• আজ সোমবার, ১৩ অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ ৷ ২৮ নভেম্বর, ২০২২ ৷

নির্মাণাধীন ভবন থেকে রড পড়ে স্কুলছাত্রী নিহত, এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া

Sunamgonj news
❏ মঙ্গলবার, নভেম্বর ১, ২০২২ সিলেট
জাহাঙ্গীর আলম ভূঁইয়া, সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি: স্কুল ভবনের পাশেই গ্রামের মুল সড়ক, সে সড়কে রাখা হয় লোহার রড। নির্মাণাধীন তিন তলা ভবনের সিড়ি দিয়ে সেই রড উপর না তুলে লোহার রড রশি দিয়ে বেঁধে টেনে রড উপরে তুলতে গেলেই রশি ছিড়ে শিক্ষার্থীর মাথার উপর বিদ্ধ হয়ে ডান পাশ দিয়ে লোহার রড বের হয়ে মাটিতে গিয়ে লাগে। এতে শিশুটি গুরুত্ব আহত হলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কতর্ব্যরত চিকিৎসকগন তাকে মৃত ঘোষণা করে।
সরজমিনে নিহত দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী উষামনির বিদ্যালয় সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের শ্রীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এলাকায় গিয়ে এমনি তথ্য পাওয়া যায়। উষামনি নিহতের পর থেকে এলাকায় নিরাবতা বিরাজ করছে।
উপজেলার শাহগঞ্জ গ্রামে শ্রীপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বৌলাই নদীর পাড়ে অবস্থান। এদিকে জায়গা সংকুলান না হওয়ায় নির্মানাধিন ভবনের নিচ ও দ্বিতীয় তলা সম্পূর্ণ হওয়ায় নিচতলায় শিক্ষার্থীদের পাঠ্যদান চলছিল।
এছাড়াও দেখা যায়,কোনো ভবন নির্মাণ করার পূর্বে নিরাপত্তা বেষ্টনী ও সাইনবোর্ড লাগানো সহ সার্বক্ষণিক সর্তকতা অবলম্বন করতে হয় তার কোনো চিহ্ন দেখা যায় নি। বরং যেখানে স্কুল ভবনের পাশেই সড়ক সেই সড়ক দিয়েই গ্রামের মানুষজন চলাচল করে সেই সড়কে কোন প্রকার নিরাপত্তা বেষ্টনী না দিয়ে,নিয়মনীতি তোয়াক্কা না করেই তিন তলা ভবনের কাজ করে শুরু থেকেই কন্ট্রাক্টারসহ তার নিয়োজিত লোকজন। এই বিষয়ে গ্রামের মানুষ বার বার বাধা দিয়ে আসছিল। প্রশাসনের কাছে অভিযোগ ও দিয়েছিল। কিন্তু কোন লাভ হয় নি। এর মধ্যে কন্ট্রাক্টার প্রভাবকাটিয়ে বিদ্যালয়ের নিচ ও দ্বিতীয় তলার কাজ শেষ করে। উল্টো অভিযোগ কারীদের ভয়ভীতি, হুমকি দিত কন্ট্রাক্টার ও তার নিয়োজিত লোকজন এবং গ্রামে কন্ট্রাক্টারের কিছু লোকজন।
এদিকে উষামনি(৮)নামে দ্বিতীয় শ্রেণির এক শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় তার পিতা আনোয়ার হোসেন কন্ট্রাক্টারসহ চার জনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের করেছে। রবিবার রাতে মামলাটি দায়ের করেন নিহতের পিতা আনোয়ার হোসেন। এরপূর্বে রবিবার সকাল পনে ন’টায় উপজেলার শ্রীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাথে সড়কে ঘটনাটি ঘটে। এঘটনার সাথে জড়িত হেড মিস্ত্রি মোশাহিদ ও ম্যানাজার পলাশ নামে দুজনকে আটক করেছে পুলিশ।
মামলার আসামীরা হলেন,কন্ট্রাক্টার মাইন উদ্দিন(৪৫),তার ম্যানাজার পলাশ(৩৫),সহকারী ম্যানাজার সুহেন মিয়া(৪৫) ও হেড মিস্ত্রি মোশাহিদ (৪০)সহ ৩-৪ জন অজ্ঞাত নামে মামলা হয়েছে এর সত্যতা নিশ্চিত করেছে তাহিরপুর থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সৈয়দ ইফতেখার হোসেন।
এদিকে,স্কুল শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনার উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা অফিস বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে এই ঘটনার কারন দশানোর নোটিশ দিয়েছে।
নিহত শিক্ষার্থী উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের শাহগঞ্জ শ্রীপুর গ্রামের আনোয়ার হোসেনের মেয়ে ও শ্রীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী। ঊষামণি তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে সবার ছোট। একমাত্র মেয়ে ঊষামণিকে হারিয়ে তার বাবা-মা শুধু আহাজারি করছেন। এ ঘটনায় পুরো এলাকাজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
