এইমাত্র
  • এনসিটি ইজারা ইস্যুতে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটে অচল চট্টগ্রাম বন্দর
  • জনগণের রায়ের ভিত্তিতে বাংলাদেশ চলবে : তারেক রহমান
  • তিস্তা হবে উত্তর অঞ্চলের অর্থনীতির কেন্দ্রবিন্দু: ডা. শফিকুর রহমান
  • শাহজালাল বিমানবন্দর: সক্ষমতার দ্বিগুণ চাপে স্থবির যাত্রী সেবা
  • বিশ্ব কাঁপছে এপস্টেইন কেলেঙ্কারিতে, দেশ কাঁদছে মোহনার যন্ত্রণায়
  • ধানের শীষে ভোট চাইলেন সাংবাদিক হত্যার প্রধান আসামি আ.লীগ নেতা বাবু চেয়ারম্যান
  • অপহরণের নাটক সাজিয়ে মুক্তিপণ আদায়ের চেষ্টা, যুবক আটক
  • আসন পুনরুদ্ধারে মরিয়া বিএনপি, শক্তি জানান দিতে প্রস্তুত জামায়াত
  • বেনাপোলের পল্লীতে পুঁতে রাখা বোমা বিস্ফোরণ, তিন শ্রমিক আহত
  • যশোরে আলমসাধু উল্টে দুই ভাই হতাহত
  • আজ বুধবার, ২১ মাঘ, ১৪৩২ | ৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
    ফিচার

    বিশ্ব কাঁপছে এপস্টেইন কেলেঙ্কারিতে, দেশ কাঁদছে মোহনার যন্ত্রণায়

    আহমদ ইয়াসিন খান প্রকাশ: ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:১২ পিএম
    আহমদ ইয়াসিন খান প্রকাশ: ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:১২ পিএম

    বিশ্ব কাঁপছে এপস্টেইন কেলেঙ্কারিতে, দেশ কাঁদছে মোহনার যন্ত্রণায়

    আহমদ ইয়াসিন খান প্রকাশ: ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:১২ পিএম

    বিশ্বজুড়ে এপস্টেইন ফাইল প্রকাশের পর ক্ষমতা, প্রভাব আর নির্যাতনের অন্ধকার অধ্যায়গুলো নতুন করে আলোচনায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশও সেই আলোচনায় সরব। ঠিক এমন সময়ই দেশের ভেতর থেকে উঠে আসে এক বাস্তব, নির্মম এবং হৃদয়বিদারক ঘটনা—যেখানে কোনো আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক নয়, কোনো গোপন দ্বীপ নয়, বরং রাজধানীর একটি বাসার ভেতরেই দিনের পর দিন ঘটেছে শিশু মোহনার উপর অমানবিক নির্যাতনের ঘটনা। যে ঘটনা নির্বাচনের আলোচনাকেও ছাপিয়ে সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে আলোচনার কেন্দ্র বিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

    বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের এমডি ও সিইও মো. সাফিকুর রহমানের উত্তরার বাসায় কর্মরত মাত্র ১১ বছরের শিশু গৃহকর্মী মোহনার ওপর দীর্ঘদিন ধরে চালানো হয়েছে শারীরিক নির্যাতন। শিশুটির শরীরে নির্যাতনের চিহ্ন দেখে বিষয়টি সামনে আসে এবং পরে তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। মোহনার শরীরজুড়ে আঘাতের দাগ, পোড়া ক্ষত এবং নির্যাতনের স্পষ্ট চিহ্ন। চিকিৎসকরা জানান, এই আঘাতগুলো একদিনের নয়, বরং ধারাবাহিক নির্যাতনের ইঙ্গিত বহন করে।

    নির্যাতনের ঘটনা জানতে পেরে শিশু মোহনার বাবা একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার প্রেক্ষিতে রবিবার (১ জানুয়ারি) দিবাগত রাত ৩টা ৩৫ মিনিটে উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের ৭/সি রোডের বাসা থেকে আসামি সাফিকুর ও তার স্ত্রীসহ ৪ জনকে গ্রেপ্তার করে উত্তরা পশ্চিম থানা–পুলিশ। পরদিন সোমবার (২ জানুয়ারি) বিকেলে তাদের আদালতে পাঠানো হয়। ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রাজু আহমেদ তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন।

