চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া বন্ধের দাবিতে অনির্দিষ্টকালের শ্রমিক কর্মবিরতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বন্দর ব্যবহারকারী ব্যবসায়ীরা।
বুধবার (৪ ফেব্রুয়ারি) সন্ধ্যায় নগরীর আগ্রাবাদ হোটেলের লবিতে উপস্থিত সাংবাদিকদের এ উদ্বেগের কথা জানান তারা। এসময় তারা এনসিটি নিয়ে সৃষ্ট জটিলতার বিষয়ে সরকারকে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানান।
এর আগে এদিন দুপুর আড়াইটায় আগ্রাবাদ হোটেলের কর্ণফুলী হলে আন্দোলনকারী শ্রমিকদল নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন ব্যবসায়ী নেতারা। এসময় দেশের অর্থনীতি সচল রাখতে এবং জাতীয় নির্বাচন ও রমজান সামনে রেখে সংকটকালীন আন্দোলন পরিহার করার জন্য শ্রমিক নেতাদের অনুরোধ জানালেও তারা তাদের দাবির পক্ষে অনড় থাকেন। শ্রমিক নেতারা বদলিসহ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রত্যাহার ও এনসিটি ইজারার সিদ্ধান্ত স্থগিত রেখে আলোচনার প্রস্তাব দেন ব্যবসায়ীদের।
সভায় বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বাংলাদেশ ইপিজেড ইনভেস্টরস অ্যাসোসিয়েশন (বেপজিয়া), সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশন এবং আন্দোলনকারীদের পক্ষে বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
সভা শেষে পোর্ট ইউজার্স ফোরামের শীর্ষ নেতা এবং এশিয়ান গ্রুপের ম্যানেজিং ডিরেক্টর এম এ সালাম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি বলেন, বন্দরে অনির্দিষ্টকালের শ্রমিক কর্মবিরতিতে শুধু আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি না, তারাও (শ্রমিক) ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। কারণ অনেক শ্রমিক দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কাজ করেন, তারাও মার খাচ্ছেন। এ অবস্থায় এখন ব্যবসায়ীরা চোখে অন্ধকার দেখছেন।
এম এ সালাম বলেন, বন্দর চেয়ারম্যানকে অনুরোধ করবো- বাংলাদেশের লাইফ লাইন, ৯০ শতাংশ আমদানি রপ্তানি যে চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে হয় তা চারদিন বন্ধ থাকতে পারে না। একটা বিষয় সবাই খেয়াল করবেন, আগেও একদিন, দুদিন বন্দর বন্ধ ছিল- কিন্তু জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়নি। এবার প্রথম জাহাজ চলাচল বন্ধ। ইন্টারন্যাশনালি সবাই এটার দিকে তাকিয়ে আছে।
এটা সুনাম বয়ে আনছে না, বরং দুর্নাম বয়ে আনছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সরকারকে অনুরোধ করবো শিগগির আলোচনা করার জন্য। খুব একটা বড় সমস্যা নয়। আমরা যা আলোচনা করেছি, এটাতে কী উপকার হবে, কী অপকার হবে তা যদি তাদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়, নেগোসিয়েশনের কোনো বিকল্প নেই। সরকার গত চারদিন (আলোচনা) করেনি। এখন দ্রুত আলোচনা শুরু করলে, সেটি রাত হোক, দিন হোক কোনো ব্যাপার নয়, তারা কথা দিয়েছেন কাজে অংশগ্রহণ করবেন।
এদিকে পোর্ট ইউজার্স ফোরামের শীর্ষ এ নেতা আরও বলেন, আন্দোলনরত শ্রমিক নেতাদের সঙ্গে বসেছিলাম অনুরোধ করতে তাদের কর্মবিরতি প্রত্যাহারের জন্য। বিশদ আলোচনা হয়েছে, প্রায় চার ঘণ্টা। সামনে নির্বাচন, তিনদিনের ছুটি। এর সাত-আটদিন পর রমজান। রমজানের পণ্যগুলো কীভাবে ডেলিভারি করবে সেগুলো নিয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। গার্মেন্টস সেক্টর বিশেষ করে ফেব্রুয়ারিতে কাজ করবে মাত্র ১৮ দিন, মার্চে কাজ করবে মাত্র ১৬-১৭ দিন।
