দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জ—এই দুই উপজেলা নিয়ে গঠিত সংসদীয় আসন জামালপুর-১। ১৫টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই আসনে আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে ভোটের মাঠে জমে উঠেছে প্রতিদ্বন্দ্বিতা। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতারা এ আসনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ায় লড়াই আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) থেকে ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন পেয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হিসেবে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরা সদস্য ও জেলা জামায়াতের সাবেক আমির অ্যাডভোকেট নাজমুল হক সাঈদী। পাশাপাশি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ থেকে হাতপাখা প্রতীকে মনোনয়ন পেয়েছেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ তালুকদার। জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে লাঙ্গল প্রতীকে লড়ছেন এ কে এম ফজলুল হক। সব মিলিয়ে এ আসনে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখছেন স্থানীয় ভোটাররা।
ভারত সীমান্তসংলগ্ন গারো পাহাড়, নদ-নদী ও চরাঞ্চলবেষ্টিত দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জ উপজেলা নিয়ে গঠিত জামালপুর-১ আসন দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৯১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত অনুষ্ঠিত চারটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে আওয়ামী লীগ তিনবার এবং বিএনপি একবার জয়লাভ করে। আওয়ামী লীগের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত এই আসনে ২০০১ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আবুল কালাম আজাদকে পরাজিত করে প্রথমবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন বিএনপির এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি সরকারের সময়ে এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত এলাকায় বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করেন, যা তাকে ব্যাপক জনপ্রিয়তা এনে দেয়। তবে ২০০৮ ও ২০১৮ সালের নির্বাচনে মামলাজনিত জটিলতার কারণে তিনি প্রার্থী হতে পারেননি। দীর্ঘ বিরতির পর এবার দল তাকে আবারও ধানের শীষ প্রতীকে মনোনয়ন দিয়েছে।
অন্যদিকে বকশীগঞ্জ উপজেলা পরিষদের টানা চারবারের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুর রউফ তালুকদার সম্প্রতি ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশে যোগ দিয়ে হাতপাখা প্রতীকে নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তিনি একসময় বকশীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির সভাপতি ছিলেন। ২০১৬ সালে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত হলেও দল-মত নির্বিশেষে তার ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা রয়েছে। পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে তার নিজস্ব একটি ভোটব্যাংক রয়েছে বলে স্থানীয়দের ধারণা।
জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অ্যাডভোকেট নাজমুল হক সাঈদী নিয়মিতভাবে দেওয়ানগঞ্জ ও বকশীগঞ্জ উপজেলার গ্রাম-গঞ্জে গণসংযোগ চালাচ্ছেন। কর্মীসভা, পথসভা ও সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিয়ে তিনি দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের পক্ষে ভোট চাইছেন। তার কর্মী-সমর্থকরাও ঘরে ঘরে গিয়ে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
স্থানীয় রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এ আসনে মূলত ধানের শীষ ও দাঁড়িপাল্লার মধ্যে মুখোমুখি লড়াই হলেও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী আব্দুর রউফ তালুকদার গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারেন। ফলে ভোটের হিসাব ত্রিমুখী রূপ নিতে পারে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, ২০২৪ সালের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে বকশীগঞ্জ ও দেওয়ানগঞ্জ উপজেলায় ভাইস চেয়ারম্যান পদে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছিলেন। এ কারণে দলটি এই আসনে নিজেদের শক্ত অবস্থানে দেখছে।
এ ছাড়া জাতীয় পার্টি থেকে প্রথমবারের মতো মনোনয়ন পেয়েছেন এ কে এম ফজলুল হক এবং গণঅধিকার পরিষদ থেকে প্রার্থী হয়েছেন রফিকুল ইসলাম রফিক। তবে গণ-অভ্যুত্থানের পর গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এ আসনে প্রার্থী দেয়নি। সিপিবি ও এবি পার্টিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোরও তেমন কোনো নির্বাচনী তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না।
সব মিলিয়ে ভোটের মাঠে প্রতীক, ব্যক্তি ও রাজনৈতিক সমীকরণ—সবকিছু মিলিয়ে জামালপুর-১ আসনের লড়াই এখন বেশ জমজমাট।
ইখা