গ্রামের বাসিন্দা রবিন মিয়া,তারেক রহমান,নবিকুলসহ অনেকই জানান,স্কুলের সাথেই যে সড়কটি গ্রামের মানুষ চলাচলের একমাত্র মাধ্যম সেই সড়কটির উপরে নিরাপত্তা বেষ্টনী দিলে এই ঘটনা ঘটত না। এই শিশু শিক্ষার্থী না হয়ে গ্রামের যে কোন মানুষ অথবা স্কুলের শিক্ষক ও হতে পারত। কন্ট্রাক্টার ও তার লোকজনের গাফিলতির কারনে এই ঘটনাটি ঘটেছে।
শ্রীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোফাজ্জল হোসেন জানান,সকাল ন’টায় স্কুলে এসে শুনি দূর্ঘটনা ঘটছে। নিরাপত্তা নিশ্চিত না করেই কাজ করায় বারবার কন্ট্রাক্টার ও কাজে নিয়োজিত লোকজনকে বলেছি কিন্তু কোন কথাই শোনেনি। যার ফলে আমার বিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী অকালে জীবন দিতে হল।
তাহিরপুর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা সৈয়দ আবুল খায়ের জানান,প্রাথমিক সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা কামরুজ্জামান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। এবিষয়ে স্কুলের প্রধান শিক্ষকে কারন দশানোর নোটিশ দেয়া হয়েছে। এছাড়াও এই বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে ঠিকাদার ধর্মপাশা উপজেলার মাইন উদ্দিন বলেন,দুর্ঘটনায় আমার কোন দোষ নাই। আপনার বিরুদ্ধে অভিযোগ কাজে অনিয়ম ও নিরাপত্তা বেষ্টনী না দিয়েই কাজ করেছেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, নির্মাণাধিন ভবনের নিচে ক্লাস না করার জন্য আমি নিষেধ করেছিলাম এরপরও ক্লাস করার কারনে এই দূর্ঘটনা ঘটেছে। আপনি কাজ বন্ধ রাখতে পারতেন এমন প্রশ্নে তিনি বলেন আমি আমার কাজ শেষ করার জন্য কাজ চলমান রেখেছিলাম।
নিহত শিক্ষার্থী উষা মণির পিতা মো. আনোয়ার হোসেন বলেন,বিদ্যালয় ভবন নির্মাণকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও শ্রমিকরা ভবন নির্মাণ সামগ্রী রক্ষণাবেক্ষণে দায়িত্বহীনতা ও অবহেলার কারণেই আমার শিশুকন্যা লোহার রডের আঘাতে মৃত্যুবরণ করেছে। আমি এর বিচার চাই যাতে আর কোন পিতা তার সন্তানের মৃত্যু এভাবে দেখতে না হয়।
দক্ষিন শ্রীপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলী আহমদ মোরাদ জানান,ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক। অসচেতনতার কারনে একটি শিশুর প্রান চলে গেলে। একটি নতুন ভবন তৈরি করতে গেলে সেখানে চারিদিক সুরক্ষিত করতে হয়। কিন্তু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কোন রকম বাউন্ডারি না দিয়ে নিয়মনীতি না মেনেই তাদের নির্মাণকাজ করে যাচ্ছিল। যা আইন বহির্ভূত। আমরা এলাকাবাসী এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করছি।
তাহিরপুর উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী আরিফুল হাসান বলেন,ঘটনাটি খুবই দুঃখজনক, এ বিষয়ে আমাদের উর্ধবতন কতৃপক্ষ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। আমাদের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
তাহিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রায়হান কবির জানান, শিক্ষার্থী নিহতের ঘটনায় জরিতদের বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে। কোন ছাড় দেয়া হবে না।
তাহিরপুর থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওসি সৈয়দ ইফতেখার হোসেন জানান, শিশু শিক্ষার্থীর ময়নাতদন্তের পরে পরিবারের কাছে লাশ হস্তান্তর করার পর রাতেই দাফন করা হয়েছে।  নিহতের পিতা মামলা দায়ের করেছে। তদন্ত সাপেক্ষে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। তিনি আরও জানান,এঘটনায় মামলায় এজহার ভুক্ত  দুজন আসামী সোমবার সকালে আদালতে পাঠানোর হয়েছে।