🕓 সংবাদ শিরোনাম

ইরানে দেশ জুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৭৬ * ঢামেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের দুই বন্দীর মৃত্যু * ফেসবুকে ধর্ম নিয়ে কটূক্তির অভিযোগে কিশোর গ্রেপ্তার * টুর্নামেন্টের ‘ট্রফি ভাঙা’ সেই ইউএনও মেহরুবাকেকে বদলি * ধানমন্ডিতে রিকশা থেকে পড়ে জবি শিক্ষার্থীর মৃত্যু * বাংলাদেশ সীমান্তে শান্তি নিশ্চিতে নেপিদো’র সঙ্গে আলোচনা করবে চীন * ইংল্যান্ড-জার্মানির রুদ্ধশ্বাস ড্রয়ের দিনে ইটালির সহজ জয় * পঞ্চগড়ে নৌকাডুবির ঘটনায় আরও ৬ মরদেহ উদ্ধার, মৃত বেড়ে ৫৬ * আটঘরিয়ায় আ’লীগ-বিএনপি একই স্থানে সমাবেশ ডাকায় ১৪৪ ধারা জারি * ইরানে হিজাব বিরোধী বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা ছাড়াল ৭৫ *

  • আজ মঙ্গলবার, ১২ আশ্বিন, ১৪২৯ ৷ ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ৷

ম্যাকিয়াভেলির প্রভাবে শেখ হাসিনা, যা প্রয়োজন

আয়শা এরিন
❏ বৃহস্পতিবার, আগস্ট ১১, ২০২২ প্রজন্মের ভাবনা

প্রজন্মের ভাবনা, সময়ের কণ্ঠস্বর: মধ্যযুগীয় রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নিক্কোলো ম্যাকিয়াভেলি সব সময় বলে গেছেন, রাষ্ট্রই হচ্ছে জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং নিবিড় বাস্তবতায় রাষ্ট্রকে ছাপিয়ে অন্য কোন উচ্চ ক্ষমতাধর বলয় সেদিক দিয়ে রাষ্ট্রকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি।

ম্যাকিয়াভেলি প্রায়শই ক্ষেপে যেয়ে বলতেন- রাষ্ট্রধর্ম, নৈতিকতা, ঐশ্বরিক আইন বা প্রাকৃতিক আইন উচ্চতর ক্ষমতার ধারাবাহিকতা রক্ষা করে না। ম্যাকিয়াভেলি এসব ক্ষমতাকে ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে ঘোষণা করেন, এগুলো সব বাজে কথা! রাষ্ট্রই হচ্ছে সর্বোচ্চ ক্ষমতা এবং তার ওপর কোনো উচ্চতর ক্ষমতা থাকতে পারে না।

ম্যাকিয়াভেলির মতানুসারে, মানুষ প্রকৃতি গতভাবে খারাপ তিনি মানুষকে ‘দুর্বলতা, ভ্রম ও শঠতার এমন একটি যোগফল বলে বিবেচনা করেন এবং মত রাখেন যে, চতুর লোকের হাতে পড়ে বোকায় পরিণত হয় এবং যাকে স্বেচ্ছাচারি শাসক তার স্বেচ্ছাচারিতার শিকারে পরিণত করে’।

ম্যাকিয়াভেলি জনমানুষকে ‘অকৃতজ্ঞ, চঞ্চল, প্রতারক, কাপুরুষ ও লোভী’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।

ম্যাকিয়াভেলির সাথে আদর্শিক মিল রেখে বাংলাদেশি দার্শনিক ঈশ্বরমিত্র এই প্রসঙ্গে মতবাদ রাখেন নি। কারণ ম্যাকিয়াভেলি ঈশ্বর বন্দনায় যেতে স্বস্তিতে থাকেন নি। কিন্তু ঈশ্বরমিত্র যা বলেছেন তা ম্যাকিয়াভেলির অন্তত ছয়টি মতবাদের যোগফলে নিষ্পত্তি হয়। ঈশ্বরমিত্র বললেন, ‘পলিটিক্স ইজ এ সুইট গেম, প্লেইড বাই লিটল গড উইথ দ্য রাইট অফ নটি পিপল—– কোশ্চেন ইজ, হু ইজ পলিটিশিয়ান ?’

