🕓 সংবাদ শিরোনাম

ইডেন ছাত্রলীগের সভাপতি-সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলা গ্রহণ করে তদন্তের নির্দেশ * ধর্ষণের ঘটনা আড়াল করতে কিশোরী হত্যা, এলাকাজুড়ে উত্তেজনা, আটক ২ * রাজধানীসহ ১০ বিভাগীয় শহরে গণসমাবেশ কর্মসূচির তারিখ ঘোষণা বিএনপির * একাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধী খলিল সাভার থেকে গ্রেপ্তার * কন্যা দিবসে এক ঘণ্টার ব্যবধানে তিন সন্তানের জন্ম ,নাম পদ্মা-মেঘনা-যমুনা * পরকীয়া সন্দেহে স্ত্রীকে ছুরিকাঘাতে হত্যা , পলাতক স্বামী * দালালদের নিয়ন্ত্রণে পাসপোর্ট অফিস, ‘বিশেষ সংকেত’ নিয়ে ভুক্তভোগীদের ক্ষোভ * মাঝপথে তরুণীকে বাইক থেকে নামিয়ে ধর্ষণের অভিযোগে চালক আটক * কিশোর গ্যাংয়ের হামলায় মুমূর্ষু অবস্থায় হাসপাতালে এসএসসি পরীক্ষার্থী * প্রধানমন্ত্রী শুধু দেশের দূরদর্শী নেতা নন, সারা বিশ্বেও নন্দিত নেতা: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী *

  • আজ বৃহস্পতিবার, ১৪ আশ্বিন, ১৪২৯ ৷ ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২২ ৷

কাতার চ্যারিটি’র নির্মিত পুনর্বাসন ভবনে গরু-ছাগল!


❏ বুধবার, আগস্ট ১৭, ২০২২ ঢাকা

স্টাফ করেসপন্ডেন্ট, গাজীপুর: আলিশান দু’তলা ভবন। মূল ফটক দিয়ে প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে শ্বেতপাথরে লেখা-গাজীপুর সদর পুনর্বাসন ভবন। দাতব্য সংস্থা ‘কাতার চ্যারিটি’র সহযোগিতায় নির্মিত। কক্ষগুলো অগোছালো,ছড়িয়ে ছিটিয়ের মেঝেতে পরিত্যক্ত সব জিনিস। তিনটি রুম ঘুরে একই অবস্থা। কৌতুহলী প্রতিবেদক কথা বলার ছলে উঠে বসলেন উপরের তলায়। এবার মিললো গরু,ছাগল! পরিবেশ দেখে মনেই হলো- এখানে দীর্ঘদিন যাবৎ গরু-ছাগলের আবাস। সম্প্রতি গাজীপুরের কাপাসিয়ায় সুবিধাবঞ্চিত নারীদের নানা সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত পুনর্বাসন কেন্দ্র ঘুরে এমন চিত্র পাওয়া যায়। অভিযোগ উঠেছে, ৫৩ লাখ টাকা ব্যয়ে কাতার চ্যারিটির নির্মিত কেন্দ্রটি নিজের বাড়ি হিসেবে ব্যবহার করছে রুদ্র আহমেদ রুবেল নামে এক যুবক। সেখানে পরিবার নিয়ে বসবাসের পাশাপাশি গরু-ছাগলের খামার গড়ে তুলছেন তিনি। অভিযুক্ত রুবেল স্থানীয় চাঁদপুর ইউনিয়নের নলগাঁও গ্রামের মৃত সুলতান উদ্দিনের ছেলে।

কাপাসিয়া উপজেলার পাবুর গ্রামে আড়াই বিঘা জমির এক অংশে পুনর্বাসন ভবনটি ২০১৯ সালে স্থাপন করা হয়। যদিও দাতব্য সংস্থার শর্তানুযায়ী পুনর্বাসন ভবনটি গাজীপুর সদরে নির্মাণের পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে কার্যক্রম চালুর কথা ছিল। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে পুনর্বাসন কেন্দ্রটি সদরে না হয়ে কাপাসিয়ার নির্জন জায়গায় হয়েও এই প্রজেক্ট (প্রজেক্ট নং-১৮০৬৩৭) এখন পর্যন্ত আলোর মুখ দেখেনি।