    কারাগারে যাওয়া অপর দুই আসামি হলেন সাফিকুর রহমানের বাসার দুই গৃহকর্মী রুপালী খাতুন এবং মোছা. সুফিয়া বেগম। আসামি রুপালী খাতুনের ২ বছর ও ছয় মাসের দুটি শিশুসন্তান আছে। তাদের অভিভাবক না থাকায় সন্তান দুটিকে আসামির সঙ্গে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।

    এ ঘটনায় সাফিকুরের নিয়োগ বাতিল করেছে সরকার। তার স্থলে দায়িত্ব পেয়েছেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. হুমায়রা সুলতানা। মঙ্গলবার বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রণালয়ের এক অফিস আদেশে নিয়োগ বাতিল ও দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি জানানো হয়।

    জানাযায়, নির্যাতনের শিকার শিশু মোহনার বাবা একজন হোটেল কর্মচারী। মামলায় তিনি অভিযোগ করেন, আসামি শফিকুর রহমান ওরফে সাফিকুর রহমান ও তার স্ত্রী বিথীর বাসার সিকিউরিটি গার্ড জাহাঙ্গীরের সাথে তার (বাদী) পরিচয় হয়। সেই সূত্রে গার্ড জাহাঙ্গীর জানতে পারেন তার একটি ছোট্ট মেয়ে রয়েছে। তখন জাহাঙ্গীর তাকে জানান, এই বাসায় বাচ্চা দেখাশোনার জন্য ছোট একটি মেয়ে বাচ্চা খোঁজা হচ্ছে। পরে তিনি ওই বাসায় গিয়ে শফিকুর ও বিথীর সঙ্গে দেখা করেন। তারা জানান, যাকে রাখবে তার বিয়েসহ যাবতীয় খরচ তারা বহন করবেন। এতে রাজি হয়ে গত বছরের জুন মাসে তিনি তার ১১ বছর বয়সী মেয়েকে এই বাসায় কাজে দেন। সর্বশেষ গত বছরের ২ নভেম্বর ওই বাসায় তিনি সন্তানকে সুস্থ অবস্থায় দেখে আসেন। তবে এরপর তিনি সন্তানের সঙ্গে দেখা করতে গেলেও পরিবারটি নানা অজুহাতে দেখা করতে দেয়নি। গত ৩১ জানুয়ারি বেলা দেড়টার দিকে বিথী তাকে ফোন করে জানান, তার মেয়েটি অসুস্থ। তাকে নিয়ে যেতে। তিনি ২টার দিকে মেয়েকে আনতে যান। তখন বিথীকে ফোন করলে তিনি বাইরে আছেন জানিয়ে তাকে অপেক্ষা করতে বলেন। পরে বিথী সন্ধ্যা ৭টার দিকে বাড়ির বাইরে তার কাছে মেয়েকে বুঝিয়ে দেন।

    মোহনার বাবা তখন দেখেন তার মেয়ের দুই হাতসহ শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম। মেয়েটি ভালোভাবে কথাও বলতে পারছে না। কীভাবে এমন হলো জানতে চাইলে বিথী সদুত্তর দিতে পারেননি। পরে তিনি মেয়েকে গাজীপুর শহীদ তাজউদ্দীন আহমদ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করান। এসময় নির্যাতনের শিকার শিশু মোহনা তার বাবাকে জানায়, গত ২ নভেম্বর তিনি দেখা করে যাওয়ার পর থেকে বিভিন্ন সময়ে অকারণে শফিকুর রহমান এবং বিথীসহ অজ্ঞাতনামা আসামিরা তাকে মারধর, খুন্তি গরম করে তার শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছেঁকা দিয়ে গুরুতর জখম করে। পরে মোহনার বাবা এসব বিষয়ে নিজের পরিবারের সঙ্গে আলোচনা করে উত্তরা পশ্চিম থানায় শিশু নির্যাতনের অভিযোগে রবিবার (১ ফেব্রুয়ারি) মামলা করেন।

