🕓 সংবাদ শিরোনাম

যে সংবাদের শিরোনামে ‘বিব্রত’ সময়ের কণ্ঠস্বর ! * গিনেস রেকর্ডে ফের শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করলেন ঠাকুরগাঁওয়ের রাসেল * অনিশ্চয়তার বেড়াজাল পেরিয়ে অবশেষে ঢাকা আসছেন ‘ড্যান্স কুইন’ নোরা ফাতেহি * বাসের ধাক্কায় দুই মোটরসাইকেল আরোহী নিহত * বড়দের সামনে সিগারেট খাওয়া নিয়ে দ্বন্দে কয়েকদফা সংঘর্ষ, আহত ১১ জন * বগুড়ায় ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে সাবেক সেনা সদস্য খুন * পণ্ড বিয়ের আয়োজন, বর গেলো শ্রীঘরে, অর্থদণ্ড হলো কনের বাবার * মসজিদে নামাজরত অবস্থায় যুবককে ছুরিকাঘাত, হামলাকারী গ্রেপ্তার * মারপিটের কারণে মাশা আমিনির মৃত্যু হয়নি: ইরানের ফরেনসিক বিভাগ * যশোরে ট্রাকের ধাক্কায় মোটরসাইকেল আরোহী তিন সহপাঠীর মর্মান্তিক মৃত্যু *

  • আজ শনিবার, ২৩ আশ্বিন, ১৪২৯ ৷ ৮ অক্টোবর, ২০২২ ৷

বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকা চলে, মাঝিদের জীবন চলে না

Keranigonj news
❏ মঙ্গলবার, আগস্ট ১৬, ২০২২ ঢাকা

মাসুম পারভেজ, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট: করোনা মহামারি ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সৃষ্ট সংকটে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের জীবনযাত্রায় একরকম হাঁসফাঁস অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। প্রয়োজনীয় সব পণ্যের মূল্য ঊর্ধ্বগতি। এ সময় বেড়েছে গ্যাস, বিদ্যুতের দামও। সেখান থেকে পরিত্রাণের আগেই নতুন করে যোগ হয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির উত্তাপ, যা ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র। এর প্রভাবে আরেক দফা বেড়েছে নিত্যপণ্যের দাম। কিন্তু বাড়েনি ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর সদরঘাট, ওয়াইজঘাট, শ্যামবাজার, সেয়ারীঘাট, নাগর মহল ঘাট, ব্রিজঘাট, জিনজিরা ঘাটসহ বিভিন্ন ঘাটে নৌকার মাঝিদের নদী পারাপারে ভাড়া।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাদের উপার্জন কমছে। মুখে নেই হাসি, কণ্ঠে হতাশার সুর! তারপরও বুড়িগঙ্গার বুকে নৌকা চালিয়ে এখনো বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখেন তারা। ইজারাদারের টাকা, মালিকের টাকা, পাহারা ও সিরিয়ালের টাকাসহ সব দাবি মিটিয়ে যা থাকে, তা দিয়ে বর্তমানে পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে যে নৌকা চলে তো জীবন চলে না বলে জানান ইদু মাঝি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বুড়িগঙ্গা নদীর দুপাড়ে সারি সারি নৌকা বাঁধা আর মাঝিরা তাকিয়ে যাত্রীর জন্য। কেউ কেউ ডাকছেন, ‘আহেন আহেন মামা, উডেন আমার নায়ে উডেন।’ প্রতিদিন ঘাটগুলোতে কয়েক হাজার নৌকা চালিয়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন শত শত মাঝি। কোনোমতে পেটেভাতে চলছে তাদের জীবন, নেই কোনো পরিবর্তন। দিনে যা আয় করেন, তার বেশির ভাগই বিভিন্ন খাতে ব্যয় হয়ে যায়। দিন শেষে সঞ্চয় বলে আর কিছু থাকে না। বেশির ভাগ মাঝির সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সারাদিন নৌকা চালিয়ে একজন মাঝি ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা আয় করেন। বিভিন্ন মহলকে দিয়ে এবং নিজে খরচ করে দিন শেষে সামান্যই থাকে, যা দিয়ে জীবন চলা ভার।

ওয়াজঘাটের এলাকার মাঝি আরফত আলী বলেন, আমি নৌকা বেয়েই সংসার চালাই। আমি কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা এলাকায় একটি টিনশেডের বাসায় একটি রুমে স্ত্রী-সন্তানসহ চারজন থাকি। দৈনিক যে টাকা আয় হয় তাতে বাসা ভাড়া, খাবার খরচ চালানোই কষ্ট হয়ে যাচ্ছে। রোজগারের অবস্থা ভালো না, ছেলে-মেয়েদের আর পড়াশুনা করাতে পারব কিনা জানি না। আমার স্ত্রী গৃহকর্মীর কাজ করেন। নৌকার আয়ে আর সংসার চলছে না। ভাবছি রিকশা চালাব। পোলাপান মানুষ করব।