তথ্য রয়েছে-কাতার চ্যারিটি একটি মানবিক ও উন্নয়নমূলক অলাভজনক দাতব্য সংস্থা। যেটির সদর দফতর কাতারে অবস্থিত হলেও ১৯৯২ সাল থেকে পূনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপন,মসজিদ, হেফজখানা, কৃষি জমি প্রদান,গৃহনির্মাণ,গভীর নলকূপ,ওয়াটার প্লান্ট,হেলথ সেন্টার স্থাপনসহ দরিদ্র মানুষদের আর্থিকভাবে সাবলম্বী করতে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে কার্যক্রম চালিয়ে আসছে।

চারটি ধাপে ৫৩ লাখ টাকা অভিযুক্ত রুবেলের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে পাঠানো হয়েছে। নথিপত্রে পুনর্বাসন কেন্দ্রটির অবস্থান গাজীপুর সদরে হলেও অর্থ বরাদ্দ পাওয়ার পর দাতব্য সংস্থার সঙ্গেও প্রতারণার আশ্রয় নিয় রুবেল। পাবুর গ্রামে নিজের নামে ক্রয় করা প্রায় আড়াই বিঘা জমির এক অংশে স্থাপনাটি নির্মাণ করে বসবাস শুরু করে।

নিয়ম অনুযায়ী,বিদেশি অর্থায়নে যদি কোনো প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে হয় তাহলে ওই বিদেশি দাতব্য সংস্থাকে প্রথমে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের অধীনস্থ বিভাগ ‘এনজিও বিষয়ক ব্যুরো’র অনুমোদন নিতে হবে। এর জন্য প্রক্রিয়া মেনে নিবন্ধনের পর এনজিও বিষয়ক ব্যুরো’র অনুমোদন সাপেক্ষে বিদেশি সংস্থাটি অর্থ বরাদ্দ দিতে পারবে। এ ছাড়াও অনুদানে নির্মিত কোনো প্রকল্প চালু করতে স্থানীয় প্রশাসনের (ইউএনও) কাছ থেকে প্রত্যয়নপত্র নিতে হয়। এসব ক্ষেত্রেও নিয়ম মানা হয়নি। সমস্ত অর্থ সরকারের এনজিও বিষয়ক ব্যুরো অগোচরে ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে দেশে আনা হয়েছে। যা সম্পূর্ণ অবৈধ ও গর্হিত অপরাধ। এসব ছাড়াও নির্মাণ কাজ শেষের আগেই ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে দাতব্য সংস্থাটিকে রুবেল জানায় শর্তানুযায়ী প্রকল্পের সব কাজ সম্পন্ন হয়েছে। এরপর কাতার চ্যারিটি বাংলাদেশ’র অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে ওই বছরের ২৭ সেপ্টেম্বর একটি ছবি পোস্ট করে ক্যাপশনে বলা হয় ‘গাজীপুর সদরে কাতার চ্যারিটি স্থাপন করেছে সুবিধাবঞ্চিত নারীদের জন্য নানা সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত পূনর্বাসন কেন্দ্র।’ দাতব্য সংস্থাটি ওই পেজে তাদের কার্যক্রম সম্পর্কে নিয়োমিত আপডেট দিয়ে থাকে। এ বিষয়ে কাতার চ্যারিটির বাংলাদেশ অফিসে বিভিন্ন উপায়ে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

অনুসন্ধান বলছে,রুবেলের স্ত্রী মোসা. শিমু (২৮) পাঁচ বছর কাতার প্রবাসে ছিলেন। তার কফিল (নিয়োগকর্তা) ইব্রাহিম আল গোসাইবি ছিলেন কাতার চ্যারিটির একজন দাতা সদস্য। সেই সুবাদে বাংলাদেশে বিভিন্ন স্থাপনা তৈরিতে মাধ্যম হয়ে কাজ করতেন শিমু। তার হাত ধরে দেশে অসংখ্য মসজিদ, মাদ্রাসা, গৃহনির্মাণসহ গভীর নলকূপ স্থাপনে অনুদান এসেছে। অভিযোগ উঠেছে, অর্থ বরাদ্দ পেলেও মসজিদসহ এ দম্পতির মাধ্যমে আসা একাধিক প্রকল্পের কাজ অসমাপ্ত রয়েছে এবং যথাযথ নিয়ম মেনে হয়নি।

