❛খেলা হবে❜, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার লড়াইয়েও ?


❏ বুধবার, সেপ্টেম্বর ৭, ২০২২ প্রজন্মের ভাবনা, স্পট লাইট

আয়শা আক্তার, সময়ের কণ্ঠস্বর, ঢাকা : ❝খেলা হবে❞ ! দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক সমাবেশগত বলিষ্ঠ উক্তি হিসাবে “খেলা হবে” জায়গা নিয়েছে। শুরুটা অবশ্য বরেণ্য রাজনীতিক এ কে এম শামসুজ্জোহা পুত্র সাংসদ শামীম ওসমানের মুখ থেকেই ফেরে। ❝খেলা হবে❞ ও এই উক্তির রাজনৈতিক শ্লেষ, সূত্রমতে, এপার বাংলা ছাড়িয়ে ওপার বাংলায় গিয়েও ঠেকেছিল।

এদিকে এখন বাংলাদেশে কার্যত রাজনৈতিক উত্তাপ না থাকলেও, চেষ্টা একটা চলছে। কয়েকবার করে দেশের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসা বাংলাদেশ জাতীয়তবাদী দল বিএনপি বলতে চাইছে, “আমরা ওয়ার্ম আপ করছি, খেলা হবে।”

অন্যদিকে টানা তিন মেয়াদের ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারন সম্পাদক ওবায়দুল কাদের অতি সম্প্রতি এক সমাবেশে বিএনপির উদ্দেশে প্রতিউত্তরে বলেছেন, “আসুন, খেলা হবে।”

“বৈশ্বিক রাজনীতির সাথে সমন্বয় করা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে মোকাবিলা করে কার্যকর নেতৃত্ব দেয়া, দলের সংগঠন এর সাংগঠনিক দিকটায় সফল হওয়া এবং জনআস্থা অর্জনের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তাকে ধরে রাখার মাধ্যমেই সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে।”——- বলছেন, নিউইয়র্ক প্রবাসী রাজনৈতিক বিশ্লেষক ইউসুফ আলী।

অপরদিকে, খেলা সত্যিই বাংলাদেশের দ্বিদলিয় রাজনৈতিক শক্তির মধ্যকার অনুষ্ঠিত হবে কিনা, তা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও খেলা একটা হতে যাচ্ছে বলে মত রাখছেন অনেকেই। তাঁরা বলছেন, “খেলা হবে, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার লড়াইয়েও।” —- এমন মত খোদ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের এবং দলটির নীতি নির্ধারণী পর্যায়েও তেমন আলোচনা রয়েছে, রয়েছে আওয়ামী লীগের কয়েক কোটি নেতাকর্মীদের মাঝেও।

প্রখ্যাত কলাম লেখক সদ্য প্রয়াত সাংবাদিক আব্দুল গাফফার চৌধুরী রাজনৈতিক ধারাভাষ্য দিতে যেয়ে গেল একযুগে বারবার করে বলেছেন যে, “দলের জন্য, দেশের জন্য এবং বৈশ্বিক সমঝোতা-সম্নবয় মিলিয়ে প্রায় সব দিকই দলের লেজেন্ডারি রাজনীতিক প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা আগলিয়ে রাখার জন্য শ্রেষ্ঠ সত্তা, তাই সেখানে গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকেও অন্যদের কাজও সহজ হয়ে যাচ্ছে বা যায়।”

দেশের ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের আসন্ন সম্মেলন ঘিরে কে হতে যাচ্ছেন দলটির সাধারণ সম্পাদক, তা নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক খেলা হতে যাচ্ছে কিনা, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা কী বলছে দেখে নেয়া যাক।

এদিকে রাজনৈতিক ধারাভাষ্যকার ও সাংবাদিক আয়শা এরিন অতি সম্প্রতি লিখে বলেছেন যে, “টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগের সামনে সাতটি চ্যালেঞ্জ দাঁড়িয়ে গেছে। এরমধ্যে প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি ও তাদের সমর্থিত রাজনৈতিক শক্তিকে মোকাবিলা করা। দুই নম্বর চ্যালেঞ্জ হল, বৈশ্বিক শক্তির চাপ সামলিয়ে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ধরে রাখা। তিন-এ রয়েছে জনশ্রেণির আস্থা অর্জনে ধারাবাহিকতা রক্ষা করা। চার, অভ্যন্তরীণ সংকট কাটিয়ে ক্রেডিবল একটি কাউন্সিল বা সম্মেলনের মধ্য দিয়ে দলকে পুনর্গঠন করা। পাঁচ নম্বর চ্যালেঞ্জ হিসেবে আওয়ামী লীগের সামনে রয়েছে রাজনৈতিক জোটকে পুনরায় গুরুত্ব দিয়ে সমমনাদের মূল্যায়ন করার বিষয়টি। ছয় নম্বর চ্যালেঞ্জ হিসেবে দলটির সামনে রয়েছে- প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা সে সব আমলাদের শনাক্ত করা, যারা একটি বিশেষ শক্তির স্বার্থ সংরক্ষণে কাজ করে যাচ্ছে বা যেতে পারে। সবশেষ, সাত নম্বরে রয়েছে সুশীল সমাজের নামে রাজনৈতিক উচ্চাভিলাষীদের উপদ্রব প্রতিহত করা।”

