শীতের বিদায় ঘণ্টা বাজার আগেই বসন্তের বার্তা নিয়ে সাতকানিয়া উপজেলার গ্রামগঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে আমের মুকুলের সুবাস। কচি সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে থোকা থোকা সোনালি মুকুলে ভরে উঠেছে আমগাছ। সকাল-বিকেল গাছে গাছে মৌমাছির গুঞ্জন, হালকা বাতাসে দুলে ওঠা মুকুল—সব মিলিয়ে যেন সাতকানিয়ার গ্রামগুলো নতুন করে প্রাণ ফিরে পেয়েছে।
চট্টগ্রামের দক্ষিণাঞ্চলের এই উপজেলায় আম শুধু একটি মৌসুমি ফল নয়; এটি অনেক পরিবারের জীবিকা, আশা ও বছরের বড় একটি আয়ের উৎস। তাই গাছে গাছে মুকুল দেখা মানেই চাষিদের মুখে হাসি, চোখে স্বপ্ন। তবে সেই স্বপ্নের পাশেই আছে উৎকণ্ঠা—প্রকৃতি শেষ পর্যন্ত কতটা সহায় হবে?
মুকুল আসা মানেই সব ঝুঁকি কেটে গেছে—এমনটা নয়। বরং কৃষিবিদদের মতে, মুকুল থেকে গুটি হওয়া পর্যন্ত সময়টাই সবচেয়ে সংবেদনশীল। এই সময়ে হপার পোকা, থ্রিপস, অ্যানথ্রাকনোজ ও পাউডারি মিলডিউ রোগের ঝুঁকি থাকে সবচেয়ে বেশি। সামান্য অবহেলাতেই পুরো বাগানের ফলন নষ্ট হয়ে যেতে পারে।
উপজেলার বাজালিয়া, কেঁওচিয়া, মাদার্শা, পুরানগড়, সোনাকানিয়া, কাঞ্চনা, এওচিয়া ও আমিলাইশ ইউনিয়নের বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা যায়, বাড়ির আঙিনার আমগাছ থেকে শুরু করে বাণিজ্যিক বাগান—সবখানেই এবার মুকুলের আধিক্য। কোথাও কোথাও গাছের ডালই আর দেখা যায় না, শুধু মুকুল আর মুকুল।
বাজালিয়া ইউনিয়নের পাহাড়ঘেঁষা একটি গ্রামে গিয়ে দেখা গেল, কয়েক বিঘা জমির আমবাগানে সকাল থেকেই চাষি ও শ্রমিকেরা ব্যস্ত। কেউ গাছের নিচে ঝরা পাতা পরিষ্কার করছেন, কেউ ডালপালা ছাঁটাই করছেন। এক চাষি গাছের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘এমন মুকুল অনেক বছর পর দেখছি। এখন আল্লাহ ভরসা।’
সোনাকানিয়া ইউনিয়নের চাষি আবুল হোসেন বলেন, ‘আগে এমন ছিল—মুকুল আসার আগেই ভয়। এবার মুকুল দেখে মনটা ভরে গেছে। তবে ভয় একটাই—এই মুকুল ধরে রাখতে পারব তো?’
পুরানগড় ইউনিয়নের হারুনর রশীদ বলেন, ‘এক রাতের কুয়াশায় মুকুল কালচে হয়ে যেতে দেখেছি। তাই এখন রাতে ঘুমও ঠিকমতো হয় না।’
মুকুল আসার পর থেকেই অনেক চাষি পরিচর্যায় মনোযোগী হয়েছেন। কেউ নিজ অভিজ্ঞতায়, কেউ কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করছেন। মাদার্শা ইউনিয়নের এক বাগান মালিক জানান, নিয়ম করে গাছ পর্যবেক্ষণ করছেন তিনি। কোথাও পোকার লক্ষণ দেখা গেলে সঙ্গে সঙ্গে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। তাঁর ভাষায়, ‘এই সময়টা পার হলে ফল ধরতে আর তেমন সমস্যা হয় না।’
উপজেলা কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, মুকুল রক্ষায় মাঠপর্যায়ে কৃষকদের সচেতন করতে কাজ করছে তারা। ইউনিয়ন পর্যায়ে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তারা পরামর্শ দিচ্ছেন। প্রয়োজন অনুযায়ী অনুমোদিত বালাইনাশক ব্যবহারের নির্দেশনাও দেওয়া হচ্ছে।
সাতকানিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান বলেন, আমের মুকুল আসার জন্য নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ঠান্ডা প্রয়োজন হয়, তবে অতিরিক্ত কুয়াশা ক্ষতিকর। এবার সেই ভারসাম্য মোটামুটি বজায় ছিল।
তিনি আরও বলেন, অতিরিক্ত ও ভুলভাবে কীটনাশক ব্যবহার করলে উল্টো ক্ষতি হতে পারে। তাই কৃষকদের সচেতন করাই এখন সবচেয়ে জরুরি।
ইখা