তিনি আরও বলেন, এভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য যদি বন্দর বন্ধ থাকে উৎপাদন করা পণ্য যাবে না, আবার ভবিষ্যৎ কাঁচামাল আসবে না। এর ওপর আবার ফেব্রুয়ারির ১১ তারিখ থেকে চীনে ছুটি ১৬ দিনের জন্য। আমরা অসম্ভব ক্ষতির মুখে আছি, বিশেষ করে ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টর এবং রমজানের বিষয়ে পুরো দেশবাসী। বন্দর যদি এভাবে বন্ধ থাকে বন্দরের যে চার্জেস আসবে তার দায়ভার ব্যবসার ওপর আসবে। ব্যবসার ওপর আসলেও ব্যবসায়ী তো আর দেবেন না, আলটিমেটলি কনজিউমারের ওপর যাবে। সে জন্যই আমরা উদ্বিগ্ন, সে জন্যই আমরা বসেছিলাম।
তিনি বলেন, নির্বাচনের কয়েকদিন মাত্র বাকি। তাদের যৌক্তিক দাবি নিয়ে আলোচনার বিষয়ে আমরা একমত হয়েছি সরকারকে অনুরোধ করা। এনসিটি নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে। কিছু শ্রমিকের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এগুলো নিয়ে তারা কনসার্ন। আলোচনা ছাড়া কোনো সমাধান হবে না। যদি এনসিটি নিয়ে বৃহৎ আকারে আলোচনা হয় তারা কর্মসূচি বন্ধ রেখে কাজে যোগ দেবেন। সরকারের ওপরের লেভেলের সবাইকে অনুরোধ করছি, বন্দর ব্যবহারকারীরা এখন যে কষ্টে আছেন- দেশবাসী কষ্টে কিন্তু কাল থেকে পড়বে। মাত্র ১৫ দিন পরে ছোলা, খেজুর, কিশমিশ, ডালসহ রমজানের সব ভোগ্যপণ্য লাগবেই। সাপ্লাই চেন অসম্ভব ক্ষতির মুখে পড়বে। অ্যাট দ্য সেম টাইম ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টর ও রপ্তানি অসম্ভব ক্ষতির মুখে পড়বে। আমরা তাদের অনুরোধ করেছি। আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। আলোচনা শুরু হলে, তাদের যদি কথা দেওয়া হয়, বুঝিয়ে দেওয়া হয় তাহলে অনতিবিলম্বে কাজে ফেরত যাবেন।
এদিকে গত শনিবার থেকে সোমবার পর্যন্ত সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা এবং মঙ্গলবার থেকে টানা অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির প্রভাবে কার্যত দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরের জেটি, টার্মিনাল, শেড, ইয়ার্ডে টানা অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
গতকাল মঙ্গলবার (৩ ফেব্রুয়ারি) অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতির কর্মসূচি ঘোষণা করেন বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ও শ্রমিক দল নেতা মো. ইব্রাহিম খোকন। বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের আরেক সমন্বয়ক ও শ্রমিকদল নেতা মো. হুমায়ুন কবীর বলেন, সরকার যতক্ষণ ইজারা প্রক্রিয়া থেকে ফিরে না আসবে ততক্ষণ এ কর্মসূচি চলবে। বন্দরের সর্বস্তরের কর্মচারীরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর্মবিরতিতে সাড়া দিয়েছেন।
জানা গেছে, গত মঙ্গলবার থেকে নতুন জাহাজ জেটিতে ভেড়ানো সম্ভব হয়নি। এমনকি বহির্নোঙরে যাওয়ার জন্য তৈরি জাহাজগুলোও বন্দর ত্যাগ করতে পারেনি। আন্দোলনকারীরা বন্দরের প্রতিটি প্রবেশপথে শক্ত অবস্থান নিয়েছেন। এ কারণে কোনো শ্রমিক কাজে যোগ দিতে পারেননি।
ফলে জেটি থেকে ইয়ার্ড—সর্বত্রই ছিল জনমানবহীন। স্বাভাবিক সময়ে বন্দরের ৪ নম্বর গেটের সামনে রপ্তানি ও আমদানি পণ্যবাহী লরি ও ট্রেইলারের দীর্ঘ সারি থাকে। গতকাল গেটের দুই পাশ ছিল তালাবদ্ধ। মাঝে মধ্যে দু-একটি ব্যক্তিগত গাড়ি যাতায়াতের জন্য ছোট দরজা খোলা হলেও পণ্যবাহী কোনো যানবাহনের দেখা মেলেনি। গতকাল পর্যন্ত জেটি ও বহির্নোঙরে ১৪২টি জাহাজ আটকা পড়েছিল। এর মধ্যে উল্লেযোগ্যসংখ্যক জাহাজে রয়েছে চিনি, ভোজ্যতেল ও ডালের মতো পণ্য।
এদিকে, বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক মো. হুমায়ুন কবীরসহ আন্দোলনে জড়িত অন্তত ১৬ জন কর্মচারীকে প্রথমে ঢাকার পানগাঁও আইসিটি ও কমলাপুর আইসিডিতে বদলি করা হয়। পরে মন্ত্রণালয় তাদের মোংলা ও পায়রা বন্দরে শাস্তিমূলক বদলি করলেও তারা বদলিকৃত কর্মস্থলে যোগদান করেননি।
এবি