ধারণা করা হচ্ছে, আগামী বছরের শেষভাগে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সম্ভাবনাই বেশী। এদিকে আওয়ামী লীগের সম্মেলন এই বছরের ডিসেম্বরে হওয়ার কথা রয়েছে । এই প্রসঙ্গে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য আবদুর রাজ্জাক বলছেন, “এবারের সম্মেলন খুব গুরুত্বপূর্ণ। সম্মেলন থেকেই নির্বাচনের হাওয়া শুরু হবে।”

সূত্র এবং কঠিন বাস্তবতা বলছে, আওয়ামী লীগ একটি ভাগ্যবান দল ,যারা শেখ হাসিনার মত একজন বিশ্বনেত্রী পেয়েছেন। সঙ্গত প্রেক্ষাপটের আলোকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের সকলজনাই বলছেন, আওয়ামী লীগের আসন্ন কাউন্সিলে শেখ হাসিনা সভানেত্রী হিসাবে থাকবেন তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা বোকামি হলেও দলের সাধারন সম্পাদক পদ নিয়ে দলটি নতুন নেতার সন্ধান করতে যাচ্ছে বলে অনুমিত হয়।

এদিকে বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের শারীরিক সামর্থ্য নিয়ে আগের মত করে দলের জন্য ভুমিকা না রাখতে পারলেও তাঁকে প্রতিদিনই সংবাদমাধ্যম কর্তৃক তাঁর অবস্থান স্পষ্ট করতে দেখা যায়। অনেকের কাছে এই প্রশ্নও রয়েছে যে, তিনি কি এমন গুরুদায়িত্ব নিয়ে পুনরায় সাধারণ সম্পাদক হয়ে বহাল থাকতে চান কিনা !

সাত চ্যালেঞ্জের দিক পর্যালোচনা করলে আওয়ামী লীগের জন্য একজন খুবই দক্ষ, সৎ, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন সাধারণ সম্পাদকের দরকার। যিনি মুলত সেনাপতি হয়ে শেখ হাসিনার দেশ পরিচালনা কে মসৃণ করতে নিজ দলের হয়ে শ্রেষ্ঠ মুখপাত্র হয়ে সবদিক ঠিক রাখবেন। সমন্বয় করবেন। বর্তমান সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের গেল এক মাসে নিজের গতি বাড়িয়েছেন। এতে করে বোঝা যাচ্ছে যে, তিনি পুনরায় এই দায়িত্বে থাকার মানসে আছেন।

অন্যদিকে, এবারের কাউন্সিলে নতুন সাধারণ সম্পাদক হিসাবে কে নির্বাচিত হতে যাচ্ছেন, তা নিয়ে জোর গুঞ্জনই কেবল নয়, ভেতরে ভেতরে অনেক নেতার সুপ্ত বাসনা প্রকাশ্যে চলে আসছে। যে তালিকায় জাহাঙ্গীর কবির নানক, আবদু রহমান, খালিদ মাহমুদ চৌধুরী ও বাহাউদ্দীন নাসিমের নাম রয়েছে।

