এইমাত্র
  • আরও দুই নেতাকে সুখবর দিল বিএনপি
  • পুলিশকে অত্যন্ত সতর্ক থাকার নির্দেশ
  • আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য কঠোর হচ্ছে ইউরোপ, না ছাড়লে হবে জেল
  • চীনের কাছে ভারতীয়দের নিশানা না করার আশ্বাস চায় ভারত
  • জাপানে শক্তিশালী ভূমিকম্প, সুনামি সতর্কতা জারি
  • জাপানে শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর সুনামির আঘাত
  • নাগরিকদের চীন ভ্রমণ নিয়ে সতর্কতা জারি ভারতের
  • বিশ্বরেকর্ড গড়ার প্রত্যয়ে বিজয় দিবসে সর্বাধিক পতাকা হাতে প্যারাস্যুটিং
  • ফেইসবুক পোস্টে কমেন্টকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, আহত ৫
  • জুনিয়র হকি বিশ্বকাপের চ্যালেঞ্জার ট্রফি বাংলাদেশের
  • আজ মঙ্গলবার, ২৫ অগ্রহায়ণ, ১৪৩২ | ৯ ডিসেম্বর, ২০২৫
    দেশজুড়ে

    প্যারাবন পোড়ার গন্ধে কাঁদছে সোনাদিয়া

    শাহীন মাহমুদ রাসেল, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট (কক্সবাজার) প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫, ০২:২০ পিএম
    শাহীন মাহমুদ রাসেল, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট (কক্সবাজার) প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫, ০২:২০ পিএম

    প্যারাবন পোড়ার গন্ধে কাঁদছে সোনাদিয়া

    শাহীন মাহমুদ রাসেল, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট (কক্সবাজার) প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৫, ০২:২০ পিএম

    কক্সবাজারের মহেশখালীর উপকূলে অবস্থিত সোনাদিয়া। দৃষ্টিনন্দন প্যারাবন, উজ্জ্বল লাল কাঁকড়ার চলাচল, নানা প্রজাতির সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য আর নিসর্গমুখর সমুদ্রসৈকতের জন্য পরিচিত এক বিচ্ছিন্ন দ্বীপ।

    জনশ্রুতি আছে- একসময় এখানকার প্রচুর মাছধরা ও শুঁটকি উৎপাদনের কারণে দ্বীপটি স্থানীয়দের কাছে ‘সোনার মতো দামি’ হয়ে ওঠায় নাম হয়েছে সোনাদিয়া। কিন্তু অপার পর্যটন সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও পরিকল্পিত উন্নয়ন না থাকায় আজ পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে এই দ্বীপ। শীত মৌসুমেও যেখানে পর্যটকের ঢল থাকার কথা, এখন সেখানে নেমে এসেছে নীরবতা।

    একসময় যে দ্বীপের বাতাসে লবণাক্ত সমুদ্রের ঘ্রাণ আর প্যারাবনের সবুজ ছায়া মিশে থাকত, সেখানে এখন ভাসে পোড়া গাছের তীব্র যন্ত্রণার গন্ধ। ঢেউয়ের সাথে ওঠানামা করা কাঁকড়া, ঝিনুক, পাখি আর মানুষের জীবন- সবকিছুই যেন নিঃশব্দে সহ্য করছে এই নিষ্ঠুরতা। রাতের অন্ধকারে এক্সকাভেটরের শব্দ ও আগুনের লেলিহান শিখায় শুধু গাছ নয়, পুড়ে গেছে মানুষের স্মৃতি, আশ্রয়, ভবিষ্যতও। যে প্যারাবন ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সময় শত জীবনের রক্ষাকবচ ছিল, সেই বন আজ নিজেই রক্ষা চাইছে। সোনাদিয়ার আকাশে এখন আর শুধু সীগালের ডাক শোনা যায় না; শোনা যায় বাঁচার আর্তি- একটি দ্বীপের কান্না, যা প্রতিদিন একটু একটু করে নিভে যাচ্ছে।

    জানা গেছে, মহেশখালীর কুতুবজোম ইউনিয়নের এই ৪৯২৮ হেক্টরের দ্বীপে বরাবরই পর্যটকদের বিশেষ আকর্ষণ ছিল সোনাদিয়ার নির্জন সৈকত, প্যারাবনের আঁকাবাঁকা পথ, কাছিমের বিচরণ আর সূর্যাস্তের নয়নাভিরাম দৃশ্য।

    স্থানীয় বাসিন্দা তারেক আজিজ জানান, একসময় মৌসুমে হাজারো পর্যটক আসতেন। তাদের ঘিরে তৈরি হয়েছিল ছোট-বড় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। এখন পর্যটক আসা প্রায় শূন্য, ব্যবসাগুলোও বন্ধ হওয়ার পথে।

    যোগাযোগব্যবস্থা ও নীতিগত পরিকল্পনার অভাবেই সম্ভাবনার দ্বীপটি পিছিয়ে পড়ছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা।

