• আজ রবিবার, ১২ অগ্রহায়ণ, ১৪২৯ ৷ ২৭ নভেম্বর, ২০২২ ৷

অবৈধ ইট ভাটা গিলে খাচ্ছে কর্ণফুলী, দূষণ ও ধ্বংসের মুখে ফসলি জমি


❏ বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৭, ২০২২ চট্টগ্রাম, দেশের খবর

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম: চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে অপরিকল্পিতভাবে যেখানে সেখানে ফসলি জমির ওপর গড়ে উঠেছে বৈধ-অবৈধ ‘ইটভাটা’। ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন আইনের তোয়াক্কা না করে বেশির ভাগ ইটভাটার কার্যক্রম চলছে ছাড়পত্র ছাড়াই। নেই নবায়নও।

এসব ভাটায় ইট প্রস্তুতে এলাকার কৃষকের জমির টপ সয়েল কিনে ব্যবহার করায় ফসল উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে, কমে যাচ্ছে আবাদি জমি। এতে প্রতিনিয়ত ধোঁয়ার দূষণে স্বাস্থ্যঝুঁকির পাশাপাশি পরিবেশ হারাচ্ছে বৈচিত্র্য ও বিপর্যস্ত হচ্ছে জনজীবন। সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রশাসনও অনেকটা নীরব। তিন বছর আগে অভিযান চালানো হলেও এরমধ্যে উপজেলা প্রশাসনের কোন দৃষ্টি নেই বলে সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন।

সরেজমিনে দেখা গেছে, শীত মৌসুমে চব্বিশ ঘন্টাই চলতে থাকে ইটভাটার চুল্লী। সেই ধোঁয়ায় দূষিত হচ্ছে পরিবেশ। যা পুরো কর্ণফুলীকে ধীরে ধীরে গিলে খাচ্ছে। অপরদিকে, ইট ভর্তি ট্রাক গ্রামের সড়কে চলার কারণে টেকসই সড়কও ভেঙে যাচ্ছে। কোটি কোটি টাকার নিমিষেই শেষ হচ্ছে।

ইট প্রস্তুত ও ইটভাটা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে পরিবেশের মারাত্বক ক্ষতিসাধন করে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে ফসলি জমির মাটি কেটে ইটভাটায় নিয়ে ইট তৈরি করছে। এমনটি জুলধার মাতব্বর ঘাট এলাকায় কর্ণফুলী নদীর মাটি তুলে শুকিয়ে ইট ভাটায় মেশানো হচ্ছে।

তথ্যমতে, কর্ণফুলী উপজেলার জুলধার এক ইউনিয়নে রয়েছে ৮টি ইটভাটা। তার মধ্যে ৭ টি রয়েছে জুলধা মাতব্বর ঘাটে, অপরটি ডাঙ্গারচরে। এগুলো হলো-পায়রা ব্রিকস (পিবিএম), এইচটিএম ব্রিকস, পিএনবি ব্রিকস (বর্তমানে বন্ধ), জিবিএম ব্রিকস, টিএলবি ব্রিকস, আর আর বি ব্রিকস, মোস্তফা-হাকিম ব্রিকস (ডাঙ্গারচর), ইআরএম ব্রিকস, টিএমবি ব্রিকস, এছাড়াও চরপাথরঘাটার ইছানগরে রয়েছে দুটি ব্রিকস। প্যারাগন ব্রিকস ও ডায়মন্ড ব্রিকস।

এসব বেশির ভাগ ভাটার নবায়ন নেই। নেই বিএসটিআই সনদ, কৃষি ও পরিবেশ ছাড়পত্র নেই। অনেকে শুধুমাত্র আবেদন দাখিল করেই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন বছরের পর বছর। এছাড়া অনেকেই মানছেন না ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন (নিয়ন্ত্রণ) আইন ও শর্তাবলি।

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ইট প্রস্তুত ও ইটভাটা স্থাপন নিয়ন্ত্রণ আইন (২০১) ধারায় সম্পূর্ণভাবে উল্লেখ আছে, জেলা প্রশাসকের লাইসেন্স ব্যতিত কোন ব্যক্তি ইটভাটা প্রস্তুত করতে পারবে না। ঐ আইনে আরও উল্লেখ করা আছে যে তিন কিলোমিটারের মধ্যে বাড়ী ঘর ও বসতি এলাকা ফলজ ও বনজ-বাগান শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকলে ইটভাটা অনুমোদন হবে না।

কৃষি কর্মকর্তা কল্পনা রহমান জানান, ‘ইটভাটার কারণে দিন দিন কমে আসছে জমির পরিমাণ। এভাবে চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছরে খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্য মাত্রা হ্রাস পাবে।’

মানবাধিকার কর্মী জিয়া হাবিব আহসান বলেন, ‘ইট ভাটার কারণে বায়ুদূষণের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। এটা জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ ক্ষতির বড় কারণ।’

পরিবেশ আন্দোলনের নেতা শরীফ জামিল বলেন, ‘অবৈধ ইটভাটা বহু বছর ধরে চলছে, যেন দেখার কেউ নেই। জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে বাঁচাতে ইটের ভাটা বন্ধ করা জরুরী। কঠোর পদক্ষেপের কোন বিকল্প নেই। কেননা, ইটভাটার মাটির জোগান দিতে টপ সয়েল কেটে নেওয়ায় অনাবাদি হচ্ছে অনেক জমি।’

পরিবেশ অধিদফতর, চট্টগ্রাম জেলার পরিচালক মুফিদুল আলম বলেন, ‘অনুমোদন বা ছাড়পত্র না নিয়ে কিংবা নবায়ন না করে কেউ ইটভাটা পরিচালনা করলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কিছুদিন আগেও কয়েকটি ইটভাটার কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমরা আইন অনুযায়ী পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকি।’

সম্প্রতি, দেশের সব জেলার অবৈধ ইটভাটা ও ইটভাটার জ্বালানি হিসেবে কাঠের ব্যবহার আগামী ৭ দিনের মধ্যে বন্ধ করার নির্দেশনা জারি করতে বলেছেন হাইকোর্ট। মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসনের সিনিয়র সচিব এবং পরিবেশ সচিবকে এ নির্দেশনা জারি করতে বলা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গ জানতে চাইলে কর্ণফুলী উপজেলা সহকারি কমিশনার (ভূমি) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট পিযুষ কুমার চৌধুরী বলেন, ‘অতি শিগগিরই ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করে মহামান্য হাইকোর্টের নির্দেশে অবৈধ ইটভাটা বন্ধ করা হবে।’

সরকার ২০২৫ সালের মধ্যে টপ সয়েল কাটা হ্রাস করে ইটের বিকল্প হিসেবে পরিবেশবান্ধব ব্লক দিয়ে বাড়িঘর নির্মাণের প্রচলন করতে যাচ্ছে।