🕓 সংবাদ শিরোনাম
  • আজ বুধবার, ১৩ আশ্বিন, ১৪২৯ ৷ ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ৷

মিরপুরে অপ্রতিরোধ্য মাদক কারবারিরা, হামলার শিকার সাংবাদিক

Dhaka news
❏ শুক্রবার, আগস্ট ১২, ২০২২ ঢাকা

রাজু আহমেদ, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট: রাজধানীর মিরপুরে প্রশাসনের নাকের ডগাতেই বিভিন্ন প্রকার মাদকের রমরমা বাণিজ্য কিছুতেই থামানো যাচ্ছেনা। বিশেষ করে মিরপুরের হযরত শাহ্ আলী মাজার শরীফ এলাকা,উত্তর বিশিলসহ আশপাশের বেশকিছু এলাকায় স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন ও শত শত লোকজনের সামনেই প্রকাশ্য দিবালোকে ডাকচিৎকার করে পথচারীদেরকে ডেকে ডেকে বিভিন্ন প্রকার মাদক কিনতে আহ্বানের চিত্রটি যেন নিত্যনৈমত্তিক স্বাভাবিক ব্যপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

স্থানীয় কিছু স্বার্থান্বেষী রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের আশীর্বাদপুষ্ট এসকল চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীগণ এতটাই প্রভাবশালী যে, স্থানীয়দের কেউ তাদের অপকর্মের প্রতিবাদ করার সাহস করেনা। ভুল করেও কেউ এসকল চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কথা বললে তার উপর নেমে আসে অমানুষিক নির্যাতনের খড়গ।

বৃহস্পতিবার (১১ আগষ্ট) দিবাগত রাতে মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া এবং মাদকের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের জের ধরে এলাকার চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের হামলায় নজরুল ইসলাম (৫৩) নামে একজন সিনিয়র সাংবাদিক গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন বলে খবর পাওয়া গেছে।

বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত আনুমানিক সাড়ে এগারোটার দিকে মিরপুরের হযরত শাহ্ আলী (রঃ) মাজার শরীফ সংলগ্ন সড়কে এঘটনা ঘটে। আহত সাংবাদিক নজরুল ইসলাম ঢাকা থেকে প্রকাশিত ইংরেজী ‘দ্যা ডেইলী টাইমস অফ বাংলাদেশ’ পত্রিকায় সিটি রিপোর্টার হিসেবে কর্মরত আছেন।
হামলার ঘটনায় গুরুতর আহত হয়ে সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ও বাংলাদেশ হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ভুক্তভোগী ওই সাংবাদিক বাদী হয়ে আনিস মিয়া (৫০),সজিব ওরফে খুর সজিব (৩৪) ও সাদ্দাম (৩৫) নামে তিনজনকে বিবাদী করে ডিএমপির মিরপুর বিভাগের শাহ্ আলী থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। ঘটনাটিকে কেন্দ্র করে বৃহত্তর মিরপুরে কর্মরত সকল সাংবাদিক মহলে টান টান উত্তেজনা বিরাজ করছে।

হামলার শিকার ওই সাংবাদিক হামলার ঘটনার বিবরণী তুলে ধরে বলেন,পেশাগত দায়িত্ব পালন শেষে বাসায় ফেরার পথে বৃহস্পতিবার রাত ১১ টা ৩০ মিনিটের দিকে মিরপুর মাজার শরীফের সামনে আমাকে একা পেয়ে “আমরা মাদক ব্যবসা করি,ছিনতাই করি বা যা ইচ্ছা তাই করি, তাতে তোর বাপের কি, তুই কত বড় সাংবাদিক হইছিস? আজ তোকে মেরেই ফেলবো” বলেই আনিস, সজিব ও সাদ্দাম আমার উপর অতর্কিত হামলা করে। এসময় অভিযুক্ত আনিসের নির্দেশে অপর অভিযুক্ত এলাকার চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও মাদক ব্যবসায়ী সজিব দৌড়ে এসে সজোরে আমার বুকে লাথি মারলে আমি মাটিতে লুটিয়ে পড়ি। এসময় সাদ্দাম পাশেই সড়কে পড়ে থাকা একটি ইট তুলে এনে সজিবের হাতে দিলে সজিব ওই ইট দিয়ে আমার মাথা,মুখ, হাটু,দুই হাতের কনুইসহ শরীরের বিভিন্ন জায়গায় আঘাত করে। এতে আমার মাথা ফেটে যায়। বুকে ও মুখে মারাত্মক আঘাত সহ্য করতে না পেরে আমি ডাকচিৎকার শুরু করলে আশপাশের উপস্থিত জনতা এগিয়ে আসলে অভিযুক্তরা দৌড়ে ঘটনাস্থল থেকে পালিয়ে যায়।