    বাংলাদেশসহ বিশ্ব যখন আলোচিত এপস্টেইন ফাইল নিয়ে মাতোয়ারা, ঠিক তখনই দেশবাসীর সামনে ওঠে আসে এমন লোমহর্ষক কাণ্ড। গণমাধ্যমসহ সামাজিক যোগাযোগের বিভিন্ন মাধ্যমে শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনের বিষয়টি দেখে নেটিজেনরা বলছেন- এখানে প্রশ্নটা কেবল আইনগত নয়, গভীরভাবে মানবিক। একজন ১১ বছরের শিশু—যার বয়সে স্কুলব্যাগ কাঁধে নেওয়ার কথা, খেলাধুলা আর নিরাপত্তার ছায়ায় বড় হওয়ার কথা—সে কীভাবে দিনের পর দিন ভয় আর যন্ত্রণার ভেতর আটকে থাকে, অথচ আমরা কিছুই টের পাই না?

    শিশু গৃহকর্মী নির্যাতনের এই ঘটনায় নতুন করে সামনে আসে বাংলাদেশের এক পুরোনো অথচ অস্বস্তিকর বাস্তবতা—শিশু গৃহকর্মী। আইন অনুযায়ী শিশুদের গৃহকর্মে নিয়োগ ঝুঁকিপূর্ণ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তারা থাকে নজরের বাইরে।

    মানবাধিকারকর্মীরা এ বিষয়ে জানান, ঘরের চার দেয়ালের ভেতরে সংঘটিত নির্যাতন সবচেয়ে ভয়ংকর, কারণ সেখানে কোনো ক্যামেরা নেই, নেই প্রতিবেশীর চোখ, নেই নিয়মিত তদারকি। এই শিশুটিও ছিল ঠিক সেই অদৃশ্য জগতে।

    তারা বলেন, এই ঘটনার সবচেয়ে নাড়া দেওয়া দিকটি হলো অভিযুক্ত ব্যক্তির পরিচয়। তিনি কোনো সাধারণ নাগরিক নন। তিনি রাষ্ট্রায়ত্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ নির্বাহী। যিনি প্রতিদিন শৃঙ্খলা, নিয়ম আর নিরাপত্তার কথা বলেন—তার বাসাতেই ঘটে এমন নির্যাতন।

    তারা আরও বলেন, এই ঘটনাটি সামাজিকভাবে আমাদের সামনে এক ভয়ংকর বাস্তবতা উন্মোচন করে দেয়। এমন নির্যাতন একদিনে তৈরি হয় না, বরং সমাজের ভেতরে নীরবে বেড়ে ওঠে। ঘরের চার দেয়ালের আড়ালে, ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের ছায়ায় এসব ঘটনা অহরহ ঘটছে—কিন্তু বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তা আলোচনায় আসে না। কারণ নির্যাতিতরা শিশু, দরিদ্র কিংবা কণ্ঠহীন; আর নির্যাতনকারীরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত, প্রভাবশালী ও ‘সম্মানিত’ মুখ।

    আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা উচ্চপদে আসীন, দামি পোশাক পরে ঘুরে বেড়ান, মার্জিত ভাষায় কথা বলেন। কিন্তু সেই পোশাকের আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক অমানুষ, এক নরপিশাচ। বাইরে সভ্যতার মুখোশ, ভেতরে নিষ্ঠুরতার আস্তানা। এই দ্বৈত চরিত্রই সমাজের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক, কারণ এখানে মানুষ অপরাধীকে চিনতে পারে না—বিশ্বাস করে, আশ্রয় দেয়, আর সেই বিশ্বাসের ভেতরেই জন্ম নেয় নির্যাতন।

