• আজ রবিবার, ১৭ আশ্বিন, ১৪২৯ ৷ ২ অক্টোবর, ২০২২ ৷

ভেঙ্গে পড়েছে কক্সবাজার ছাত্রদলের সাংগঠনিক শক্তি

Cox's Bazar news
❏ শুক্রবার, আগস্ট ১৯, ২০২২ চট্টগ্রাম

শাহীন মাহমুদ রাসেল, কক্সবাজার: সঠিক নেতৃত্বের অভাব, গ্রুপিং-লবিং, সিনিয়র নেতাদের অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণে কক্সবাজারে স্থবির হয়ে পড়েছে ছাত্রদলের রাজনীতি। প্রতিষ্ঠার ৪৩ বছরে এসে এখন অনেকটাই পথহারা নাবিকের মতো উদভ্রান্ত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী কক্সবাজার ছাত্রদল।

অভিযোগ উঠেছে, আন্দোলন-সংগ্রামে বিএনপির ‘ভ্যানগার্ড’ খ্যাত এ সংগঠনটি নিজেদের প্রতিষ্টা বার্ষিকী পর্যন্ত পালন করতে পারেনি কক্সবাজারে। এখন প্রায় অক্ষম ও নিস্ক্রিয়। তিন দফা সরকারবিরোধী আন্দোলনে অনুপস্থিতি, চরম অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে দায়িত্বশীলদের পারস্পরিক অনাস্থা, বিভক্তি, ত্যাগী নেতাদের দলে জায়গা না হওয়া, সর্বোপরি দীর্ঘদিন পূর্ণাঙ্গ কমিটি না হওয়ায় কক্সবাজারে ভেঙে পড়েছে এর সাংগঠনিক শক্তি।

জেলা ছাত্রদলের একাধিক সাবেক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘এভাবে কোনো সাংগঠনিক কর্মকান্ড চলতে পারে না। এভাবে আর যাই হোক সংগঠনকে শক্তিশালী করা যায় না। এর ফলে ৫ সদস্যের জেলা কমিটি এবং সব উপজেলায় আহ্বায়ক কমিটি থাকলেও কোনো কর্মসূচি দেখা যাচ্ছে না। তারা বলছেন, এসব কমিটির নেতাদের অনেকে বিয়ে করে সন্তানের বাবা হয়েছেন। কেউ কেউ চাকরি কিংবা ব্যবসায় নেমেছেন। এসব কারণে মুখ থুবড়ে পড়েছে কক্সবাজারে ছাত্রদলের কার্যক্রম।’

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, যোগ্য নেতা নির্বাচনে ব্যর্থতার কারণে ছাত্রদলের নেতৃত্বে ফাটল ধরেছে। একই সঙ্গে ভেঙে যাচ্ছে বিএনপির এই ছাত্র সংগঠন। আচমকা রাজনীতি করতে আসা মাদক ব্যবসায়ী, সন্ত্রাসীদের কবলে পড়ে মুখ থুবড়ে পড়েছে ছাত্র সংগঠনটির রাজনীতিও।

দলীয় সূত্র জানায়, বিএনপির সিনিয়র নেতাদের অযাচিত হস্তক্ষেপ, স্বজনপ্রীতি, অযোগ্যদের পদায়নের কারণে ছাত্রদলের রাজনীতিতে বিভক্তি স্পষ্ট হচ্ছে, যে কারণে নেতৃত্ব নিয়ে চলছে টানাপোড়েন। কাঙ্ক্ষিত পদ না পাওয়ায় প্রতিনিয়ত ছাত্রদলের নেতাদের মধ্যে বাড়ছে হতাশা ও বিভ্রান্তি। অবশ্য ছাত্রদলের এমন করুণ দশার জন্য অনিয়মই দায়ী বলে মনে করছেন ছাত্রদলের সাবেক নেতারা।

সংগঠনের সূত্র জানায়, ২০১৮ সালের ১৯ আগস্ট কক্সবাজার জেলা ছাত্রদলের ৫ সদস্য বিশিষ্ট কমিটি ঘোষণা করা হয়। এতে শাহাদৎ হোসেন রিপনকে সভাপতি ও ফাহিমুর রহমান ফাহিমকে সাধারণ সম্পাদক করা হয়। কমিটিতে সাইফুর রহমান নয়নকে সিনিয়র সহ-সভাপতি, মিজানুল আলম সি. যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও আনিসুর রহমানকে সাংগঠনিক সম্পাদক করা হয়। পরে সভাপতি রিপন এবং সম্পাদক ফহিম টেকনাফ উপজেলা, রামু, চকরিয়া পৌরসভা, মহেশখালী পৌরসভা, কক্সবাজার সরকারি কলেজ, কক্সবাজার আইন কলেজ ও কক্সবাজার সিটি কলেজ শাখা ছাত্রদলের কমিটি অনুমোদন দেন।