    জানা গেছে, সোনাদিয়ার অন্যতম বৈশিষ্ট্য বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের একমাত্র লোনাজলের প্যারাবন। প্রায় ২২০০ একরজুড়ে বিস্তৃত এই বনাঞ্চলে রয়েছে সাদা বাইন, কালো বাইন, কেওড়া, নোনিয়া, হরগোজাসহ প্রায় ৩০ প্রজাতির উদ্ভিদ। কিন্তু এই গুরুত্বপূর্ণ বন হুমকির মুখে।

    স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর প্রভাবশালীদের চিংড়ি প্রকল্প ও লবণ মাঠ স্থাপনের নামে নির্বিচারে কাটা হয়েছে ম্যানগ্রোভ। বাসিন্দাদের অভিযোগ- আওয়ামী লীগ-বিএনপি-জামায়াত-সব দলের প্রভাবশালী মহল প্যারাবন দখলে জড়িত। প্রশাসনের নাকের ডগায় বন উজাড় হচ্ছে, তবু কার্যকর ব্যবস্থা নেই।

    চকরিয়ার পরিবেশকর্মী নুরুল আমিন বলেন, ‘১৯৭৭ সাল থেকে বন ধ্বংস শুরু। এখন নেই বললেই চলে। সব দখল হয়ে গেছে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ছত্রছায়ায়।’

    পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, সোনাদিয়ার খাল-মোহনা-বনাঞ্চলে রয়েছে- ১৯ প্রজাতির চিংড়ি, ১৪ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ৫০ প্রজাতির কাঁকড়া, ৮০ প্রজাতির সাদা মাছ, ৬৫ প্রজাতির স্থানীয় ও যাযাবর পাখি, ৩ প্রজাতির ডলফিন, সামুদ্রিক কাছিম, মেছো বাঘ, শিয়াল ও নানা সরীসৃপসহ অসংখ্য মেরুদণ্ডী- অমেরুদণ্ডী প্রাণী।

    নেচার কনজারভেশন ম্যানেজমেন্টের (নেকম) কর্মকর্তা মো. আব্দুল কাইয়ুম বলেন- ‘গত কয়েক বছরই প্রায় ৩৫টি জায়গায় অবৈধ চিংড়ি ঘের তৈরির জন্য দিনরাত এক্সকাভেটর চালিয়ে লাখো গাছ কেটে পেট্রল ঢেলে পুড়িয়ে দেওয়া হয়।’

    তিনি আরও বলেন, ‘পরিবেশ অধিদপ্তর দুু-একটি মামলা করেছে, কিন্তু প্রভাবশালী রাঘববোয়ালদের নাম মামলায় নেই।’

    তথ্য বলছে, দ্বীপটিতে বর্তমানে মাত্র ৮১০ জন মানুষের বসবাস। ভোটার ৩৮৪ জন (২০১২ সালের তথ্য)।

    বেশিরভাগ পরিবার মৎস্য আহরণে যুক্ত। শীত মৌসুমে উৎপাদিত শুঁটকি সারা দেশে জনপ্রিয়, এবং সোনাদিয়ার শুঁটকির জন্য বহু পর্যটক অতীতে দ্বীপে ছুটে যেতেন। শিক্ষার অবস্থা দুর্বল- দুটি বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ছাড়া উল্লেখযোগ্য কিছু নেই। মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকায় প্রাথমিক শেষ করেই অধিকাংশ শিশুর পড়াশোনা থেমে যায়।

    পরিবেশবিদদের মতে, সোনাদিয়া পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকা হওয়ায় সেখানে সেচ্ছাচারী পর্যটন নয়, ইকো ট্যুরিজম হতে পারে উপযুক্ত সমাধান। দ্বীপবাসীর সম্পৃক্ততায় কমিউনিটি-ভিত্তিক পর্যটন, জীববৈচিত্র্য রক্ষা, বিকল্প কর্মসংস্থান ও পরিবেশসম্মত পর্যটন অবকাঠামো। সঠিক পরিকল্পনায় এগোলে সোনাদিয়া দেশের গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন গন্তব্য হতে পারে; অর্থনীতিতেও যোগ হবে নতুন গতি।

    প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অপার ভাণ্ডার, জীববৈচিত্র্যের রত্নগর্ভ আর পরিবেশগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সোনাদিয়া দ্বীপ আজ উন্নয়নহীনতা, দখলদারি আর অব্যবস্থাপনার চাপে অস্তিত্ব সংকটে। সঠিক পরিকল্পনা, পরিবেশবান্ধব পর্যটন এবং কঠোর আইনপ্রয়োগ ছাড়া এই দ্বীপের সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা সম্ভব নয়- এমনটাই বলছে স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবিদরা।

    জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান বলেন ‘সোনাদিয়ায় বন ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্যারাবন পুনরুদ্ধারে বিভিন্ন উদ্যোগ চলছে।’

    এসআর

    সম্পর্কিত:

    সম্পর্কিত তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি

    চলতি সপ্তাহে সর্বাধিক পঠিত

    Loading…