স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, পাবুরে স্থাপিত পুনর্বাসন কেন্দ্রের পাশ্ববর্তী আমিনুল ইসলাম বকুল নামের এক ব্যক্তির পুরনো নলকূপের ছবি দেখিয়ে রুবেল দাতব্য সংস্থাটি থেকে অনুদান এনে অর্থ আত্মসাৎ করেছে। এছাড়া একই এলাকার আরজ নামের আরেক ব্যক্তির তৈরি করা পাকা বাড়ির ছবি দেখিয়েও অনুদান এনে আত্মসাৎ করেছে রুবেল।

সরেজমিনে পাওয়া তথ্যানুযায়ী, বৃদ্ধাশ্রম তৈরির কথা বলে স্থানীয়দের কাছ থেকে জমি কিনেছে রুবেল। অথচ ভবন নির্মাণের পর সেখানে পরিবার নিয়ে বসবাস করছেন তিনি। পাশাপাশি গড়ে তুলেছেন গরু-ছাগলের খামার।

স্থানীয় বাসিন্দা আমিনুল ইসলাম বকুলের ভাষ্য,বৃদ্ধাশ্রম বানানোর কথা বলে জমি ক্রয় করেছে রুবেল। এলাকার সবাই জানে এটি বৃদ্ধাশ্রম। কিন্তু তিন বছর পর এসে রুবেল দাবি করছে ভবনটি ব্যক্তিগতভাবে বসবাসের জন্য সে তৈরি করেছে। এমনকি বকুলের পুরনো নলকূপে কাতার চ্যারিটির নামফলক বসানো হয়েছে। তিনি এ বাবদ কোনো অর্থ পাননি। রুবেল দাতব্য সংস্থাটির কাছে নলকূপের ছবি পাঠিয়ে অর্থ এনে আত্মসাৎ করেছে। তিনি বিদেশি দাতব্য সংস্থা থেকে আসা সব অর্থের সঠিক ব্যবহার হয়েছে কিনা এর সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানান।

Quater Charity

অভিযোগের বিষয়ে রুদ্র আহমেদ রুবেলের দাবি, প্রবাসে থাকা অবস্থায় ইব্রাহিম আল গোসাইবিকে তার স্ত্রী শিমু বাবা বলে সম্বোধন করতেন। সেই সুবাদে তার স্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে দাতব্য সংস্থাটির কাছ থেকে পাওয়া ৫৩ লাখ টাকা তার ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে চার দফায় গ্রহণ করেছেন। এরপর ভবনটি নির্মাণ করেন। তার মনগড়া এ দাবির স্বপক্ষে কোনো নথিপত্র বা প্রমাণ তিনি দেখাতে পারেননি। উল্টো দাবি করেছেন,অনুদানের ক্ষেত্রে নাকি কোনো ডকুমেন্টস হয় না। নিয়মের কোনো ব্যত্যয় ঘটাননি বলেও দাবি করেন।

এ বিষয়ে কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এ কে এম গোলাম মোর্শেদ খান জানান,অভিযুক্ত রুবেলকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। তার কাছে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র চাওয়ার পর সে কিছু নথিপত্র দেখিয়েছে; যেগুলো অসম্পূর্ণ। নির্দেশ দেওয়া হয়েছে কাতার চ্যারিটির ঢাকা অফিস থেকে কাগজপত্র সংগ্রহ করে দ্রুত সময়েরর মধ্যে দেখাতে। যদি কাতার চ্যারিটির শর্তানুযায়ী স্থাপনা পরিচালিত না হয়ে থাকে তাহলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, প্রকল্পের নামে ব্যক্তিগত হিসেবে অর্থ পাঠানো অবৈধ। প্রথমত কাতার চ্যারিটি নিয়ম ভঙ্গ করেছে। যিনি এই অর্থ গ্রহণ করেছেন তিনিও আইন-বহির্ভূত কাজ করেছেন। এভাবে প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে জনস্বার্থ দেখিয়ে নিজে লাভবান হওয়া ও ব্যক্তিগত লেনদেন আইনের চরম লঙ্ঘন। প্রকল্প বাস্তবায়নের নামে বিদেশ থেকে আসা অর্থ কোনোভাবেই ব্যক্তিগত হিসাবে গ্রহণ করতে পারেন না। এটি আইনগত ভাবে নিষিদ্ধ। আর জনস্বার্থ বা জনকল্যাণের নামে প্রকল্প তৈরি করে ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহারও চরম অপরাধ।

আপনার জেলার সর্বশেষ সংবাদ জানুন