ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে গ্রেপ্তারের উদ্দেশে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক অভিযানের কয়েক মাস আগে থেকেই দেশটির কট্টর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিয়োসদাদো ক্যাবেলোর সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করেছিল ট্রাম্প প্রশাসন। এমন তথ্য জানিয়েছে বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একাধিক সূত্র। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানের পরও ক্যাবেলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
শনিবার (১৭ জানুয়ারি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্স। প্রতিবেদনে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট চারটি সূত্র জানায়, ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তারা ৬২ বছর বয়সী ক্যাবেলাকে সতর্ক করেছিলেন যেন তিনি তার নিয়ন্ত্রণাধীন নিরাপত্তা বাহিনী বা ক্ষমতাসীন দলের সশস্ত্র সমর্থকদের ব্যবহার করে ভেনেজুয়েলার বিরোধীদের টার্গেট না করেন। ক্যাবেলোর অধীনে থাকা এই নিরাপত্তা কাঠামোর মধ্যে রয়েছে গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ ও সশস্ত্র বাহিনী, যা জানুয়ারি ৩ তারিখের মার্কিন অভিযানের পরও প্রায় অক্ষত রয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন মাদুরোকে গ্রেপ্তারের জন্য যে মার্কিন মাদক পাচারের অভিযোগ এনেছিল, তাতে ক্যাবেলোর নামও রয়েছে। তবে অভিযানের সময় ক্যাবেলাকে আটক করা হয়নি। সূত্র জানায়, ক্যাবেলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যোগাযোগে তার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা ও মামলার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে। বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসনের শুরুর দিক থেকেই এই যোগাযোগ শুরু হয় এবং মাদুরো অপসারণের ঠিক আগ পর্যন্ত তা চলতে থাকে। মাদুরো অপসারণের পরও এই যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে বলে চারটি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এই গোপন যোগাযোগগুলো ভেনেজুয়েলার ভেতরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ট্রাম্প প্রশাসনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে। এক সূত্রের মতে, ক্যাবেলো যদি তার নিয়ন্ত্রণাধীন বাহিনীকে সক্রিয় করেন, তাহলে দেশজুড়ে অস্থিতিশীলতা তৈরি হতে পারে, যা যুক্তরাষ্ট্র এড়াতে চায় এবং অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেজের ক্ষমতা ধরে রাখার প্রচেষ্টাকে হুমকির মুখেও ফেলতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ক্যাবেলোর আলোচনায় ভেনেজুয়েলার ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা নিয়ে কোনো কথা হয়েছে কি না, তা স্পষ্ট নয়। একইভাবে, তিনি মার্কিন সতর্কবার্তা কতটা মেনেছেন তাও জানা যায়নি। তবে ক্যাবেলো প্রকাশ্যে রদ্রিগেজের সঙ্গে ঐক্যের ঘোষণা দিয়েছেন, যাকে ট্রাম্প এ পর্যন্ত প্রশংসা করে আসছেন।
মাদুরো-পরবর্তী ভেনেজুয়েলার জন্য ট্রাম্পের কৌশলের মূল ভরকেন্দ্র হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র রদ্রিগেজকে দেখলেও, ক্যাবেলোর হাতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা বা পুরো পরিকল্পনাই ভেস্তে দেয়ার মতো ক্ষমতা রয়েছে বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয়। এক সূত্র জানায়, ক্যাবেলো সরাসরি ও মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখেছেন।
সংবেদনশীল এই আলোচনার বিষয়ে খোলামেলা কথা বলার জন্য সব সূত্রই নাম প্রকাশ না করার শর্তে এসব তথ্য দিয়েছেন। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে হোয়াইট হাউস ও ভেনেজুয়েলা সরকারকে অনুরোধ করা হলেও তারা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
দিয়োসদাদো ক্যাবেলো দীর্ঘদিন ধরেই ভেনেজুয়েলার দ্বিতীয় সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত। প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো শ্যাভেজের ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং মাদুরোর রাজনৈতিক গুরু হিসেবে পরিচিত শ্যাভেজের পর তিনি মাদুরোর অন্যতম বিশ্বস্ত অনুগত হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিত। যদিও রদ্রিগেজ ও ক্যাবেলা দুজনই বহু বছর ধরে সরকার, সংসদ ও ক্ষমতাসীন সমাজতান্ত্রিক দলের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকলেও তারা মাদুরোর কখনও ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত ছিলেন না।
সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ক্যাবেলো দেশটির সামরিক ও বেসামরিক কাউন্টার ইন্টেলিজেন্স সংস্থার ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছেন, যেগুলো অভ্যন্তরীণ নজরদারিতে সক্রিয় ভূমিকা রাখে। তিনি সরকারপন্থি মিলিশিয়া গোষ্ঠী, বিশেষ করে ‘কোলেকটিভো’-এর সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত। মোটরসাইকেলে চলাচলকারী সশস্ত্র এই বেসামরিক গোষ্ঠীগুলো অতীতে বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলায় ব্যবহৃত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে ক্যাবেলো সেই অল্প কয়েকজন মাদুরো অনুগতের একজন, যাদের ওপর ভর করে তেলসমৃদ্ধ ওপেকভুক্ত এই দেশে একটি অনির্দিষ্ট রূপান্তরকালীন সময়ে স্থিতিশীলতা বজায় রাখা সম্ভব বলে মনে করা হচ্ছে। তবে তার দমনমূলক অতীত ও রদ্রিগেজের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতার ইতিহাসের কারণে তিনি পুরো প্রক্রিয়ায় ‘স্পয়লার’ বা ক্ষতিকারক হয়ে উঠতে পারেন—এমন আশঙ্কাও করছেন মার্কিন কর্মকর্তারা।
রদ্রিগেজ ইতোমধ্যে নিজের অবস্থান শক্ত করতে গুরুত্বপূর্ণ পদে অনুগতদের বসাচ্ছেন এবং একই সঙ্গে তেল উৎপাদন বাড়াতে যুক্তরাষ্ট্রের দাবিও মেনে চলছেন। ভেনেজুয়েলার ভেতরের সূত্রের বরাতে রয়টার্সকে দেয়া সাক্ষাৎকারে এমন তথ্যই উঠে এসেছে।
ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ভেনেজুয়েলা বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এলিয়ট অ্যাব্রামস বলেন, গণতান্ত্রিক রূপান্তর এগোতে হলে অনেক ভেনেজুয়েলানই আশা করবেন ক্যাবেলোকে একসময় সরিয়ে দেয়া হবে। যখন এবং যদি তিনি বিদায় নেন, তখনই ভেনেজুয়েলানরা বুঝবে যে শাসনব্যবস্থা সত্যিই বদলাতে শুরু করেছে।’
এবি