    শিশু গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও ভয়াবহ। তারা থাকে সম্পূর্ণ নির্ভরশীল অবস্থায়—খাবার, ঘুম, চিকিৎসা, এমনকি বাঁচার অধিকারও অন্যের দয়ার ওপর। সমাজ যখন শিশু শ্রমকে ‘স্বাভাবিক’ বলে মেনে নেয়, তখন নির্যাতনও ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হয়ে যায়। প্রতিবেশী জানে, আত্মীয় জানে, কিন্তু কেউ প্রশ্ন তোলে না—কারণ নির্যাতনটি ঘটছে ‘ঘরের ভেতরে’।

    এই নীরবতাই অপরাধীদের সবচেয়ে বড় শক্তি। আমরা অনেক সময় বলি, এমন ঘটনা বিরল। কিন্তু বাস্তবতা হলো—যেগুলো প্রকাশ্যে আসে, সেগুলো কেবল চূড়ার অংশ। নিচে রয়ে যায় অগণিত অদৃশ্য শিশু, যাদের কান্না দেয়ালে আটকে যায়, সমাজের কানে পৌঁছায় না। এই শিশুটির ঘটনা ব্যতিক্রম নয়; এটি কেবল সেই নীরবতার ফাঁক গলে বেরিয়ে আসা একটি সত্য।

    এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্নটা আর ব্যক্তিগত অপরাধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি হয়ে ওঠে সামাজিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। আমরা কাদের সম্মান দিচ্ছি, কাদের চোখে বিশ্বাস রাখছি, আর কাদের যন্ত্রণা দেখেও দেখছি না—সেই হিসাব না বদলালে এমন ঘটনা বারবার ঘটবে। কারণ অমানুষ জন্মায় না; সমাজই তাকে নির্বিঘ্নে অমানুষ হয়ে ওঠার সুযোগ দেয়।

    আমরা নিজের সন্তানদের জন্য কতটা সতর্ক থাকি—তাদের খাওয়া, পড়া, অসুস্থতা, মানসিক অবস্থার দিকে সারাক্ষণ নজর রাখি। একটু কষ্ট পেলেই আঁতকে উঠি, আদর করি, নিরাপত্তার বলয় তৈরি করি। অথচ একই বয়সের আরেকটি শিশু যখন আমাদেরই বাসার ভেতরে কাজ করে, তখন হঠাৎ করেই সে যেন মানুষ নয়, দায়িত্ব নয়—সে হয়ে ওঠে ‘কাজের লোক’। তার ক্ষুধা, তার ভয়, তার কান্না আমাদের চোখে পড়ে না। বয়সটা বদলায় না, বদলায় কেবল তার সামাজিক অবস্থান।

    এই বৈষম্যটাই সবচেয়ে নির্মম। একই বয়স, একই শৈশব—কিন্তু একদিকে নিরাপত্তা ও ভালোবাসার ছায়া, অন্যদিকে নিরবচ্ছিন্ন শোষণ আর ভয়। আমরা সন্তান হিসেবে যাকে আগলে রাখি, গৃহকর্মী হিসেবে তাকেই অবহেলা করি—এই দ্বৈত নৈতিকতা সমাজে নির্যাতনের সবচেয়ে বড় নীরব ভিত্তি তৈরি করে। যত দিন আমরা এই প্রশ্নটির মুখোমুখি না হব—‘ও কি আমার সন্তানের মতোই একটি শিশু নয়?’—তত দিন এমন ঘটনা থামবে না।

    এপস্টেইন ফাইল যেমন বিশ্বকে দেখাচ্ছে—ক্ষমতা কীভাবে দুর্বলদের কণ্ঠ রুদ্ধ করে রাখে—ঠিক তেমনি এই ঘটনাও আমাদের আয়না ধরিয়ে দেয়। পার্থক্য শুধু পরিসরের, যন্ত্রণার নয়।

    বিশ্ব যখন বড় বড় নামের বিচার চাইছে, তখন আমাদেরও উচিত নিজেদের ঘরের ভেতরের নির্যাতনের বিরুদ্ধে একই সাহস দেখানো। কারণ ন্যায়বিচার ছোট বা বড় হয় না—শুধু হয়, অথবা হয় না।

    ইখা

    সম্পর্কিত:

    সম্পর্কিত তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি

    সর্বশেষ প্রকাশিত

    Loading…