• আজ সোমবার, ১৩ অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ ৷ ২৮ নভেম্বর, ২০২২ ৷

ময়লা-আবর্জনায় ভরা কেরানীগঞ্জের খাল যেন মশা উৎপাদনের ফ্যাক্টরী

Keranigonj news
❏ সোমবার, অক্টোবর ৩১, ২০২২ ঢাকা

মাসুম পারভেজ, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট: নিয়মিত পরিষ্কার না করায় কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা খাল-জলাশয়, কচুরিপানা ও আবর্জনার স্তূপে পরিণত হয়েছে। এতে মশার উপদ্রব বাড়ছেই। বৃদ্ধি পাচ্ছে মশার প্রজননক্ষেত্র। নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও খালের দুই পাড়েই নির্বিচারে ময়লা-আবর্জনা ফেলা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি না থাকায় দিন দিন এ সমস্যা প্রকট আকার ধারণ করছে। মশার উৎপাতে স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে। আশপাশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। খাল নিয়মিত পরিষ্কার না করায় এ সমস্যা হচ্ছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।

উপজেলা ভূমি অফিসের তথ্যমতে, ২৫ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য ও ৪০ ফুট প্রস্থের খালটি রাজধানীর বুড়িগঙ্গা নদী থেকে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আগানগর ও শুভাঢ্যা ইউনিয়নের মধ্য দিয়ে ধলেশ্বরী নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। দখলের কবলে পড়ে খালটির প্রস্থ এখন কোথাও কোথাও ১০ ফুটে পরিণত হয়েছে। কালীগঞ্জ জোড়া ব্রিজ থেকে কৈবর্ত্যপাড়া পর্যন্ত খালের জায়গা দখল করে অনেকেই বাড়িঘর নির্মাণ করেছেন। এবং উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সুকৌশলে দিন দিন ময়লা আবর্জনা ফেলে অসাধু চক্র সরকারি অনেক খাল-জলাশয় দখল করে নিচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সরজমিন ঘুরে দেখা গেছে, উপজেলার প্রায় প্রতিটি এলাকায় খাল, ডোবায় পানির পরিমাণ কমে গেছে। এতে জমে থাকা পানি নষ্ট হয়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। সেসব স্থানে মশার লার্ভা তৈরি হচ্ছে। খালে পরিত্যক্ত পলিথিন, ময়লার ভাগাড়, ঝোপঝাড়, রাস্তার পাশে থাকা ককশিট ও বাসাবাড়ির আশপাশ থেকে মশা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ছে। পানিতে ভাসছে প্লাস্টিকের বোতল, পলিথিন, প্যাকেট, কৌটা ও পয়োবর্জ্য।

খালটি দূষণমুক্ত রাখতে কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ করে শুভাঢ্যা খালপাড়ার এলাকার বাসিন্দা ইব্রাহিম হোসেন বলেন, এ খালে পানি প্রবাহ বন্ধ হয়ে আছে দু’যুগ আগে থেকেই। এখন এখানে জমে থাকা ময়লা আবর্জনাযুক্ত পানিতেই মশা বংশ বিস্তার করছে। কিন্তু এ জায়গা পরিষ্কার ও মশা মারার ওষুধ ছিটানো হয়নি কখনোই। ফলে এলাকার ওয়ার্ডগুলোতে মশা নিধন কর্মীরা ওষুধ ছিটিয়ে গেলেও মশার উৎপাত কমছে না।খালের চরকুতুব সড়কের দোকানদার রশীদ গাজী জানান, এসব মশা সারাদিনই কামড়ায়। দ্যাখেন, কী মশা হইছে ড্রেইনে। মশার কামড়ের চোটে এইখানে বইসা থাকন যায় না। এইখানে কেউ মশার ওষুধও ছিডায় না। ঝাউবাড়ি এলাকার বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বলেন, রুমে মশার ওষুধ স্প্রে করার কিছুক্ষণ পরে আবার মশা আসে। ঘরের বাইরে যেখানেই যাই, মশা আর মশা। সন্ধ্যা লাগার সাথে সাথে ঘরের জানালা আটকালে মশা একটু কম আসে। ঘরে-বাইরে সবখানে মশার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে গেছি।

বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যে দেখা যায়, কেরানীগঞ্জ উপজেলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খালগুলোর মধ্যে অন্যতম এই শুভাঢ্যা খাল। কারণ এটি বুড়িগঙ্গা নদী থেকে তার যাত্রা শুরু করে কেরানীগঞ্জের একটি বড় বাণিজ্যিক এলাকা ও একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা দিয়ে অতিক্রম করার পর অবশেষে ধলেশ্বরী নদীতে গিয়ে মিশেছে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড ২০১৩ সালের জুলাই থেকে ২০১৭ সালের জুন পর্যন্ত কেরানীগঞ্জ উপজেলাধীন শুভাঢ্যা থেকে আগানগর পর্যন্ত ‘শুভাঢ্যা খাল পুনঃখনন ও তীর সংরক্ষণমূলক কাজ বাস্তবায়নের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকরণ প্রকল্প’ নামক একটি প্রকল্পসহ একাধিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে। কিন্তু ক্রমাগত জবরদখল, অপব্যবহার এবং কঠিন ও তরল বর্জ্য নিক্ষেপে সম্পূর্ণভাবে বা আংশিকভাবে খালটি ভরাট হয়ে গেছে। ফলে নতুন করে খালটিকে পুনঃখননের জন্য পুনরায় বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড আরেকটি (শুভাঢ্যা খাল পুনঃখনন এবং খালের উভয় পাড়ের উন্নয়ন ও সুরক্ষা) প্রকল্প হাতে নিয়েছে। প্রকল্পে অন্তুর্ভুক্ত রয়েছে- অবৈধ দখলদারদের হাত থেকে শুভাঢ্যা খাল ও খালের পাড়ের সুরক্ষাকরণ; খাল খনন এবং উন্নয়ন ও সংরক্ষণের নিমিত্তে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণ; খালের অভ্যন্তরীণ নৌ-যোগাযোগ ব্যবস্থা পুনরায় চালু; স্থানীয় জনগণের জন্য খালের পাড়ে বিনোদনমূলক সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টিকরণ; খালের পাড়ে হাঁটার রাস্তা ও শহীদ স্মৃতি অঙ্গন নির্মাণ; পাবলিক টয়লেট ও বসার আসন; রাস্তার আলোকসজ্জা ও ড্রেনেজ পাইপলাইন; ওয়াচ টাওয়ার, ভূ-নৈসর্গিক কাজ ও ডাস্টবিন স্থাপনসহ অন্যান্য উন্নয়ন।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আরাফাতুর রহমান বলেন, অনেকেরই ধারণা মশার কামড়ে শুধু ডেঙ্গু, ম্যালেরিয়া হয়। সাম্প্রতিক সময়ে অবশ্য চিকুনগুনিয়ার ভয়াবহতা আমরা দেখেছি। এক সময় দেশে ম্যালেরিয়ায় আক্রান্ত হয়ে অনেক মানুষ মারা যেত। ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব অনেকটাই কমে এসেছে। তবে দেশের পার্বত্য জেলাগুলোতে এখনো ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব রয়েছে। গোদ রোগ সম্প্রতি নির্মূলের পথে। তবে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব এখনো রয়ে গেছে। তিনি বলেন, মশার কামড় থেকে বাঁচতে কয়েল, স্প্রে ও নানা ধরনের বিষাক্ত দাহ্য পদার্থের ব্যবহার কমাতে হবে। কারণ, এসব দাহ্য পদার্থের ধোঁয়া শ্বাস-প্রশ্বাসের মাধ্যমে ফুসফুসে প্রবেশ করে ক্যন্সারসহ নানা জটিল রোগের সৃষ্টি করে যা জনস্বাস্থ্যকে হুমকিতে ফেলে।

খালটির বিষয়ে স্থানীয় এমপি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বিপু বলেন, খালটি দিয়ে এক সময়ে বুড়িগঙ্গা থেকে কেরানীগঞ্জের ধলেশ্বরী নদী পর্যন্ত যাতায়াত করা যেত। এই খালের সঙ্গে মহান মুক্তিযুদ্ধের অনেক ইতিহাস জড়িয়ে আছে। যুদ্ধের সময় এই খাল দিয়ে নৌকায় চড়ে মুক্তিযোদ্ধারা ঢাকা থেকে কেরানীগঞ্জে আসতেন। স্থানীয় মানুষের নিয়মিত যাতায়াত ছিল খালটি দিয়ে। খালটির আদিরূপ ঠিক রেখে আগের গতিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনতে হাতিরঝিলের আদলে রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে প্রায় তেরোশ কোটি টাকার প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। খালের দুপাড়ের অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করে পুনরায় নদীতে পূর্বের ন্যায় নৌযান চলাচলের উপযোগীকরণের কাজ শিগগির শুরু হবে। এ ছাড়া শুভাঢ্যা খাল ছাড়া কেরানীগঞ্জের এরকম অন্য খালগুলোকেও সংস্কার করা হবে বলে জানান তিনি।