দেবী দুর্গাকে বরণ করতে কেরানীগঞ্জে সাজ সাজ রব

National news
❏ বুধবার, সেপ্টেম্বর ২১, ২০২২ ঢাকা

মাসুম পারভেজ, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট: বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে ঢাকার কেরানীগঞ্জে চলছে সাজ সাজ রব। দেবী দুর্গাকে বরণ করে নিতে কেরানীগঞ্জে বিভিন্ন পূজামন্ডপের কোথাও চলছে মাটির কাজ, আবার কোথাও প্রতিমাকে রাঙিয়ে তুলতে ব্যস্ত শিল্পীরা। দিনরাত পরিশ্রম করে তাদের নিপুন হাতের ছোঁয়ায় তৈরি করছেন একেকটি অসাধারণ প্রতিমা।

উপজেলার কেরানীগঞ্জ মডেল ও দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার বিভিন্ন মন্দির প্রাঙ্গণে নানা আকার ও ঢংয়ের দুর্গাদেবী বানানো হচ্ছে। উপজেলার ২টি থানায় ১২ টি ইউনিয়নের ১৫১ টি মন্ডপে হিন্দু সম্প্রদায়ের সর্ববৃহৎ ধর্মীয় অনুষ্ঠান শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হবে। আর এই উৎসবকে সামনে রেখে পূজা উদযাপনের প্রস্তুতি যেন পুরোদমে এগিয়ে চলছে। তবে প্রতিমা নির্মাণের প্রয়োজনীয় উপকরণের দাম আগের তুলনায় বেশি হওয়াতে লাভ কম হবে বলে আশঙ্কা কারিগরদের। তারানগর ইউনিয়নের প্রতিমা শিল্পী মাখন পাল বলেন, তাড়াতাড়ি কিভাবে কাজ নামানো যায় তাই আমরা দিনরাত পরিশ্রম করছি। সব জিনিসের দাম বেড়ে গেছে। এবার আমাদের লাভ কম হবে।

সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, উপজেলা কেরানীগঞ্জ মডেল ও দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের স্থায়ী ও অস্থায়ী ভিত্তিতে নির্মিত পূজা মন্ডপগুলোতে মৃৎশিল্পীরা প্রতিমার বিভিন্ন অংশে মাটি ও পানির মিশ্রণে সৃষ্টিশীল হাতের ছোঁয়ায় নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। পূজা ঘনিয়ে আসায় কারিগররা যেন দম ফেলার ফুরসত পাচ্ছেন না। কাজের চাপ বেশি থাকায় পুরুষের পাশাপাশি নারী মৃৎশিল্পীরাও কাঁদামাটি দিয়ে পরম যত্নে দেবীর মুকুট, হাতের বাজু, গলার মালা, শাড়ির নকশা, প্রিন্ট ও দেব-দেবীর চুল তৈরি করছেন। এরপর প্রতিমাতে দেওয়া হবে রংতুলির আঁচড়। নানা বৈচিত্র্যময় ভঙ্গির এসব প্রতিমাগুলো শৈল্পিক প্রশংসা কুড়ালেও এসব মৃৎশিল্পীদের জীবনে আসেনি কোনও সৌন্দর্যময় আলোর ছায়া বলে জানা গেছে। এছাড়াও প্রতিমা শিল্পীদের সঙ্গে ব্যস্ত সময় পার করছেন তাদের কারিগররাও। বিভিন্ন জায়গার পাকা মন্দিরগুলো রং আর কাপড়ের বাহারি সাজে সাজছে। গান, নাচ, আরতি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও নাটকের মধ্য দিয়ে বর্ণিলভাবে উৎসব পালনের জন্য চলছে বিরামহীন প্রস্তুতি।

উপজেলার কোন্ডা ইউনিয়নের প্রতিমা শিল্পী বাসু পালের সঙ্গে এ নিয়ে কথা হলে তিনি জানান, প্রতিমা তৈরির জন্য বাঁশ, খড়, মাটিসহ অন্যান্য উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি পেলেও বাড়েনি তাদের কাজের মূল্য। এতে আর্থিকভাবে তেমন কোনও লাভবান না হলেও পৈত্রিক এ পেশা ধরে রাখতেই তারা কাজ করছেন। তাদের মূল পেশাই হল প্রতিমা তৈরির কাজ। আর এ কাজ করেই চলে তাদের সংসার। এ শিল্প থেকে যা আয় হয় তা দিয়ে সংসার চালাতে তাদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। আর এ অভাব-অনটন থেকে বাঁচতে তাদের পরবর্তী প্রজন্ম এ পেশার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে বলেও জানান তিনি।

