি এর ছেলে মো. আব্বাস নদীতে মাছ শিকারে গিয়ে ফিরে আসেননি। তারা একইদিনে নিখোঁজ হন। ২০২০ সনের ১৮ জুন, গভীর রাতে প্রচন্ড ঝড়ে তাদের নৌকা ডুবে গেলে সাথে থাকা অন্য জেলেরা সাঁতরে পাশ্ববর্তী চরে উঠলেও জামাল বিশ্বাস ও মো. আব্বাস এর খোঁজ মেলেনি।

ঢালচর মৎস্য ঘাটের আড়তদার আব্দুস সালাম বলেন, ‘ঢালচর এলাকার ৯০ শতাংশ বাসিন্দা জেলে পেশায় নিয়জিত। এ এলাকার ১৬শ’ জেলে নদী ও সাগরে মাছ শিকার করে। এখানকার জেলেরা মৎস্য আড়তদারদের নিকট থেকে দাদন নিয়ে নৌকা তৈরি করে। এমনকি মাছ শিকারের জাল থেকে শুরু করে চাল-ডাল কিনে দিতে হয়। ভাগ্য খারাপ হলে অনেকেই ঝড়ের কবলে পড়ে নৌকাসহ নিখোঁজ হয়ে যায়। সেইসাথে হারিয়ে যায় দাদনের লক্ষ লক্ষ টাকা।’

চর কুকরি-মুকরি ইউপি চেয়ারম্যান আবুল হাসেম মহাজন বলেন, ‘কুকরি-মুকরি ইউনিয়নের প্রায় ১২শ’ জেলে মৎস্য আহরণে নিয়জিত রয়েছে। এসব জেলেরা দিন-রাত নদী ও সাগরে ঝুঁকি নিয়ে মাছ শিকার করে। ঝড়ের কবলে পড়ে নৌকাসহ অনেক জেলে নিখোঁজ হয়। এদের পরিবারের সদস্যরা নিখোঁজদের অপেক্ষায় এখনো পথ চেয়ে বসে থাকেন।’

উপজেলা সিনিয়র মৎস্য কর্মকর্তা মারুফ হোসেন মিনার বলেন, ‘দুর্যোগ মৌসুমে চলছে। এ মৌসুমে উপকূলীয় এলাকার মানুষরা সবসময় আতঙ্কে থাকে। জেলে পরিবারগুলো উৎকন্ঠায় দিন কাটায়। নদীতে নৌকা ও ট্রলার ডুবিতে জেলেরা নিখোঁজ হয়। এদের অনেকের লাশ পাওয়ার গেলেও অন্যদের খোঁজ পাওয়া যায়নি। নিখোঁজ জেলেদের পরিবারকে নগদ ৫০ হাজার টাকা করে দেওয়া হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বাকি জেলে পরিবারকেও একই হারে এ অর্থ প্রদান করা হবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘চরফ্যাশন উপজেলায় প্রায় ৯০ হাজার জেলে রয়েছে। উপজেলার নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ৪৪ হাজার ২শ’ ৮১জন। অনিবন্ধিত জেলে রয়েছে প্রায় ৪৬ হাজার। এসব জেলেরা নদী ও সাগরে মাছ শিকার করে। ঝুঁকি এড়াতে জেলেদের মাঝে জীবন রক্ষাকারী সামগ্রী লাইফ জ্যাকেট বিতরণসহ সর্তকতামূলক পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।’