কিন্তু ওইসব কমিটি সংগঠনের মধ্যে শৃঙ্খলা পরিপন্থি কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সুস্পষ্ট অভিযোগ এনে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি শাহাদাত হোসেন রিপন ও সাধারণ সম্পাদক ফাহিমুর রহমানের পদ স্থগিত এবং দলীয় পদ পদবী ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেয় কেন্দ্রিয় ছাত্রদল।

পরে অবশ্যই ২০২০ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শাহাদাত হোসেন ও সম্পাদক ফাহিমুর রহমান ফাহিমের অব্যাহতির আদেশ প্রত্যাহার করে আবার স্বপদে বহাল করা হয়। এরমধ্যে আনিসুর রহমান বিয়ে করে সংসারীও হয়েছেন। কিন্তু পাঁচ সদস্যের এই কমিটির নেতারা নানানভাবে বিভক্ত ও তাদের মধ্যে সমঝোতা না হওয়ায় কমিটির মেয়াদ শেষ হলেও পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা সম্ভব হয়নি বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।

অভিযোগ রয়েছে, জেলা ছাত্রদলের কমিটি ঘোষণা করার পর নেতাকর্মীরা বিএনপির দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে যায়। ফলে গত ৪ বছরেও জেলা ছাত্রদল সুসংগঠিত হতে পারেনি। দলীয় কার্যক্রমে নেতাকর্মীদের তেমন দেখা যায় না। এই গ্রুপ দুটির নেতৃত্ব দেন কেন্দ্রীয় বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহ উদ্দিন আহমদ ও কেন্দ্রীয় বিএনপির মৎস্যজীবি বিষয়ক সম্পাদক লুৎফুর রহমান কাজল।

নেতাকর্মীদের অভিযোগ, সালাহ উদ্দিন আহমদ একালায় না থাকলেও তার নির্দেশনার বাইরে দলের কেউই ‘পান থেকে চুন খসার’ সুযোগ পাইনা। জেলা থেকে ওয়ার্ড পর্যন্ত দলীয় সবকিছুতেই তিনিই নেতৃত্ব দেন। আবার অন্যদিকে, আধিপত্য বিস্তার, দল নিয়ন্ত্রন, প্রভাব ও পছন্দের মানুষকে দলে জায়গা করে দেওয়া ও দলের বিপ্লবীদের কে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া থেকে শুরু করে সব বিষয়ে নিয়ন্ত্রন করে যাচ্ছে সাবেক সাংসদ লুৎফুর রহমান কাজল।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক নেতা বলেন, ‘বর্তমান সময়ে ওয়ার্ড থেকে জেলা পর্যায়ের সকল নেতাকর্মী ও অনেক এমপি-মন্ত্রী বিভিন্ন মামলায় জর্জরিত হলেও এই সাবেক সাংসদ লুৎফুর রহমান কাজল সরকারী দলের উচ্চ মহলের সাথে দহরম মহরম সম্পর্ক থাকা তে তিনি বিগত চৌদ্দ বছরের মধ্যে কোন মামলাতে পড়েননি যা বর্তমান কক্সবাজার জেলার সংগঠনটির নেতাদের বড় প্রশ্ন।’

তবে সংগঠনটির কক্সবাজারের শীর্ষ নেতারা বলছেন, সাময়িকভাবে আদর্শের কক্ষপথ থেকে বিচ্যুত হলেও সঠিকভাবে নেতৃত্ব দিতে পারলে এবং যোগ্যদের সংগঠনে অন্তর্ভুক্ত করতে পারলে পুরনো রূপে ফিরবে ছাত্রদল। সেজন্য যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধিসহ সার্বিক কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে।

তৃনমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, জেলা সভাপতি/সম্পাদক শূন্যপদ পূরণে ব্যর্থ। এরই মধ্যে পদপ্রত্যাশীদের মাঝে চরম অসন্তোষ ও হতাশা সৃষ্টি হয়েছে। তারা বিএনপির কাজল-সালাউদ্দিনের তোষণ করে পদ বাগিয়ে নিয়েছেন। ছাত্রদলকে নিয়ন্ত্রণ করা নিয়েও কেন্দ্রীয় বিএনপির সিনিয়র নেতাদের মধ্যে অনৈতিক প্রতিযোগিতারও অভিযোগ রয়েছে। সিনিয়র নেতাদের কোন্দল, অযাচিত হস্তক্ষেপের কারণে ছাত্রদল নেতারা রাজপথ বাদ দিয়ে তাদের পিছু পিছু ঘুরেন। ছাত্রদলকে নিষ্ক্রিয় করে রাখার জন্য বিএনপির এই দুই নেতার অনেক দায় রয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ছাত্রদলের কয়েকজন নেতাকর্মী জানান, জেলা-উপজেলা ছাত্রদলের কমিটিতে শীর্ষ পদে বিবাহিত নেতারা থাকায় অন্যান্যরা বঞ্চিত হয়েছেন। দলীয় কোনও কার্যক্রমে তাদের দেখা যায় না। ফলে বিভিন্ন উপজেলায় ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীও পালন করা হয়নি। জেলা-উপজেলা ও পৌর বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে গ্রুপিং থাকায় ঝিমিয়ে পড়েছে কক্সবাজার ছাত্রদল।

অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, জোর করে কমিটি আদায়, কমিটি বাণিজ্য যেন বিএনপি চিরাচরিত রাজনৈতিক চরিত্রে পরিণত হয়েছে বলে দাবি করে বিএনপির পদবঞ্চিত এক নেতা বলেন, অনিয়ম না করে বিএনপি কখনো রাজনীতি করতে পারে না। অনিয়ম ও অপরাজনীতির জন্যই বিএনপি রাজনীতি করে। ভুল রাজনীতি ও রাজনৈতিক দূর্বত্তায়নের জন্যই বিএনপির রাজনীতি স্থবির হয়ে পড়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

তবে সংগঠনের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওয়ার্ড থেকে জেলা পর্যন্ত ছাত্রদলকে পুনর্গঠন এবং বহুধাবিভক্ত নেতাদের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি করাই এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিষ্ঠার চার যুগ পরে সংগঠনটি ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।

সদর ছাত্রদলের আহ্বায়ক রাশেদুল করিম রাশেদ বলেন, ‘চলার পথে শত ঘাত-প্রতিঘাতের পরে ছাত্রদল এখন খাঁটি সংগঠনে পরিণত হয়েছে। প্রতিনিয়ত পরিবর্তনের মধ্যে দিয়ে অভিজ্ঞ একটি সংগঠনের রূপ নিয়েছে সংগঠনটি। ছাত্রদল চেষ্টা করছে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সাংগঠনিক পুনর্গঠনসহ সার্বিক কার্যক্রমে গতি আনতে।’

তিনি বলেন, ‘এখন মানুষের গণতান্ত্রিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। সভা-সমাবেশ করতে দেওয়া হয় না। কিন্তু এই অবস্থা বেশি দিন থাকবে না। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ছাত্রদল ঠিকই গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারে কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। সাংগঠনিক শক্তি বৃদ্ধিতে ছাত্রদল কাজ করছে বলেও জানান সংগঠনটির এই নেতা।’

কক্সবাজার জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শাহাদৎ হোসেন রিপনের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তিনি ফোন ধরেন নি। তবে সাধারণ সম্পাদক ফাহিমুর রহমান ফাহিম বলেন, ‘কেন্দ্রিয় কমিটির বাইরে একটি ইউনিয়ন কমিটিও করার সুযোগ নেই। কেন্দ্রের কাছে সংগঠনিক কার্যক্রমে কক্সবাজার ছাত্রদল অন্যতম।’

তিনি বলেন, ‘কমিটি হওয়ার পর থেকে গণতান্ত্রিক আন্দোলনগুলোতে ছাত্রদল সবসময়ই সক্রিয় ছিল। নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে হয়তো প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি ছাত্রদল, কিন্তু রাজপথে ঠিকই আন্দোলন করেছে।’

তবে এইসব অভিযোগ অস্বীকার করে কেন্দ্রীয় বিএনপির মৎস্যজীবি বিষয়ক সম্পাদক লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, ‘গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ছাত্রদলের সাংগঠনিক কার্যক্রম চলে। কেন্দ্রিয় ছাত্রদল জেলা-উপজেলা নিয়ন্ত্রণ ও দেখভাল করে। যারা ত্যাগী তারাই পদ পদবী পেয়ে থাকে। এতে আমরা হস্তক্ষেপ করি এমন কথা যদি কেউ বলে থাকে তা সম্পুর্ন মিথ্যা এবং ভিত্তিহীন।