ম্যাকিয়াভেলি অবশ্য মনে করতেন, ধর্ম ও নৈতিকতার পথ অনুসরণ করে রাষ্ট্র যদি স্বার্থ উদ্ধারে সচেষ্ট হয়, তা হবে সর্বাপেক্ষা উত্তম। কিন্তু যেহেতু মানুষ প্রকৃতিগতভাবে দুর্নীতিপরায়ণ, প্রতারক, লোভী ও হিংসুটে, কাজেই এ পথে চলে রাষ্ট্র কোনো দিনই তার উদ্দেশ্য হাসিল করতে পারবে না। প্রতিটি পদক্ষেপে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে সংস্কৃতির নামে প্রহসনের অনুষঙ্গগুলো। সুতরাং ধর্ম বা নৈতিকতার কথা আদৌ চিন্তা না করে রাষ্ট্র তার লক্ষ্য অর্জনের জন্য ‘যা কিছু অনুকূলে’ তাই করে যাবে। তার মতে, রাষ্ট্র যদি চূড়ান্ত সাফল্য অর্জন করতে পারে, মাধ্যম যতই নিচ বা ঘৃণ্য হোক না কেন—– অর্জিত সাফল্যই মাধ্যমের যৌক্তিকতা প্রমাণ করবে। তিনি বিশ্বাস করতেন, লক্ষ্য মাধ্যমের যৌক্তিকতা বিধান করে, মাধ্যম লক্ষ্যের নয়।

ম্যাকিয়াভেলি যেখানে সম্ভব, সেখানে প্রজাতান্ত্রিক শাসন এবং যেখানে প্রয়োজন সেখানে রাজতান্ত্রিক শাসনের কথা বলেছেন। অভিজাততন্ত্র ও অমাত্য ব্যক্তিদের শাসন সম্পর্কে তার অত্যন্ত হীন ধারণা ছিল। তার মতে, সম্ভ্রান্ত অভিজাতদের স্বার্থ রাজা বা জনসাধারণ কারো স্বার্থের অনুকূল নয়। এরা রাষ্ট্রের শান্তি ও স্থায়িত্বের ঘোর দুশমন, কাজেই সু-শৃঙ্খল শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য এদেরকে সমূলে বিনাশ করা প্রয়োজন। সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের সম্পর্কে ম্যাকিয়াভেলির ধারণা হলো- ‘এসব ভদ্দর লোকেরা তাদের সম্পদ থেকে আহরিত লভ্যাংশের ওপর আলস্যপূর্ণ জীবনযাপন করে, কিন্তু সমাজের আদৌ কোনো উপকার করে না। তারা সর্বত্র সরকারি শাসনের দুশমনিতে লিপ্ত থাকে।

উপরিউক্ত সুবিন্যস্ত ব্যাখার মাধ্যমে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতাকে চোখের সামনে নিয়ে আসতে নিজের মন কে একটু সঁপে দিলে বা বিদগ্ধ দৃষ্টি দেখিয়ে দেয় যে, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ কে কি ভাবছে, সেদিকে নজর না দিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছুতে চায়। রাষ্ট্রের গতির যন্ত্র হিসাবে যে সরকার তাঁরা দার করিয়েছে, তা অবিচল ও দূরদৃষ্টি সম্পন্ন এবং তাঁরা একজন ভালো চালক পেয়েছেন। সেই চালকের নাম বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা।

অন্যদিকে ধর্মভিত্তিক সমাজের সাথে খানিকটা আপোস করে আবার আপসহীন থেকে চূড়ান্ত গন্তব্যে যেতে আওয়ামী লীগ হেরে যাচ্ছে, তা কি কেহ বলতে পারবে ? এ জন্যই অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের পক্ষে থেকে যারা আওয়ামী লীগের জন্য গলা ফাটায়, তখন তাঁরা খুশি হয় মামুনুল হকদের আটকের খবরে। আবার একজন শেখ হাসিনার ধর্মপ্রাণ মন ঘোষণা করে, মহান স্রষ্ট্রার পক্ষে আমাদের লড়াই চালিয়েও যেতে হবে। দ্বৈত ভুমিকায় অবতীর্ণ হয়ে শেখ হাসিনা কি তাই ম্যাকিয়াভেলি কে জেতাচ্ছেন না ? এখানেই একজন শেখ হাসিনা আলাদা জাতের রাজনৈতিক সত্তা।

