গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের এক শিক্ষার্থীকে মধ্যরাতে বাসা থেকে মেসে ডেকে এনে র্যাগিং এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের অভিযোগে আটজন শিক্ষার্থীকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।
বুধবার সন্ধ্যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির সদস্য–সচিব কনক চন্দ্র রায় আটজনকে সাময়িক বহিষ্কারের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
তিনি বলেন,“এই ঘটনায় ইতোমধ্যে দুটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিভাগীয় তদন্ত কমিটির প্রাথমিক প্রতিবেদনে যে আট শিক্ষার্থীর নাম উঠে এসেছে, সেই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তাদের সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন,“তদন্ত প্রক্রিয়া এখনও চলমান রয়েছে। সম্পূর্ণ তদন্ত শেষে চূড়ান্ত প্রতিবেদনে এই আটজনসহ আরও যদি কেউ জড়িত থাকে, তাদের বিরুদ্ধেও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
সাময়িক বহিষ্কৃত শিক্ষার্থীরা হলেন—অন্তু দেওয়ান (২৭ ব্যাচ), আসাদুর রহমান (৩২ ব্যাচ), আশরাফুল ইসলাম (৩২ ব্যাচ), তরিকুল ইসলাম (২৭ ব্যাচ), মেহেদী হাসান (২৮ ব্যাচ), নাঈম (৩২ ব্যাচ), মেহেদী (৩২ ব্যাচ) এবং আসিফ রহমান লাবিব (২৮ ব্যাচ)।
গত ২৪ নভেম্বর মধ্যরাতে আশুলিয়ার নলাম এলাকার একটি মেসবাড়িতে ডেকে নিয়ে গণ বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষার্থী শের আলীকে (৩৩ ব্যাচ) র্যাগিং এবং শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করা হয়—এমন অভিযোগ উঠেছে একই বিভাগের কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে।
রংপুরের পীরগঞ্জের মাহমুদপুর এলাকার বাসিন্দা শের আলী আশুলিয়ায় একটি মেসবাড়িতে ভাড়া থাকেন। নির্যাতনের পর তাঁকে আশুলিয়ার গণস্বাস্থ্য সমাজভিত্তিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
সহপাঠীরা জানান, সোমবার বিকেলে শের আলীর মেসের শিক্ষার্থীদের আসাদের মেসে দাওয়াত দেওয়া হয়। দাওয়াতের জন্য খিচুড়ির উপকরণ কিনতে সবাই মিলে মাজার এলাকায় যায়। পরে আসাদের মেসে গিয়ে একপর্যায়ে শের আলী পেঁয়াজ কাটতে অপারগতা জানালে আশরাফুল তাকে ধমক ও মারধরের ভয় দেখান। এতে তিনি নিজের মেসে ফিরে যান।
রাত ৯টার দিকে নাহিদ (৩১ ব্যাচ) তাকে আবার সেই মেসে ডাকেন। রাত ১২টার দিকে খিচুড়ি খাওয়া শেষে অন্যরা ফিরে গেলেও অন্তু দেওয়ান শের আলীকে আটকে রাখেন।
এরপর তাকে এক পায়ে দাঁড়াতে বলা হয়, অশ্লীল ভাষায় গালাগালি ও চড়–থাপ্পড় মারা হয়। তরিকুল তাঁর প্যান্ট খুলতে বাধ্য করার চেষ্টা করেন। অস্বীকৃতি জানালে তারা মারধর চালান। পরে পায়ে ধরে ক্ষমা চাইলে রাত দেড়টার দিকে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এরপর সহপাঠীরা তাকে হাসপাতালে নিয়ে যান।
চিকিৎসাধীন শের আলী গণমাধ্যমকে বলেন,“আমাকে একা আটকে রেখে অশ্লীল কথা বলে ৫-৬টি চড়-থাপ্পড় মারে। প্যান্ট খুলতে বললে অস্বীকৃতি জানাই, তখন আরও মারধর করে। পরে পায়ে ধরে ক্ষমা চাই। সকালে ৩২ ব্যাচের লাবিব ভাই হাসপাতালে এসে বলেন— ‘এটা বাড়াতে চাও, না শেষ করবে?’—এভাবে হুমকি দেন।”
ঘটনার পর ২৫ নভেম্বর সকালে শিক্ষার্থীরা প্রশাসনিক ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন এবং জড়িতদের বিচারের দাবিতে বিক্ষোভ করেন। পরে তারা বিভাগীয় প্রধান ও উপাচার্যের কাছে লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ঘটনার তদন্তে দুটি পৃথক কমিটি গঠন করে—আইন বিভাগের শিক্ষকদের নিয়ে সাত সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি,প্রক্টরিয়াল বডির সমন্বয়ে আরেকটি তদন্ত কমিটি।
বুধবার (২৬ নভেম্বর) দিনভর বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে। বিকেলে অভিযুক্ত অন্তুর পক্ষে ২৫–৩০ জন শিক্ষার্থী বিক্ষোভ মিছিল করেন এবং অভিযোগকে ‘মিথ্যা’ দাবি করেন।
গকসু প্রতিনিধি, ভুক্তভোগী ও প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক শেষে সন্ধ্যায় আটজনকে সাময়িক বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা অবস্থান কর্মসূচি প্রত্যাহার করেন।
এনআই