শুক্রবার ঘটনার সত্যতা যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে সরেজমিনে মিরপুর মাজার শরীফ সংলগ্ন ঘটনাস্থল, উত্তর বিশিলসহ আশপাশের এলাকাগুলোতে গিয়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের অনেকের নিকট এবিষয়ে জানতে চাইলে প্রথমে কেও মুখ খোলার সাহস পেলো না। অবশেষে নাম পরিচয় গোপন রাখার বিশেষ শর্তে দু’চারজন স্থানীয় বাসিন্দা ও দোকান্দারগণ যা জানালেন তা রীতিমতো রোমহর্ষক।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মাজার শরীফ কমপ্লেক্সের একজন দোকানদার ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে এসকল চিহ্নিত মাদক ব্যববসায়ী,কিশোর গ্যাং ও সন্ত্রাসীদের অপ্রতিরোধ্য দৌরাত্ম্যে ত্যাক্ত-বিরক্ত ও অসহায় উল্লেখ করে জানান, অভিযুক্ত আনিস মিয়া উত্তর বিশিলের একজন বাসিন্দা। তিনি এলাকায় চিহ্নিত মাদক সম্রাট। মিরপুরে ভাসমান পতিতাদের জিম্মি করে দেহব্যবসা ও ছিনতাই চক্রের মূল হোতা এই আনিস মিয়া।

অভিযুক্ত আনিস মিরপুরের একাধিক কিশোর গ্যাং এর অন্যতম পৃষ্ঠপোষক হিসেবে সর্বজন পরিচিত। এছাড়াও অভিযুক্ত আনিস মিয়া শাহ আলী থানাধীন হযরত শাহ আলী (রঃ) মাজার শরীফ,উত্তর বিশিলসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিন যাবৎ প্রায় অর্ধ-শতাধিক ছিন্নমূল কিশোর-কিশোরী, নারী-পুরুষ ও ভ্রাম্যমান পতিতাদেরকে ভয়ভীতি দেখিয়ে জিম্মি করে বিভিন্ন প্রকার মাদক ব্যবসা চালিয়ে আসছে।

তার মাদক বিক্রি না করলে শারিরীক নির্যাতন ও অত্যাচারের অভিযোগ তুলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্বয়ং একজন মাদক বিক্রেতা জানায়, এই আনিসের বিরুদ্ধে কোনো কথা বলা তো দূরের কথা তার মাদক বিক্রি না করলে প্রকাশ্য দিবালোকেই আমাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে- মারধোর করে। সকলেই দেখে কিন্ত কেউ প্রতিবাদ করেনা৷ তাই বাধ্য হয়ে দৈনিক সন্ধ্যার পর মাজারের চারপাশে ঘুরেফিরে আনিস মিয়ার গুণে গুণে দেওয়া গাঁজার পুটলা বিক্রি করি।

কে এই আনিস মিয়া?

