• আজ শনিবার, ১৮ অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ ৷ ৩ ডিসেম্বর, ২০২২ ৷

ক্রমেই ভয়ংকর রূপ নিচ্ছে ঘূর্ণিঝড় ‘সিত্রাং’, আতঙ্কে উপকূলের মানুষ


❏ সোমবার, অক্টোবর ২৪, ২০২২ প্রধান খবর

শাহীন মাহমুদ রাসেল, কক্সবাজার: কক্সবাজারে ঘূর্ণিঝড় সিত্রাংয়ের প্রভাব ধীরে ধীরে ভয়ংকর রূপ ধারণ করতে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনে ঘাটে নোঙর করে রাখা ১৩ টি ট্রলার ডুবির ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া জেলার একাধিক স্থানে বাঁধে ভাঙন ও ফাটল দেখা দেওয়ায় মানুষের মধ্যে ভীতি ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। বাঁধের ভাঙন এবং জলোচ্ছ্বাসে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

কক্সবাজার শহরসহ উপকূলীয় এলাকাগুলোতে রবিবার মধ্য রাত থেকে গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে বৃষ্টি ও একই সাথে বাতাসের গতিবেগ বাড়ছে। সিত্রাংয়ের মুখে পড়ে বঙ্গোপসাগর থেকে ভেসে নাবিকবিহীন পুরনো বিশাল আকারের একটি বিদেশি জাহাজ ছেঁড়া দ্বীপে আটকা পড়েছে। ওই জাহাজের ভেতরে রয়েছে কন্টেইনারসহ বেশ কিছু সরঞ্জামাদি।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কক্সবাজার সমুদ্র সৈকতে জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ৪ থেকে ৬ ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। উত্তাল ঢেউ আঁচড়ে পড়ছে জেলার উপকূলীয় এলাকাগুলোতে। এতে ফসলী জমিসহ ঘর বাড়ি বিলীন হয়ে যাবার আত আতঙ্কে রয়েছেন তারা।

ধমকা হাওয়া গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি শুরু হওয়ার পর থেকে সৈকত ছেড়ে যায়নি পর্যটক বা স্থানীয়রা। সংকেতের মধ্যেও লোকজনের ভিড় দেখা গেছে। তবে লাইফগার্ড ও সৈকত কর্মীরা পর্যটকদের নিরাপদে থাকার নির্দেশ দিচ্ছেন, মাইকিংও করছেন। তবে নির্দেশনা না মেনে অনেকে সমুদ্রে নামার চেষ্টা করছেন। এজন্য টুরিস্ট পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

এমন আবহাওয়ার মধ্যেও উত্তাল ঢেউয়ের রূপ দেখতে পর্যটকের পদচারণা বেড়েছে সমুদ্র সৈকতে। তাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হিমশিম খাচ্ছে সংশ্লিষ্টরা।

কক্সবাজারের টেকনাফ থেকে কুতুবদিয়া পর্যন্ত প্রায় ৫৯৫ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রয়েছে। এরমধ্যে বেশকিছু অংশ ঝুকিপূর্ণ। ফলে জোয়ারের পানি বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উপকূলে উৎকণ্ঠা বাড়ছে।

সেন্টমার্টিন দ্বীপে ৪ থেকে ৬ ফুট পানির উচ্চতা বেড়েছে বলে জানিয়েছেন সেখানকার বাসিন্দারা। সেখানে প্রচণ্ড গতিবেগে বাতাস এবং বৃষ্টি হচ্ছে।

ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং এর খবরে উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ আতংকগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। ষাটের দশকের জরাজীর্ণ বেড়িবাঁধ ভাঙনে আবারও প্লাবনের আশংকায় রয়েছেন তারা। ঘূর্ণিঝড় সিত্রাং এর আঘাতের পদধ্বনিতে উদ্বেগ আর উৎকন্ঠায় দিন কাটাচ্ছেন টেকনাফ, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার উপকূলীয় প্রায় ৫লাখ মানুষ। উপকূলীয় অঞ্চলে ভাল বেড়িবাঁধ নেই, নেই তেমন কোন সাইক্লোন সেন্টার।

কুতুবদিয়া উপজেলার আলীক আকবর ডেইলের বাসিন্দা মামুন রশিদ বলেন, প্রতিটি ঝড়ের সময়ই আমরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ি। আমাদের গ্রামের পাশেই বঙ্গোপসাগর। বিশেষ করে, সগরের বড় বড় ঢেউ আমাদেরকে আতঙ্কিত করে তোলে। এই গ্রামের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ ৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের কারণে ঘরবাড়ি হারিয়েছেন’ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, এখানে পর্যাপ্ত সংখ্যক আশ্রয়কেন্দ্র নেই।

স্থানীয় মাছের ঘেরের মালিক নবিউল করিম জানান, তিনি বেড়িবাঁধে ফাটল দেখে কাছে গেলে তার সামনেই বাঁধের একটি অংশ ভেঙে নদীতে মিশে যায়। বেড়িবাঁধ রক্ষায় তারা চেষ্টা করছেন, তবে কতটুকু সফল হবেন তা বলা মুশকিল। একইভাবে অন্য এলাকার বাঁধেও ধস দেখা দিয়েছে।

