• আজ বুধবার, ২০ আশ্বিন, ১৪২৯ ৷ ৫ অক্টোবর, ২০২২ ৷

৩ বছর ধরে শিকলে বন্দি ফারুকের জীবন, ছেড়ে গেছে স্ত্রীও


❏ মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ৬, ২০২২ ঢাকা, দেশের খবর

হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর প্রতিনিধি: তিন বছর ধরে লোহার শিকলে বন্দি মানসিক ভারসাম্যহীন ৫০ বছর বয়সী মো. ওমর ফারুকের জীবন। নিজ ঘরের পিছনে একটি টিনের খোলা ছাপড়ার নিচে তাকে কোমরে শিকল আর তালা দিয়ে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার শরীরের থাকে না কোন কাপড়-চোপড়। বস্ত্রহীন থাকতে পছন্দ করেন তিনি। সেখানে চলছে তার খাওয়া-দাওয়া আর প্রসাব-পায়খানা।

স্বামীর এমন পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে টানা ১৭ বছর সংসার ছেড়ে চলে যান স্ত্রী। একমাত্র ছেলের পড়ালেখাও মাটি হয়ে গেছে। তছনছ হয়ে গেছে ফারুকের পুরো সংসার।

ফারুক ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের সদরবেড়া গ্রামে মৃত শেখ আমিন উদ্দিনের ছেলে। বাবা এক যুগ আগে মারা গেছেন। তিন ভাই এক বোনের মধ্যে ফারুক ছিলেন দ্বিতীয়। অভাবের কাছে হার মেনে ৬ষ্ঠ শ্রেণি পাশ করে বাবার সাথে সংসারের হাল ধরেন তিনি। বছর বিশেক আগে উপজেলার রামনগর ইউনিয়নের কুঞ্জনগর গ্রামে বিয়ে করেন। সুখের সংসারে একটি ছেলে ও একটি মেয়ে সন্তান জন্ম নেয় এই দম্পত্তির। ফারুকের জীবন কাহিনীর এসব তথ্য জানান প্রতিবেশীরা ।

ফারুকের ৮০ বছর বয়সী মা ফুলি বেগম বলেন, ২২-২৩ বছর আগে একদিন গভীর রাতে বাড়ির পাশের ফসলি মাঠে যায় ধানের খড় আনতে। সেখান থেকে বাড়ি ফিরেই পাগলামি শুরু করে। পরনের কাপড় ছিড়ে ফেলে ও ঘরের আসবাবপত্র ভাংচুর করে। চিকিৎসা করার পর সে সুস্থ হয়। পরে তাকে বিয়ে করিয়ে দেই। গত ৩ বছর আগে ফারুক আবার পাগলামি শুরু করে। ২-৩ বার তাকে পাবনা মানসিক হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দিলেও সে ভালো হয় না। তারপর থেকে বাধ্য হয়েই তাকে শিকলবন্ধি করে রেখেছি।

তিনি আরো বলেন, শিকল খুলে দিলে কারো ক্ষতি করবে, অথবা কোথাও চলে যাবে। তাই কোথাও যাতে যেতে না পারে তার কারণেই ওকে শিকলবন্ধি করে রাখা হয়েছে। এখন টাকা-পয়সার অভাবে ওকে সঠিক চিকিৎসা করাতে পারছিনা। অভাবের তাড়নায় গত দেড় মাস আগে ওর বউ রাশিদা বেগম সংসার ছেড়ে চলে গেছে। শুনেছি সংসার ছেড়ে সে নাকি সৌদি আরব চলে গেছে। এখন ওর দেখাশুনা খাওয়া-দাওয়া সবই আমার এই বয়সে করতে হয়।

তিনি বলেন, ফারুক ভাল থাকতে তার ছেলে ইলিয়াস শেখ সুন্দরভাবে পড়ালেখা চালিয়ে গেছিল। সেভেন পর্যন্ত পড়ালেখা করে ইলিয়াস। এরই মধ্যে বাবার পাগল হওয়ার পর পড়ালেখা বাদ দিয়ে ঢাকায় মামার দোকানে কাজ করা শুরু করে। মেয়ে ৬ বছর বয়সী রাবেয়া বেগম নানার বাড়ীতে একটি কওমী মাদ্রাসায় ভর্তি হয়েছে। ফারুকের সু-চিকিৎসার জন্য তার মা ফুলি বেগম স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও সরকারের কাছে সাহায্যের আবেদন জানিয়েছেন।

তালমা ইউপি চেয়ারম্যান মো. কামাল হোসেন মিয়া বলেন, বিষয়টি জানার পর ফরুকের বাড়িতে গিয়েছিলাম। তার সু-চিকিৎসার জন্য আমার পক্ষ থেকে সহযোগিতা করবো।

নগরকান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম ইমাম রাজি টুলু বলেন, মানসিক ভারসাম্যহীন ফারুকের খোঁজখবর নিতে তার বাড়িতে গিয়েছিলাম। ওর ভাল চিকিৎসার করার জন্য যা করার দরকার তার সবই আমার পক্ষ থেকে করা হবে।