ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক দেশের অর্থনীতির প্রাণপ্রবাহ। প্রতিদিন এই পথে হাজার হাজার যানবাহন ছুটে চলে গন্তব্যে। কিন্তু এই ব্যস্ত গতির মাঝেই চোখে পড়ল এক শিউরে ওঠা দৃশ্য। চলন্ত একটি ট্রাক ভর্তি লাল ইট, আর সেই ইটের অসমতল ও শক্ত বিছানার ওপর গভীর ঘুমে মগ্ন দুই শ্রমিক।
একদিকে ইঞ্জিনের প্রচণ্ড গর্জন আর মহাসড়কের তীব্র বাতাস, অন্যদিকে সামান্য অসতর্কতায় নিচে পড়ে যাওয়ার নিশ্চিত মৃত্যুঝুঁকি। অথচ সব ভয়কে তুচ্ছ করে পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছেন এই দুই শ্রমজীবী মানুষ। তাদের এই ঘুম যেন জানান দিচ্ছে হাড়ভাঙা খাটুনির পর এক টুকরো বিশ্রামের জন্য জীবনের মায়ার চেয়েও শরীরের ক্লান্তি আজ বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ট্রাকটি যখন মহাসড়কের স্পিড ব্রেকার বা মোড় পার হচ্ছিল, তখনো ওই দুই শ্রমিকের ঘুমের কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি। শরীরের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য নেই কোনো নিরাপত্তা বেষ্টনী। অথচ আইনের দৃষ্টিতে এবং নিরাপত্তার খাতিরে চলন্ত ট্রাকের ওপর এভাবে অবস্থান করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
এই দৃশ্য কেবল সাহসিকতার নয়, বরং আমাদের শ্রমজীবী মানুষের অসহায়ত্বের প্রতিচ্ছবি। কেন তারা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলন্ত ট্রাকে ঘুমান? দিনরাত ইট লোড-আনলোডের অমানুষিক পরিশ্রমের পর তারা আলাদাভাবে বিশ্রামের সময় বা জায়গা পান না।
গন্তব্যে পৌঁছানোর সময়টুকুই তাদের কাছে একমাত্র বিশ্রামের সুযোগ। অনেক ক্ষেত্রে অভ্যস্ততার কারণে তারা একে সাধারণ বিষয় মনে করেন, যার পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ।
ইটের এই শক্ত বিছানায় শুয়ে তারা হয়তো কোনো সুন্দর জীবনের স্বপ্ন দেখছেন, কিন্তু সেই স্বপ্ন যেকোনো মুহূর্তে দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে পারে। শ্রমের মর্যাদা যেমন জরুরি, তার চেয়েও বেশি জরুরি শ্রমিকের জীবনের নিরাপত্তা। মহাসড়কে এই 'মৃত্যু-আলিঙ্গন' বন্ধ করতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মালিক পক্ষ ও শ্রমিকদের সচেতনতা বাড়ানো এখন সময়ের দাবি।
হাইওয়ে পুলিশের মতে, চলন্ত ট্রাকের ওপরে মানুষ পরিবহন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। যেকোনো সময় হঠাৎ ব্রেক করলে বা ট্রাক নিয়ন্ত্রণ হারালে ওপর থেকে ছিটকে পড়ে প্রাণহানির সম্ভাবনা শতভাগ। এ ধরনের অনিয়ম রোধে কঠোর নজরদারির প্রয়োজন থাকলেও মহাসড়কের অনেক জায়গাতেই এমন দৃশ্য নিয়মিত দেখা যায়।
গজারিয়া হাইওয়ে পুলিশ ফাঁড়ির অফিসার ইনচার্জ মোঃ শাহ কামাল আকন্দ বলেন, “চলন্ত ট্রাকের ওপর শ্রমিক বহন করা সম্পূর্ণ বেআইনি ও চরম ঝুঁকিপূর্ণ। হঠাৎ ব্রেক, মোড় বা দুর্ঘটনার সময় ওপর থেকে পড়ে গিয়ে তাৎক্ষণিক মৃত্যুর আশঙ্কা থাকে। আমরা নিয়মিতভাবে এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করছি। তবে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, মালিক পক্ষ ও শ্রমিকদের সচেতন হওয়াটাও জরুরি। শ্রমিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সবার দায়িত্ব।”
এসআর