জীবন মানেই যুদ্ধ। মানুষের চলার পথ পুষ্প সজ্জিত নয়। প্রতিটি মানুষকে জীবনের সাথে সংগ্রাম করে বেঁচে থাকতে হয়। এমনি এক জীবন সংগ্রামী নারী মোংলা উপজেলার ময়না বেগম।
৪২ বছর বয়সী ময়না বেগম পৌর শহরের মামার ঘাটের পাশে একটি ঝুপড়ি ঘর তৈরি করে প্রতিদিন ভোর ছয়টা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত পিঠা বিক্রি করে। এই পিঠা বিক্রির টাকায় চলে তার সংসার, মেয়েদের পড়াশোনা এবং তাদের চিকিৎসা খরচ। তবুও থেমে নেই উদ্যোমী এই নারী। ময়না বেগম উপজেলার সুন্দরবন ইউনিয়নের কচুবুনিয়া এলাকার মো: আবুল হোসেনের স্ত্রী।
পিঠা বিক্রেতা ময়না বেগম জানান, ছোটবেলা থেকেই বাবার অভাবের সংসারে বেড়ে উঠেছেন তিনি। জীবনের কোন শখ-আল্লাদ পূরণ করতে পারেনি বাবার অভাব অনটনের সংসারে। টাকার অভাবে পড়াশোনাও করতে পারেননি তিনি। সংসারে অভাব থাকায়, টানাপোড়েনের সংসারে শৈশবেই বিয়ে দেন তার পরিবার। বিয়েও হয় আরেক অভাবের সংসারে। বাবার বাড়ি থেকে স্বামীর বাড়ি সবখানেই যেন কষ্ট, কষ্ট যেন আর শেষই হয়না তার জীবনে। চার মেয়ে নিয়েই তার জীবন সংসার। বড় মেয়ে মুন্নি (১৮) আর মেঝো মেয়ে জুঁই ( ১৭) এর বিয়ে হয়েছে। আর ছোট দুই মেয়ে আকলিমা (৮) ও তাসলিমা (৭) সরকরী প্রাথমিক বিদ্যালয় পড়াশোনা করছে।
তিনি আরো বলেন ২২ বছর আগে তার বিয়ে হয়েছিল মো: আবুল হোসেনের সাথে। অভাবের তারনায় জীবনের প্রয়োজনে, বেঁচে থাকার তাগিদে বেড়িয়ে পড়েন কর্মের সন্ধানে। সেই থেকে বিরামহীনভাবে ভাবে চলছে তার জীবন সংগ্রাম। বিপদ যেন তার পিছু ছাড়ে না।
দুই স্বামী স্ত্রী আর ছোট সন্তানদের নিয়ে চলছে তাদের টিকে থাকার সংগ্রাম। তবুও হার মানেনি তিনি, হাত পাতেনি সমাজের কারো কাছে। নিজেই পিঠা বিক্রি করে, সেই টাকা দিয়ে চালাচ্ছেন সংসার খরচ, মেয়েদের পড়াশুনা ও নিজের ঔষধ খরচের টাকা। তার এ কাজে তার মেঝো মেয়ে ও তার ছোট মেয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি তাকে সহযোগিতা করে থাকেন।
ময়না বেগম বলেন, সারা বছরই তিনি ভোরবেলা থেকে শুরু করে রাত পর্যন্ত চালের গোড়া দিয়ে চিতই পিটা ও তেলের পিঠা তৈরি করে তা বিক্রি করে থাকেন। প্রতিটি চিতই পিঠা ও তেলের পিঠা বিক্রি হয় ১০ টাকা মূল্যে। চিতই পিঠার সাথে দেওয়া হয় ধনিয়া , মরিচ, শুটকিসহ বিভিন্ন ধরনের বাটা মশলার ভর্তা।
আগে প্রতিদিনই তিনি ৮ থেকে ১০ কেজি চালের পিঠা বিক্রি করতেন। এতে তার দৈনিক সব খরচ বাদ দিয়ে দৈনিক ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা থাকতো। মাসে ১০ থেকে ১২ হাজার টাকার মতো আয় রোজগারে তার সংসার চলে যেতো। কিন্তু এখন দোকান বেশী হওয়ায় ৪ থেকে ৫ কেজি চালের পিঠা বিক্রি করতে হচ্ছে। তাতে সংসার খরচ ও মেয়ের পড়াশোনার টাকা জোগাড় করতে হিমশিম খেতে হয় তাকে। এই দুর্মূল্যের বাজারে যা রোজগার করি তা দিয়ে ঠিকমত তিনবেলা খাওয়াই কষ্টকর হয়ে দাঁড়িয়েছে। সারা বছর তেমন একটা পিঠার চাহিদা থাকে না। তবে শীতের সময় আসলে পিঠার চাহিদা বাড়ে বলে জানান তিনি।
তৎকালীন সরকারের সময়ে আশ্রয়ন প্রকল্পের একটি ঘর পেয়েছেন তিনি। তার নিজের বলতে সম্বল এই ঘরটি। এ ছাড়া আর কোন জমি জমা তার নেই। চলাফেরার অসুবিধার জন্য তিনি যে ঝুপড়ি ঘরে পিঠা বিক্রি করেন এবং রাতে সেই ঘরেই থাকেন বলে জানান।
এফএস