• আজ বুধবার, ২২ অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ ৷ ৭ ডিসেম্বর, ২০২২ ৷

‘ফারদিন মাদকসেবী’—আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবিতে ক্ষুব্ধ পরিবার ও সহপাঠীরা


❏ শনিবার, নভেম্বর ১২, ২০২২ আলোচিত বাংলাদেশ

সময়ের কন্ঠস্বর ডেস্ক: বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) এর নিহত শিক্ষার্থী ফারদিন নূর পরশ (২৪) কে মাদকসেবী বলে দাবি করছে র‍্যাব ও ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ।

তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই দাবির তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছেন তাঁর পরিবার, স্বজন ও সহপাঠীরা।

গতবৃহস্পতিবার দুপুরে রূপগঞ্জের চনপাড়া বস্তিতে র‍্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ‘সন্ত্রাসী’ সিটি শাহীন নিহতের পর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ফারদিন গত শুক্রবার (৪ নভেম্বর) রাতে সেখানে মাদক আনতে গিয়েছিলেন। সেখানে সিটি শাহীনের অনুসারীদের সঙ্গে তাঁর কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে তাঁকে পিটিয়ে হত্যা করে শীতলক্ষ্যা নদীতে ফেলে দেয় তারা।

র‍্যাব বলছে, ফারদিন নিয়মিত মাদক নিতেন। এমনকি বুয়েটের অনেক শিক্ষার্থীকে মাঝেমধ্যে মাদক সরবরাহ করতেন। তাঁর বান্ধবীও মাদকসেবী। তাঁরা ইয়াবা ও ফেনসিডিল নিতেন নিয়মিত।

র‍্যাবের এমন দাবির বিষয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ফারদিনের বাবা নূর উদ্দীন রানা। তিনি বলেন, ‘পুরো ঘটনাটি অন্য দিকে নেওয়ার জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এখন মাদকের কথা বলছে। কারণ মাদকের কথা বললে বুয়েটের শিক্ষার্থীরা কেউ আন্দোলন করবে না, আমরা সহানুভূতি পাব না। তাই মাদকের কথা বলা হয়েছে। আমার স্ত্রী এখনো ছেলেদের ভাত মেখে খাইয়ে দেয়, সে বাচ্চাদের খুব কাছাকাছি যায়, সে কখনো মাদকের ঘ্রাণ পায়নি। র‍্যাব–পুলিশ বললেই তো হবে না। মাদক নিতে সে কেন টিএসসি এলাকা রেখে রূপগঞ্জ যাবে? রমনা, সোহরাওয়ার্দী এবং এর আশপাশেই মাদক পাওয়া যায়।’

ফারদিনের মেজো ভাই আব্দুল্লাহ নূর বলেন, ‘বাইরে থেকে ধূমপানের ধোয়া আসলে তো আমরা তিন ভাই দরজা জানালা আটকে দিই, কেউ ধূমপানের গন্ধ সহ্য করতে পারি না। আমি আমার ভাই একসঙ্গে ঘুমাতাম, কখনো আমি এমন কিছু দেখিনি। আমার ভাইয়ের সার্কেল খুব ছোট। আমরা কখনো বন্ধু বা আত্মীয়স্বজনের বাসায় থাকি না। কারণ অন্যের বাসায় থাকতে আমরা লজ্জা পাই। সে গভীর রাতে মাদকের জন্য রূপগঞ্জ যাবে, এটা বিশ্বাসযোগ্য না।’

তবে র‍্যাব ও ডিবি দাবি করছে, ফারদিন ও তাঁর বান্ধবী বুশরা উভয়েই মাদকসেবী। এমনকি ফারদিন বুয়েটের অনেককে মাদক সরবরাহ করতেন। গত শুক্রবার তিনি কোথাও মাদক না পেয়ে রূপগঞ্জের চনপাড়া যান।

এদিকে, র‍্যাব ও পুলিশের এমন দাবি নাকচ করেছেন বুয়েটের শিক্ষার্থী ও ফারদিনের সহপাঠীরা। তাঁরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এমন দাবিতে বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ। এক সহপাঠী বলেন, ‘ফারদিন হলে থাকলে আমার কাছেই আসত। সে পড়ালেখা ও বিতর্কের বাইরে আর কিছু চিন্তা করত না। সে ধূমপানও করে না। র‍্যাব ও পুলিশের উচিত, সত্য উদ্ঘাটন করে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা।’

