ভোরের কুয়াশা কাটার আগেই পাহাড়ঘেরা জনপদে নেমে আসে অদৃশ্য এক আতঙ্ক। যে পাহাড় একসময় ছিল জীবিকার ভরসা—জ্বালানি কাঠ, চাষাবাদ আর দৈনন্দিন আয়ের আশ্রয়—এখন সেই পাহাড়ই হয়ে উঠেছে ভয় আর অনিশ্চয়তার প্রতীক। ঘর থেকে বের হলেই আর ফিরে আসা হবে কি না, সেই শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার তিন ইউনিয়নের হাজারো মানুষ।
হ্নীলা, বাহারছড়া ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নের দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় সক্রিয় অপহরণ চক্রের কারণে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, জীবিকার তাগিদে পাহাড়ে চাষাবাদ করতে বা লাকড়ি সংগ্রহে গেলেই অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। আর প্রশাসন বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিষয়টি জানালে মুক্তিপণের অঙ্ক বেড়ে যায়, সঙ্গে আসে হত্যার হুমকি।
সবশেষ ঘটনায় নিখোঁজ হয়েছেন ছয় কৃষক। তারা হোয়াইক্যং ইউনিয়নের মিনাবাজার পাহাড়ি এলাকায় কৃষিকাজ ও লাকড়ি সংগ্রহে গিয়েছিলেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, গত মঙ্গলবার সকালে একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত তাদের জিম্মি করে পাহাড়ের ভেতরে নিয়ে যায়। দুদিন পার হলেও এখনো তাদের কোনো খোঁজ মেলেনি।
এ ঘটনায় মিনাবাজারের কোনাপাড়া এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। অনেকেই এখন মাঠে যেতে সাহস পাচ্ছেন না। কৃষিজমি পড়ে আছে অনাবাদি, বন্ধ হয়ে গেছে নিয়মিত আয়ের পথ।
মিনাবাজারের বাসিন্দা নুরুল আমিন বলেন, ‘সকালে কাজ করতে গিয়েছিল ছয়জন। পরে মোবাইলে খবর পাই, তাদের পাহাড়ে ধরে নিয়ে গেছে। এরপর থেকে কোনো খোঁজ নেই।’
স্থানীয় সরওয়ার কামাল জানান, অপহরণকারীরা প্রথমে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করেছিল। পরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতার খবর পেয়ে সেই দাবি বাড়িয়ে আট লাখ টাকায় নিয়ে যায়।
তিনি বলেন, ‘আমরা যদি প্রশাসনকে জানাই, ওরা বলে টাকা বাড়বে, মানুষও মারবে। তাহলে আমরা যাব কোথায়?’
মিনাবাজার এলাকার বিধূ ভূষণ নাথ বলেন, ‘মুক্তিপণের কথা বাইরে জানালেই অপহরণকারীরা ফোন দিয়ে হত্যার হুমকি দেয়। প্রশাসনকে জানালেও বিপদ, না জানালেও বিপদ। আমরা মাঝখানে পড়ে গেছি।’
স্থানীয় কবির আহমেদ বলেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। সামান্য চাষাবাদ করে খাই। এখন অপহরণের ভয়ে অনেক জমিই চাষ হচ্ছে না। নাফ নদীতে মাছ ধরতেও ভয়—ওদিকে আরাকান আর্মির আতঙ্ক। আমাদের আয়ের সব পথ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।’
স্থানীয়দের ভাষ্য, একদিকে সীমান্তঘেঁষা নদীপথে সশস্ত্র গোষ্ঠীর ভয়, অন্যদিকে পাহাড়ে অপহরণ চক্র—দুই দিক থেকেই চাপে পড়েছে জনজীবন। দিন দিন বাড়ছে নিরাপত্তাহীনতা।
দুর্গম এলাকা, কঠিন অভিযান
হ্নীলা, বাহারছড়া ও হোয়াইক্যং ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি অঞ্চল অত্যন্ত দুর্গম। যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল, ঘন বনাঞ্চল, অসংখ্য গিরিখাত ও লুকানোর জায়গা থাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিয়মিত টহল বা অভিযান পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এই অবস্থায় স্থানীয়দের প্রধান দাবি, পাহাড়ঘেঁষা এলাকায় স্থায়ীভাবে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির ক্যাম্প স্থাপন করা হোক।
মিনাবাজারের বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম (৬০) বলেন, ‘টেকনাফ বা হোয়াইক্যং ফাঁড়ি থেকে পুলিশ আসতে অনেক সময় লাগে। ততক্ষণে অপহরণকারীরা মানুষ নিয়ে পাহাড়ে ঢুকে যায়। স্থায়ী ক্যাম্প ছাড়া আমাদের রক্ষা নেই।’
আরেক বাসিন্দা মোস্তফা কামাল বলেন, ‘আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর স্থায়ী উপস্থিতি না থাকলে এই চক্র থামবে না। আমরা দ্রুত ব্যবস্থা চাই।’
পুলিশ জানায়, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর পক্ষ থেকে এখনো লিখিত অভিযোগ বা মামলা হয়নি। তবে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে অভিযান চলছে।
স্থানীয়রা জানান, এটি প্রথম ঘটনা নয়। প্রায় দুই বছর আগে একই এলাকা থেকে দুজনকে অপহরণ করা হয়েছিল। মুক্তিপণ না পেয়ে তাদের হত্যা করা হয় বলে দাবি এলাকাবাসীর। সেই স্মৃতি এখনো তাজা, ফলে নিখোঁজ ছয় কৃষকের পরিবারগুলো দিন কাটাচ্ছে চরম উৎকণ্ঠায়।
সন্ধ্যা নামলেই পাহাড়ঘেরা জনপদের মানুষ দরজা বন্ধ করে বসে থাকে। ভোরে মাঠে যাবে কি না—সে সিদ্ধান্তও নিতে হয় ভয়কে সঙ্গী করে। একসময় যে পাহাড় ছিল জীবনধারণের অবলম্বন, এখন তা যেন মৃত্যু আর অদৃশ্য বন্দিত্বের প্রতীক।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অলক বিশ্বাস বলেন, ‘এলাকাটি দুর্গম হওয়ায় অপহরণকারীরা পালানোর সুযোগ পায়। ছয়জন অপহৃত হওয়ার বিষয়ে আমরা তথ্য পেয়েছি। কেউ লিখিত অভিযোগ না দিলেও সমন্বিতভাবে কাজ করছি। অপহরণকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং অপহৃতদের উদ্ধারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।’
ইখা