“আওয়ামী লীগে শীর্ষ পদ নিয়ে গেল ৩১ বছরে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করেনি। শেখ হাসিনার স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের আগে কামাল হোসেন- মালেক উকিলেরা অবশ্য কাউন্সিলে চেয়ার ছোড়াছোড়ি করেছেন। আজকের সময়ে উক্তিময় কৃষ্টি ‘খেলা’ তাই শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দলের মধ্যে হয় নি, হবেও না। তবে, দলের জন্য সেরাটা দিতে যেয়ে স্বপ্ন দেখেন অনেকেই। সেই স্বপ্ন পূরণ করতে হলে জাতীয় মুখপাত্র হওয়াটাও অত সহজ নয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হওয়া মানে একটি দেশের অন্যতম প্রধান মুখপাত্র হয়ে যাওয়া। তাঁর চলন- বলন পরখ করতে হবে, প্রত্যুপন্নমতি হওয়া, দূরদৃষ্টি ও চরিত্র থাকতে হবে , দেশপ্রেম আছে কিনা, বক্তা হওয়া—সবই প্রয়োজন। তিনি যখন কথা বলছেন, তখন দেশবাসী তাকে টিভিতে কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখছে, যেন উপেক্ষা করে মানুষ না চলে যায়— বলছিলেন, সমাজ ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী আহসান আহমেদ। ”

তবে, দলের তিন প্রেসিডিয়াম সদস্যের মধ্য থেকে এবার নতুন সাধারণ সম্পাদক কে দেখা যাবে বলে আলোচনা ক্রমশ বাড়ছে। যে তিন নেতার নাম আলোচনার তুঙ্গে রয়েছে, তাঁরা হলেন- এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, ডক্টর আব্দুর রাজ্জাক ও জাহাঙ্গীর কবির নানক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দিল্লি সফরের পরই আওয়ামী লীগ ডিসেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য সম্মেলন নিয়ে মেতে যাবে বলে দলের নীতি নির্ধারণ পর্যায়ের একজন নেতা সংশ্লিষ্ট সুত্রকে  বলছেন, “শেখ হাসিনা যেভাবে বলবেন সেভাবেই দলকে সুগঠন করা হবে এবং তিনি জানেন কী করতে হবে !”

সাধারণ সম্পাদক পদে অন্যান্যদের মধ্যে যাদের নাম উচ্চারিত হচ্ছে তাঁরা হলেন, মাহবুব উল আলম হানিফ, মির্জা আজম, দীপু মনি, হাছান মাহমুদ ও ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস।

দলের গুরুত্বপূর্ণ অপরাপদ পদ নিয়েও চলছে নানা বিশ্লেষণ। দপ্তর সম্পাদক থেকে শুরু করে যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক পদের জন্যও নেপথ্যে চাওয়া-পাওয়ার লড়াই চলছে। আওয়ামী লীগের জাতীয় কাউন্সিলে সাংগঠনিক পদ নিয়ে ফিরতে পারেন তাজউদ্দীন আহমেদ তনয় সোহেল তাজও। শামীম ওসমানও কারণে অকারণে বিভিন্ন সভায় বক্তব্য বাড়িয়েছেন কেন, তা নিয়ে অনুসন্ধানী প্রেক্ষাপট জানাচ্ছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে নারায়ণগঞ্জে কেন রাজনৈতিক সংঘাত হল এবং এর সুন্দর সমাধানে শামীম ওসমান কাজ করতে পারলে তাঁর দলের হয়ে গুরুত্ব বাড়ে বলে মনে করার রহস্যময় দিক রয়েছে।

আওয়ামী লীগের আসন্ন সম্মেলন নিয়ে বিভিন্ন পদে অনুমাননির্ভর নানাজনের নাম আসলেও নীতিনির্ধারকরা বলছেন, প্রবীণ-নবীনের সংমিশ্রনে আগামী কেন্দ্রীয় কাউন্সিলে নতুন নেতৃত্ব গঠিত হবে। তবে গতবারের কেন্দ্রীয় কমিটি ও মন্ত্রিসভার মতো এবারও বড় চমক আনতে পারেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

চমক হিসাবে এই মুহূর্তে সবচাইতে বড় আলোচনায় রয়েছেন দলটির সভাপতিমন্ডলীর সদস্য এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন। যিনি সাধারণ সম্পাদক পদে অধিষ্ঠিত হতে পারেন। দলের ত্যাগী নেতা ওবায়দুল কাদের থেকে যাবেন, নাকি তিনি আসবেন এই পদে—এমন আলোচনা গুরুত্বসহকারে আওয়ামী লীগের মধ্যে বেড়েছে।

বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে তুলকালাম কান্ড প্রতিহত করার সত্যিকারের চ্যালেঞ্জ আওয়ামী লীগের রয়েছে। দলটি চাইবে একটি ক্রেডিবল সম্মেলন করতে। তবে দলের মধ্যে পদ পেতে ব্যকুল হওয়ার লড়াই রয়েছে। শেখ হাসিনা হয়তো পুনরায় তাই চমক দেখিয়েই বলবেন, “জয় বাংলা ! চলো, দলকে এগিয়ে নিয়ে যাই।”