সদরঘাট এলাকার মাঝি ফজলু মিয়া বলেন, বন্যা ও নদীভাঙনে সব কিছু হারিয়ে ঢাকায় বসবাস করছি। পরিচিত এক আত্মীয়ের বাসায় থেকে সদরঘাটে নৌকায় যাত্রী পারাপারের কাজ করছি। তবে বর্তমান সময়ে সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছি। দিনে ৬০০-৭০০ টাকা আয় করি। দৈনিক নৌকার মালিককে ভাড়া দেই ৯০ টাকা, চা, নাস্তা-বিড়ি ১০০ টাকা, দুপুরের খাবার ৯০-১১০ টাকা। থাকে ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা। পাঁচজনের সংসারে চাল, ডাল, তরিতরকারি কিনে মাছের বাজারে যাওয়ার সুযোগ খুব কম থাকে। এই টাকা নিয়ে বাজারে গেলে থলে ভরে না। জিনিসের যে দাম তাতে করে চলা মুশকিল। মাংসের মুখ চোখে দেখি না বহুদিন। আগে চলত কিন্তু সব জিনিসের দাম বাড়ায় এখন আর কুলাতে পারি না।

সোয়ারীঘাটের মান্নান মিয়া নামে এক মাঝি বলেন, সদরঘাটে প্রায় এক হাজার ২০০ মাঝি প্রতিদিন নৌকার বৈঠা হাতে নামেন বুড়িগঙ্গায়। মোট মাঝির সংখ্যা হবে প্রায় দুই হাজার। অতিরিক্ত পরিশ্রমের কারণে যিনি এক দিন চালান, তিনি আর পরের দিন বৈঠা হাতে নেওয়ার শক্তি পান না। তবে এত কষ্টের আয়ের বেশির ভাগ অর্থ থাকছে না মাঝিদের হাতে।

কেরানীগঞ্জের খোলামোড়া ও জিনজিরা এলাকার মাঝিরা জানান, যাত্রীর চাপ থাকলে দিনে ৫০০-৬০০ টাকা আয় হয়। শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনে আয় কম। ২০০-৪০০ টাকা আসে কোনোমতে। যাত্রীর সংখ্যাও দিনে দিনে কমছে। এরমধ্যে ডিজেলের দাম বাড়ায় ইঞ্জিনচালিত নৌকায় ৫-১০ টাকায় নদী পার করে সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। যারা বৈঠাচালিত নৌকা চালান, পাঁচ টাকা ভাড়ায় নদী পার করে তারাও সংসার চালাতে হিমশিম খাচ্ছেন। নিত্যপণ্যের দাম বাড়ায় জীবনযাত্রা দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে। আব্দুর রহিম নামের আরেক মাঝি বলেন, ইঞ্জিন লাগাইয়া এখন বেশি আসা যাওয়া করতে পারি। কিন্তু তেল খরচাই সব চইলা যায়।

এদিকে যাত্রীরা বলছেন, নৌকাঘাটে নৌকাভাড়া বাড়ানো হয়নি। তবে এখন প্রায়ই বকশিশ চান মাঝিরা। জ্বালানির দাম বাড়ায় তাদের খরচ বেড়েছে বলে জানান। যাত্রীরা সাধ্যমতো দেনও অনেক সময়। ইকবাল নামের একজন যাত্রী বলেন, প্রতিদিনই কাজের জন্য সদরঘাটে আসতে হয়। যখন তাড়া থাকে, তখন ইঞ্জিনচালিত নৌকায় আসি। যখন হাতে সময় থাকে, বৈঠাচালিত নৌকায় চড়ি। ভাড়া আগের মতোই আছে।

ব্যবসায়ী আকবর মিয়া বলেন, মাথাপিছু ১০ টাকা ভাড়া নেন মাঝিরা। পরিবারের সবাইকে নিয়ে বের হয়েছি। তাই নৌকায় অন্যদের তুলতে দিইনি, রিজার্ভ নিয়ে পার হয়েছি। ভাড়া যা হয়, তার থেকে ১০ টাকা বেশি দিয়েছি।

ঢাকা নৌকা মাঝি বহুমুখী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মন্টু মিয়া বলেন, সময়ের বিবর্তনে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে, নানা অজুহাতে পাবলিক পরিবহনের ভাড়াও বেড়েছে, তার পরও ভাড়া বাড়াননি মাঝিরা। একজন লোক পার করলে আগে নিতেন পাঁচ টাকা। এখনো সেই টাকাই নেন তারা। আমাদের সংগঠনটি জাতীয় শ্রমিক লীগের একটি সংগঠন, কিন্তু এখানে কোনো মূল্যই নেই। এর আগে ঘাটের দেখাশোনার দায়িত্ব দেওয়ার জন্য কয়েকবার দরখাস্ত করেছিলাম। সম্প্রতি আবারও করি, কিন্তু এখনো কোনো খবর নেই। মাঝিরা মানবেতর জীবন যাপন করলেও স্বাধীনতার পর থেকে কোনো সরকারই মাঝিদের কোনো ধরনের সাহায্য-সহযোগিতায় এগিয়ে আসেনি এমন অভিযোগ সমিতি ও মাঝিদের।

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আইনুল ইসলাম বলেন, উন্নয়ন বা সময়ের সাথে অনেক পেশার পরিবর্তন ঘটছে। আর প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের কারণে যে পেশাগুলো আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, পাশাপাশি এর সাথে মূল্যস্ফূতি যুক্ত হয়ে তাদের অবস্থাটা শোচনীয় হওয়ার পথে।