এমন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়ে পাওয়া গেল চমকে ওঠার মতো ভয়ংকর তথ্য। স্থানীয় শাহ্ আলী থানা ছাত্রলীগের আল-আমিন নামে একজন নেতার পিতা পরিচয়ে প্রভাব খাটিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ মাজার কেন্দ্রীক বসবাসকারী অসহায় ছিন্নমূল কিশোর-কিশোরী, নারীদের জিম্মি করে তাদেরকে দিয়ে দেহব্যবসা,মাদক ব্যবসা ও তার পালিত সংঘবদ্ধ কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের দিয়ে ছিনতাইয়ে কাজটি করান আনিস। এমনকি গোটা মিরপুর এক নম্বর এলাকার ব্যস্ততম সড়ক ও মার্কেট কেন্দ্রীক অর্ধশতাধিক শিশু কিশোরদের ব্যবহার করে মোবাইল ফোন,পার্টস ব্যাগ ও দামি জিনিসপত্র চোরচক্র নিয়ন্ত্রণের মত এতসব অপকর্মের প্রধান এই আনিস।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এই চোরচক্রের সদস্য অসহায় ছিন্নমূল এক কিশোরী জানায়, মিরপুরের ব্যস্ততম মার্কেট, শপিংমল গুলোতে মার্কেট করতে আসা নারীদের পার্টস ব্যাগ,মোবাইল ফোন ও দামি জিনিসপত্র চুরি করে সে। সে একা নয়, বরং চারপাঁচ জন সদস্যের সমন্বয়ে একটি চোরচক্রের সদস্য সে। এরকম প্রায় আরো ১২-১৫ টি সংঘবদ্ধ গ্রুপ মিরপুরের ফুটপাত, শপিংমল ও মার্কেটগুলোর আশপাশে ছিনতাই ও চুরিতে নিয়োজিত রয়েছে এই আনিস মিয়া ও সজিবের নেতৃত্বেই।

ওই কিশোরী আরো জানায়, ছিন্নমূল শিশু কিশোরদের দ্বারা এসকল ছিনতাইকৃত মোবাইল ফোন,পার্টস ব্যাগ ও দামি জিনিসপত্র সবকিছু দিনশেষে এই আনিসের কাছেই জমা দিতে হয়। ছিনতাইকৃত মালামালের বিনিময়ে মাজার শরীফ কেন্দ্রীক বসবাসকারী এসকল ছিন্নমূল শিশু-কিশোরদের কপালে জোটে এক বেলা আহারের অর্থ ও এক কৌটা ড্রেনডাইট নামক আঠা (ছিন্নমূল শিশু কিশোরদের নিকট জনপ্রিয় ড্যান্ডি নামক জুতার আঠা)। পক্ষান্তরে অভিযুক্ত আনিসের নিয়ন্ত্রনাধীন এসকল ছিন্নমূল শিশু কিশোর ছিনতাইকারীদের কেউ একদিন শুন্য হাতে ফিরে এলে উল্টো আহারের পরিবর্তে তাদের কপালে জোটে আনিস ও তার কিশোর গ্যাংয়ের সিনিয়র সদস্যদের কর্তৃক বেদম প্রহার।

চিহ্নিত এই মাদক সম্রাট আনিসের ফিরিস্তির প্রমাণ ও বস্তুনিষ্ঠ তথ্য উপাত্ত তুলে ধরে একাধিক গণমাধ্যমে প্রায়শঃই সংবাদ পরিবেশন করা হলেও কোনো এক অদৃশ্য শক্তির বলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ধরাছোঁয়ার বাইরেই থেকে যায় সে।

তবে,বৃহস্পতিবার মিরপুরের সর্বজন পরিচিত সাংবাদিক নজরুল ইসলামের উপর আনিসের নেতৃত্বে ন্যাক্কারজনক হামলার ঘটনায় মিরপুরবাসী তীব্র নিন্দার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদেরকে দ্রুত আইনের আওতায় আনতে সক্ষম হবেন বলেও আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন মিরপুরবাসী।

এবিষয়ে অভিযুক্ত আনিসের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি কোনো সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে রাজি নন বলে স্পষ্ট জবাব দেন। আর কখনো সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে তার সামনে আসা তো দূরের কথা, মুঠোফোনেও তাকে আর ফোন না করতে এই প্রতিবেককেও শ্বাসাতে ভুল করলেন না।

এবিষয়ে ডিএমপির শাহ্ আলী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) আমিনুল ইসলাম বলেন,বিষয়টিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ঘটনার প্রকৃত সত্য জানতে তদন্তে নেমেছে পুলিশ। ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেলে সে যেই হোক আইনের আওতায় এনে যথাযথ আইনানুগ শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।

আপনার জেলার সর্বশেষ সংবাদ জানুন