প্রতিমা তৈরির কারিগর দুলাল পাল বলেন, প্রতি বছর এ সময় ৫০-৫৫টি পূজা মন্ডপের কাজ করে থাকি, এ বছর মাত্র ৩৫টি পূজা মন্ডপের কাজ করছি। দুলাল পাল বলেন, দেবীদুর্গা ও তার বাহন হাতি প্রতিমাসহ তৈরি করা হচ্ছে যাকে বধের জন্য দেবীর আগমন সেই মহিষাসুরের প্রতিমা। এছাড়াও তৈরি হচ্ছে দেবী লক্ষ্মী, সরস্বতী, দেবতা কার্তিক, গণেশ, এবং তাদের বাহন পেঁচা, হাঁস, ইঁদুর আর ময়ূর। তিনি আরও বলেন, প্রতিটি প্রতিমার দাম ৪৫-৫০ হাজার টাকা চাওয়া হচ্ছে কিন্তু অতীতের মত ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না, একই কথা বলেন লক্ষণ পাল ও বিভিন্ন পূজা মন্ডপে প্রতিমা তৈরির কাজ করতে আসা শিল্পীরা।

হযরতপুর ইউনিয়নের আরেক শিল্পী সুবল পাল জানান, প্রতিবছরই তারা অধীর আগ্রহে দেবী দুর্গার প্রতিমা তৈরির কাজের অপেক্ষায় থাকেন। শুধুমাত্র জীবিকার জন্যই নয়। দেবী দুর্গার প্রতিমা তৈরির সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে তাদের ধর্মীয় অনুভূতি, ভক্তি আর ভালোবাসা। দুর্গা মাকে মায়ের মতোই তৈরি করা হচ্ছে। সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ চার লাখ টাকায় এসব প্রতিমা বানানো হচ্ছে।

তিনি বলেন, এখনই বছরের সবচেয়ে বেশি ব্যস্ত সময় পার করছি। পূজার আর মাত্র কয়েকটা দিন বাকি। তাই দম ফেলার সময়ও নেই। এর মধ্যেই দেবী দুর্গার প্রতিমা সম্পূর্ণ তৈরির সব কাজ শেষ করতে হবে। সুবল পাল আরও জানান, এবারের দুর্গাপূজা ১ অক্টোবর ষষ্ঠী পূজা দিয়ে শুরু করে ৫ অক্টোবর বিজয়া দশমী দিয়ে শেষ হবে। সপ্তমী ভোর থেকেই কার্যত উৎসবের ঢাকে কাঠি পড়া শুরু হয়। এবছর দেবী দুর্গা আসছেন গজে চড়ে, যাবেন নৌকায় চড়ে। দেবীর আগমনে বিশ্ব হবে শান্তিময়, অশুভ শাক্তিকে বিনাশ করে উদয় হবে শুভ শক্তির এমনটাই প্রত্যাশা এশিল্পীর।

কেরানীগঞ্জ মডেল থানা পূজা উদযাপন কমিটির সাধারণ সম্পাদক নিপেন কুমার বলেন, প্রতিটা মন্দিরে আনসার বাহিনীর সদস্য সার্বক্ষণিক থাকবে। পাশাপাশি নিজ দায়িত্বে প্রতিটি মন্দিরে কমিটির পক্ষ থেকে স্বেচ্ছাসেবী নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকাসহ সম্ভব হলে সিসি ক্যামেরা লাগানোর নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এছাড়া বিদ্যুৎ সাশ্রয়ে কম আলোকসজ্জা ব্যবহারের সুপারিশ করা হয়েছে। তিনি বলেন, উপজেলার কেরানীগঞ্জ মডেল থানার ছয়টি ইউনিয়নে ৯৪ টি পূজাম-পে শারদীয় দুর্গোৎসবের প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে। প্রতি বছরের মতো এ বছরও বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে দুর্গাপূজা উদযাপিত হবে।

দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি অ্যাড. অনুপ কুমার বর্মন বলেন, গত বছরের চেয়ে এবার মন্ডপের সংখ্যা বেড়েছে ৪টি। তাই উদযাপনটাও বেশি হবে বলে আশা করছি। তিনি বলেন, পুজা মন্ডপকে ঘিরে সাজ সজ্জার পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হবে। ধর্ম যার যার উৎসব সবার বলে তিনি জানান, প্রশাসন ও এলাকার সর্বস্তরের মানুষের সর্বাত্মক সহযোগীতায় শারদীয় দুগাপূজা সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

দুর্গাপূজার নিরাপত্তার বিষয়ে কেরানীগঞ্জ সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শাহবুদ্দিন কবীর বলেন, পূজা মন্ডপগুলোতে কঠোর নিরাপত্তা থাকবে। কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা ঘটতে দেয়া হবে না।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মেহেদী হাসান বলেন, শারদীয় দুর্গাপূজায় যেন কোনও ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে সেজন্য উপজেলা প্রশাসন সজাগ রয়েছে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা যাতে নির্বিঘ্নে তাদের উৎসব পালন করতে পারে সে বিষয়ে সব ধরনের প্রস্তুতিও গ্রহণ করা হয়েছে।