এদিকে ‘সন্ত্রাসী’ সিটি শাহীন নিহতের ঘটনায় র‍্যাবের করা দুটি মামলার একটির এজাহারে বলা হয়েছে, গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টার দিকে মাদকের বড় চালান ক্রয়-বিক্রয়ের খবর পেয়ে চনপাড়া পুনর্বাসন কেন্দ্রের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের বালুর মাঠে যায় র‍্যাবের একটি দল। মাদক ব্যবসায়ীরা র‍্যাবের উপস্থিতি টের পেয়ে গুলি চালায়। আত্মরক্ষার্থে র‍্যাবও পাল্টা গুলি ছোড়ে। প্রায় ১০-১৫ মিনিট গোলাগুলি চলে। স্থানীয় লোকজন ও রূপগঞ্জ থানা-পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছালে দুপুর ২টার দিকে বালুর মাঠের মাঝখানে ‘মাদক ব্যবসায়ী’ শাহীনকে উপুড় হয়ে পড়ে থাকতে দেখা যায়।

যদিও পরিবারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, র‍্যাব বৃহস্পতিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে চনপাড়ায় অভিযান চালায়, সেখান থেকেই শাহীনকে আটক করে নিয়ে যায়। পরে গুলিবিদ্ধ হওয়ার খবর পান তাঁরা।

র‍্যাবের একটি সূত্র দাবি করছে, ফারদিনের সঙ্গে পুরোনো দেনা পাওনা নিয়ে বিরোধ ছিল। সেটি নিয়েই ঝামেলা হয়েছে। তবে ফারদিনকে হত্যা করে কীভাবে কখন কোথায় নিয়ে ফেলা হয় তা এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে স্পষ্ট করেনি র‍্যাব।

এ ব্যাপারে জানতে চাইলে র‍্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ‘চনপাড়া বস্তিতে র‍্যাব–১–এর একটি অভিযান ছিল, তবে সেটি ফারদিন ইস্যু কেন্দ্রিক ছিল না। অভিযানের পর আমরা কিছু তথ্য পেয়েছি, সেগুলো যাচাই বাছাই করা হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘চনপাড়া বস্তিতে এর আগেও পিটিয়ে মানুষ হত্যা করে নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার ঘটনা আছে। আমরা ফারদিনের বিষয়টি এখনো তদন্ত করছি।’

এদিকে চনপাড়া বস্তিতে গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরে ডিবির একটি দলও গিয়েছিল। তারাও দুই তিনজন চিহ্নিত অপরাধীকে হেফাজতে নিয়েছে বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

এর আগে গত ৪ নভেম্বর ফারদিন নিখোঁজ হওয়ার পর তাঁর বাবা ৫ নভেম্বর রামপুরা থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। ৭ নভেম্বর নারায়ণগঞ্জে শীতলক্ষ্যা নদী থেকে ফারদিনের মরদেহ উদ্ধারের পর গত বুধবার দিবাগত রাতে ফারদিনের বান্ধবী বুশরাকে আসামি করে মামলা করেন বাবা নূর উদ্দীন রানা। ওই মামলায় বুশরা পাঁচ দিনের পুলিশ রিমান্ডে রয়েছেন।

মামলার তদন্তকারী সংস্থা ডিবির মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) রাজীব আল মাসুদ বলেন, ‘মামলার তদন্ত এখনো চলছে। সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে মামলাটি তদন্ত করা হচ্ছে।’

আরও পড়ুন- 

বুয়েটছাত্র ফারদিন হত্যা মামলা: ৫ দিনের রিমান্ডে বান্ধবী বুশরা

বুয়েট ছাত্র ফারদিন হত্যা মামলায় বান্ধবী বুশরা গ্রেপ্তার

খুলছেনা রহস্যের জট, ফারদিনের দুই বন্ধুকে পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ

নিখোঁজের ৩ দিন পর শীতলক্ষ্যায় মিলল বুয়েট ছাত্রের ভাসমান লাশ