শহ পরীর দ্বীপের আরমান জানান, ‘ঝড়-বন্যার সময় কর্তৃপক্ষের বাঁধ নির্মাণে টনক নড়ে। এসব থেমে গেলে তাদের আর খবর থাকে না। বর্ষা মৌসুম আসলেই বাঁধ নির্মাণ করার জন্য আসেন তারা। যার কারণে বাঁধের স্থায়িত্ব থাকে না।

সেন্টমার্টিনের করিম, রিদুয়ান ও হারুনসহ স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কোন ঘূর্ণিঝড় আসলে দ্বীপে একটু ক্ষয়ক্ষতি হয়। জেটি ও চারিদিকে জিও ব্যাগ ভেঙে যাচ্ছে।

সেন্ট মার্টিনের বাসিন্দা কামরুল ইসলাম বলেন, একটি জাহাজ ছেঁড়াদ্বীপে আটকা পড়েছে। প্রথমে পর্যটকবাহী মনে করেছিলাম। পরে কাছে গিয়ে দেখি এটি একটি কন্টেইনারবোঝাই জাহাজ। সেখানে কারো দেখা মেলেনি। যদি প্রশাসনের কেউ না আসে, তবে গুরুত্বপূর্ণ মালামাল লুট হতে পারে।

স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান জানান, সোমবার সকালে ১৩টি ট্রলার ডুবে গেছে। অন্যদিকে একটি বিদেশি জাহাজ ভেসে এসেছে বলে স্থানীয়রা জানালে পুলিশ প্রশাসন ও উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করি। লোকজনকে নিরাপদে রাখার জন্য স্বেচ্ছাসেবকদের সহায়তায় কাজ চলছে বলে জানান এই জনপ্রতিনিধি।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ড. তানজির সাইফ আহমেদ জানান, উপকূলে এখন পর্যন্ত কোনো ক্ষয়ক্ষতি বা কোন এলাকা পানি ঢুকে প্লাবিত হয়নি। তবে পানির উচ্চতা ১ থেকে ২ ফুট বৃদ্ধি পেয়েছে। দুর্যোগ মোকাবেলায় জরুরি জিওটিউব প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

কক্সবাজারের প্রধান আবহাওয়াবিদ আবদুল হামিদ মিয়া জানান, সোমবার বেলা ১২টায় এ ঘূর্ণিঝড় চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর থেকে ৪৪০ কিলোমিটার দক্ষিণপশ্চিমে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দর থেকে ৩৯৫ কিলোমিটার দক্ষিণপশ্চিমে, মোংলা সমুদ্রবন্দর থেকে ৩৬৫ কিলোমিটার দক্ষিণ-দক্ষিণপশ্চিমে এবং পায়রা সমুদ্রবন্দর থেকে ৩৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণ- দক্ষিণপশ্চিমে ঘূর্ণিঝড়টি অবস্থান করছিল। এটি আরও ঘনীভূত হয়ে উত্তর দিকে অগ্রসর হতে পারে।

আবদুল হামিদ মিয়া আরও জানান, ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের ৫৪ কিলোমিটারের মধ্যে বাতাসের একটানা সর্বোচ্চ গতিবেগ ঘণ্টায় ৬২ কিলোমিটার, যা দমকা অথবা ঝোড়ো হাওয়া আকারে ৮৮ কিলোমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঘূর্ণিঝড় কেন্দ্রের নিকটবর্তী এলাকায় সাগর বিক্ষুব্ধ রয়েছে। ঘূর্ণিঝড়টির অগ্রবর্তী অংশের প্রভাবে উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় ৪০-৫০ কিলোমিটার বেগে দমকা-ঝোড়ো বাতাস বয়ে যেতে পারে, সেইসঙ্গে ৪৪-৮৮ মিমি থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট (পর্যটন সেল) মাসুম বিল্লা জানান, বঙ্গোপসাগরের গভীর নিম্নচাপটি ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হয়েছে। ঘূর্ণিঝড়ের প্রভাবে সাগর উত্তাল রয়েছে। এছাড়া গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি হচ্ছে। তাই পর্যটকদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে তাদের সমুদ্রে নামতে নিষেধ করা হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ সিদ্ধান্ত মানতে সবাইকে অনুরোধ করা হয়েছে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. মামুনুর রশিদ বলেন, ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় জেলায় ৫৭৬টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যেখানে পাঁচ লক্ষাধিক লোকের ধারণক্ষমতা রয়েছে। এছাড়া ৩ লাখ ২০ হাজার টাকা, ২৯৮ মেট্টিক টন চাল, ২০০ বান্ডিল ঢেউটিন এবং ১৮০ প্যাকেট শুকনা খাবার মজুত রাখা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ মুহূর্তে উপকূলের লোকজনকে সরিয়ে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা প্রস্তুত রাখা হয়েছে।