ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে যশোর–১ (শার্শা) আসনে রাজনীতির উত্তাপ বাড়ছে। সীমান্তবর্তী এই জনপদে এবার মুখোমুখি হচ্ছেন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর দুই অপরাজিত প্রার্থী। শার্শা উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ আসনে দেশের বৃহত্তম স্থলবন্দর বেনাপোল অবস্থিত। প্রায় তিন লাখ ১১ হাজার ভোটারের এই আসন ঘিরে চলছে জোর নির্বাচনী প্রচারণা ও নানা রাজনৈতিক হিসাব–নিকাশ।
যদিও জাতীয় পার্টি ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থী রয়েছেন, তবে এলাকায় তাদের সাংগঠনিক উপস্থিতি সীমিত। তাদের প্রচার মূলত মাইকিংয়েই সীমাবদ্ধ। ফলে নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা কার্যত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
যশোর–১ আসনটি বরাবরই সব রাজনৈতিক দলের কাছে গুরুত্বপূর্ণ। বিগত ১২টি সংসদ নির্বাচনের ইতিহাসে এখানে আওয়ামী লীগ সাতবার, বিএনপি তিনবার, জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থী একবার করে জয় পেয়েছে। তবে ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে আওয়ামী লীগ ও তাদের মিত্ররা মাঠে কার্যত অনুপস্থিত। ফলে দীর্ঘদিনের দখলদারিত্বের পর এই আসনে বিএনপি ও জামায়াতের পুনরুত্থানকে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে দেখছেন।
ভোটাধিকার ফিরে পাওয়ার প্রত্যাশা, অতীতের দমন-পীড়নের অভিজ্ঞতা এবং বিরোধী দলগুলোর সক্রিয় প্রচেষ্টায় যশোর–১ এখন পরিণত হয়েছে একটি ‘নির্বাচনী হটস্পটে’।
এ আসনে মোট ভোটার তিন লাখ ১১ হাজার ৬৩৩ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার এক লাখ ৫৫ হাজার ৮০৭ জন, নারী ভোটার এক লাখ ৫৫ হাজার ৮২৩ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন তিনজন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের সাধারণ ভোটাররা ভোট দিতে এলে সেই ভোট বিএনপি না জামায়াত—কার ঝুলিতে যাবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
এই আসনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন শার্শা উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক নুরুজ্জামান লিটন। শুরুতে দল সাবেক সংসদ সদস্য মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে মনোনয়ন দিলেও পরে চূড়ান্তভাবে লিটনের নাম ঘোষণা করা হয়।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হয়েছেন দলের কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য মাওলানা আজিজুর রহমান। তিনি একক প্রার্থী হওয়ায় আত্মবিশ্বাসী অবস্থানে রয়েছেন। ইতিমধ্যে দুই পক্ষই মাঠ পর্যায়ে সমানতালে প্রচারণা চালাচ্ছেন।
জাতীয় পার্টির জাহাঙ্গীর আলম চঞ্চল ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বখতিয়ার রহমান প্রার্থী হলেও এলাকায় তাদের প্রভাব সীমিত।
তরুণ নেতা নুরুজ্জামান লিটন তরুণ ভোটারদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয়। আওয়ামী লীগ আমলে রাজনৈতিক মামলায় কারাবরণ করলেও তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ না থাকায় তিনি পরিচ্ছন্ন রাজনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত।
নুরুজ্জামান লিটন বলেন, “দলের দুঃসময়ে নেতাকর্মীদের সঙ্গে থেকে আন্দোলন–সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছি। মাঠপর্যায়ে কাজ করার কারণেই দল আমাকে মনোনয়ন দিয়েছে। আমি শতভাগ জয়ের ব্যাপারে আশাবাদী।”
মাওলানা আজিজুর রহমান বলেন, “সাড়ে ১৫ বছর আমরা প্রকাশ্যে কাজ করতে পারিনি। নির্যাতন সহ্য করেও সাংগঠনিক কার্যক্রম চালিয়েছি। এখন মানুষ দুর্নীতিমুক্ত সমাজ চায়। জামায়াতের প্রতি মানুষের আগ্রহ আগের চেয়ে বেড়েছে।”
তিনি আরও বলেন, শার্শাকে প্রতিশোধ ও সন্ত্রাসমুক্ত করে বেনাপোল বন্দরকে উন্নয়নের সোপানে পরিণত করতে চান তিনি।
সীমান্তবর্তী এই জনপদে চোরাচালান, সন্ত্রাস, বেকারত্ব ও অবকাঠামোগত সমস্যাই ভোটের প্রধান ইস্যু। কিছু এলাকায় এখনও কাঁচা রাস্তা, বর্ষায় জলাবদ্ধতা এবং গ্রুপিং রাজনীতির অভিযোগ রয়েছে। প্রার্থীরা প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন—নির্বাচিত হলে সন্ত্রাস দমন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও উন্নয়ন নিশ্চিত করবেন।
পক্ষ–বিপক্ষের প্রচারণা, মতবিরোধ আর ভোটারদের কৌতূহলে জমজমাট হয়ে উঠেছে যশোর–১ আসনের নির্বাচনী পরিবেশ। স্থানীয়দের ধারণা, এই দুই অপরাজিত প্রার্থীর মধ্যে হবে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই। শেষ পর্যন্ত কে জয়ী হচ্ছেন, তার উত্তর মিলবে ১২ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে।
ইখা