ম্যাকিয়ভেলির ভদ্দর লোকেরা কা’রা, তা বুঝতে কি কষ্ট হয়? এখানে ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে যারা সুদের ব্যবসাকে পরিচিত করেছিল, সেই তাঁরাই কোটি কোটি ডলার খরচ করে নোবেল জয় করে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ করতে চায়। সেই ভদ্দর লোকেরা বিদেশের আদালতে আইনজীবি হয়ে এক বিলিয়ন আয় করলেও গণফোরামের কোন কর্মী একজন মানুষকে দুধ চা পান করার অফার করতে পারে না। তাঁর পকেটে দল চালাতে ৪০ টাকা নেই বুক পকেটে। কিন্তু, ভদ্দর লোকদের দুশমনি থামে না!

এই ভদ্দর লোকগুলিই আওয়ামী লীগের তথা শেখ হাসিনার রাষ্ট্র কেন্দ্রিক চিন্তার সুমসৃণ পথের কাঁটা। যারা বাংলাদেশে পেছনের রাস্তা দিয়ে ক্ষমতায় আসতে চায়। কেহ ইসলামিক বিপ্লব প্রত্যাশা করেন, কেহ কথিত বিপ্লবের নামে প্রতিবিপ্লব।

আওয়ামী লীগের উচিত হবে এখন, সামাজিক চুক্তির গুনফলের অংক কষে রাজনীতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। বৈশ্বিক সম্পর্ক তৈরি করে গওহর রিজভী কিংবা মোহাম্মদ জমিরদের সেরা পরামর্শটা গ্রহণ করা। একই সঙ্গে খুবই দক্ষ একজন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা। তেমন বিবেচনায় সেই নামটি হল, এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন। মেধা, প্রজ্ঞা ও ব্যক্তিত্বের অভাবনীয় উদাহরণ হিসাবে শেখ হাসিনার সাথে তাঁর নামটিই কাজে ও কর্মে যায়। খুব বেশি দূরে যাওয়ার দরকার নেই। সাধারণ সম্পাদক হিসাবে দুই প্রয়াত গ্রেট আব্দুল জলিল ও সৈয়দ আশরাফুলের পর আজকের ওবায়দুল কাদেরও মন্দের ছিলেন না। এখন খায়রুজ্জামান লিটনই হবেন যোগ্য উত্তরসূরী।

ম্যাকিয়াভেলির মতে, মানুষের স্বাভাবিক হীন চরিত্রকে ‘সামষ্টিক ভালো’তে পরিণত করার সবচেয়ে ভালো হাতিয়ার হচ্ছে রাষ্ট্র। বাংলাদেশের মানুষ যদি এতই ভাল হয়, তাহলে কেন এই দেশে ১৫ আগস্ট হয়? কেন ২১ আগস্ট হয় ? এই জন্যই সার্বিক সফলতায় রাষ্ট্রের প্রধান শাখা হিসাবে সরকারের অভ্যন্তরে মেধাবী রাজনীতিকদের দরকার। দলের জন্যও কৃতি রাজনীতিকদের প্রয়োজন। যাদের দেখা যায়, তাঁরা আসলে কতটুকু যোগ্য? হ্যাঁ, শেখ হাসিনা টিমে অসাধারণ কয়েকজন ব্যক্তিসত্তার সংখ্যা বাড়াতে পারলে মন্দ হত না।

নিক্কোলো ম্যাকিয়াভেলি সামরিক সক্ষমতায় বিশ্বাসী ছিলেন এবং তিনি বিশ্বাস করতেন, একটি সফল সরকারের অবশ্যই একটি শক্তিশালী সামরিক বাহিনী প্রয়োজন। শেখ হাসিনা সে পথেও হাটতে চেয়েছেন, চান। কিন্তু, খেলার ময়দানে তিনি একাই অধিনায়ক, একাই খেলোয়াড়। তাঁর দলে নিদেন পক্ষে তাঁর মত করে না হলেও সেরা বাইশজন রাজনীতিক দরকার, দক্ষ সাধারণ সম্পাদক দরকার, প্রয়োজন ক্রেডিবল থিংক ট্যাংক।

আয়শা এরিন, লেখক ও গণমাধ্যমকর্মী

আপনার জেলার সর্বশেষ সংবাদ জানুন