নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী দিয়ে কাজ করায় হস্তান্তরের আগেই নির্মাণাধীন ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত কালভার্ট (বক্স কালভার্ট) ফাটল ধরায় কালভার্টটি ধ্বংসের আশঙ্কা রয়েছে বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। শুধু তাই নয়, এতে স্থানীয়দের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে চরম ক্ষোভ।
তবে ঘটনাটি আড়াল করতে তড়িঘরি করে সিমেন্ট-বালুর প্রলেপে ফাটল ঢেকে দিয়েও তা চাপা রাখতে পারেননি ঠিকাদার।
এই ঘটনা ঘটেছে বরিশাল জেলার বাবুগঞ্জ উপজেলার চাঁদপাশা ইউনিয়নের ডিক্রিরচর গ্রামে। ওই গ্রামের বায়তুল আমান জামে মসজিদ সংলগ্ন খালে ব্রিজটি নির্মাণ করা হচ্ছে।
অভিযোগ উঠেছে, নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার করায় হস্তান্তরের আগেই ফাটল ধরেছে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের এই প্রকল্পে। ব্রিজটি যে কোনো সময় ভেঙে পড়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২৪-২৫ অর্থবছরে ত্রাণ ও দুর্যোগ মন্ত্রণালয়ের ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে ব্রিজ নির্মাণ প্রকল্পের ঠিকাদারী পায় “সালেহা কবির এন্টারপ্রাইজ” নামক প্রতিষ্ঠান।
প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করেন ঠিকাদার মো. মনির। ব্রিজের গাইডওয়াল নির্মাণ হয়েছে জুনে। দুই মাস না যেতেই হেলে পড়েছে গাইডওয়াল। ফাটল ধরা স্থানে সিমেন্ট এবং বালুর প্রলেপে ঢেকে দেয়া হয়েছে।
স্থানীয়রা অভিযোগ করেছেন, ব্রিজ নির্মাণ কাজ যথাযথভাবে তদারকি করেননি উপজেলা প্রকৌশলী বা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তাসহ প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা। দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা কাজের তদারকি না করে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ের পিয়ন দিয়ে তদারকি করেন। এর কারণেই কাজের যত অনিয়ম হচ্ছে। তিনি আরো বলেন, সবচেয়ে বেশি অনিয়মই হচ্ছে প্রকল্পের কাজগুলোতে।
একটি বিশ্বাসযোগ্য সূত্র আরো জানিয়েছেন, জুন ক্লোজিংয়ের আগে ১৬ মিলিমিটার পরিবর্তে ১২ মিলিমিটারের রড ব্যবহার করে ব্রিজটি নির্মাণ করা হয়। দরপত্রের শর্ত অনুযায়ী দেয়া হয়নি সিমেন্ট-বালু। অনিয়ম এড়াতে রাতের আঁধারে বেইজের কাজ সম্পন্ন করেন ঠিকাদার।
বিষয়টি জানতে পেরে ওই সময় প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা এবং উপজেলা প্রকৌশলী। তাঁরা দিনের আলোয়, সবার সামনে ব্রিজ নির্মাণ কাজ করার নির্দেশ দেন। এর পরও গ্রামবাসীর কাছে প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিসের পিয়নকে ইঞ্জিনিয়ার সাজিয়ে নিম্নমানের সামগ্রী দিয়েই কাজ চালিয়ে নেয় ঠিকাদার।
অভিযোগ প্রসঙ্গে বক্তব্য জানতে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান “সালেহা কবির এন্টারপ্রাইজ” এর ঠিকাদার মো. মনিরকে তার ব্যবহৃত মুঠোফোন নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।
তবে বাবুগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সোহেল হোসেন বলেন, নির্মাণাধীন বক্স কালভার্টে ফাটলের বিষয়টি শুনেছি। এখনও কাজ হস্তান্তর হয়নি। ওই কাজের বিল এখনও ঠিকাদার পায়নি। অভিযোগ তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে পিয়ন দিয়ে প্রকল্প তদারকির অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারুক আহমেদ বলেন, রাতের আঁধারে নির্মাণ কাজ করার অভিযোগ ওঠায় ব্রিজটি পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। দিনে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছিলাম। ব্রিজের গাইডওয়ালে ফাটলের একটি ভিডিও পেয়েছি। পুনরায় ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের কথা জানান তিনি।
উল্লেখ্য, এর আগেও প্রায় ৫-৬ মাস পূর্বে বাবুগঞ্জে ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের অধীনে উপজেলার চাঁদপাশা ইউনিয়নের দক্ষিণ রফিয়াদি বেলায়েত হাওলাদার বাড়ি-সংলগ্ন খালের ওপর প্রায় ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা বক্স কালভার্টও হস্তান্তরের আগে ফাটল দেওয়ার কিছু ছবি ও ভিডিও ভাইরাল হয়েছিল। পরে জাতীয়, স্থানীয় সংবাদপত্রে বিভিন্ন শিরোনামে সংবাদটি প্রকাশিত হওয়ার পরেও কোনো কঠোর ব্যবস্থা নেয়নি উপজেলা প্রশাসন।
ফের একই উপজেলায় ৬ মাসের মাথায় আরো একটি নির্মাণাধীন কালভার্ট ব্রিজ হস্তান্তরের আগে ফাটল ধরলো। তবে এ ঘটনায় উপজেলা প্রশাসন এবার অভিযুক্ত ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা গ্রহণ করেন, সেটা দেখার অপেক্ষায় উপজেলাবাসী।
এসআর