মালয়েশিয়ায় কাজের প্রলোভন দেখিয়ে এক কিশোরকে সমুদ্রপথে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু গন্তব্যে পৌঁছানোর বদলে তাকে মিয়ানমারের দুর্গম জঙ্গলে টানা ৫০ দিন জিম্মি করে রাখা হয়। পরে বয়স কম হওয়ায় তাকে ফের টেকনাফে এনে একটি বাড়িতে আটকে রেখে পরিবারের কাছে মুক্তিপণ দাবি করা হয়। শেষ পর্যন্ত পুলিশের অভিযানে উদ্ধার হয়েছে ১৭ বছর বয়সী ওই কিশোর।
শুক্রবার (১৩ ফেব্রুয়ারি) রাত সাড়ে ১০টার দিকে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের দরগাহছড়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে কিশোর জুবায়েরকে উদ্ধার করে টেকনাফ থানা–পুলিশ। একই অভিযানে মানবপাচার ও অপহরণ চক্রের সন্দেহভাজন চার সদস্যকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
উদ্ধার হওয়া জুবায়ের টেকনাফের হোয়াইক্যং ইউনিয়নের ঝিমংখালী এলাকার মৃত ইমাম হোসেনের ছেলে। গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা হলেন নুরুল ইসলাম (৫০), ছিদ্দিক আহমদ (৫৪), আব্দুল্লাহ (২৫) ও হামিদ উল্লাহ (১৯)।
পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুই মাস আগে জুবায়েরকে মালয়েশিয়ায় কাজের ব্যবস্থা করে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। দালালরা জানায়, সমুদ্রপথে নেওয়া হবে; আগাম টাকা লাগবে না, পরে আয় থেকে শোধ করলেই চলবে। দরিদ্র পরিবারের সন্তান জুবায়ের সেই প্রলোভনে রাজি হয়।
এক রাতে তাকে টেকনাফ উপকূল দিয়ে সমুদ্রপথে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে মালয়েশিয়ায় পৌঁছানোর বদলে তাকে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে একটি জঙ্গলে আটকে রাখা হয়। সেখানে আরও কয়েকজন তরুণকে জিম্মি করে রাখা হয়েছিল বলে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা গেছে।
একজন তদন্ত–সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বলেন, পাচারকারীরা প্রথমে সমুদ্রপথে পাঠানোর চেষ্টা করে। পরিস্থিতি অনুকূলে না থাকলে বা ঝুঁকি তৈরি হলে ভুক্তভোগীদের জিম্মি করে পরিবারের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের পথ বেছে নেয়।
জানা গেছে, জুবায়েরের বয়স কম হওয়ায় তাকে মালয়েশিয়ায় পাঠানো ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে চক্রটি। পরে তাকে আবার বাংলাদেশে এনে টেকনাফ সদর ইউনিয়নের দরগাহছড়া এলাকায় নুরুল ইসলামের বাড়িতে আটকে রাখা হয়। সেখান থেকে পরিবারের কাছে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা হয়।
পরিবারের দাবি, ছেলেকে ছাড়িয়ে আনতে প্রথম দফায় বিকাশের মাধ্যমে ৪০ হাজার টাকা পাঠানো হয়। কিন্তু এরপরও তাকে মুক্তি না দিয়ে আরও অর্থের জন্য চাপ দেওয়া হয়।
মুক্তিপণের দাবি বাড়তে থাকায় পরিবারটি পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ করে। সেই অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে জুবায়েরকে উদ্ধার করা হয়। এ সময় অপহরণে ব্যবহৃত একটি ইজিবাইক জব্দ করা হয়েছে।
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি), কক্সবাজার জেলা পুলিশ বলেন, ‘এটি একটি সংঘবদ্ধ মানবপাচার চক্রের কাজ। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। চক্রের অন্য সদস্যদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান চলছে।’
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার চারজনের বিরুদ্ধে মানবপাচার ও অপহরণ আইনে মামলা প্রক্রিয়াধীন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, টেকনাফ দীর্ঘদিন ধরে সমুদ্রপথে মানবপাচারের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। বিশেষ করে মালয়েশিয়াগামী অনিয়মিত অভিবাসনের ক্ষেত্রে স্থানীয় ও সীমান্তপারের দালাল চক্র সক্রিয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র বলছে, সাম্প্রতিক সময়ে পাচার ব্যর্থ হলে বা সীমান্তে কড়াকড়ি বাড়লে জিম্মি করে মুক্তিপণ আদায়ের প্রবণতা বেড়েছে।
উদ্ধারের পর জুবায়ের শারীরিকভাবে দুর্বল ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত বলে জানিয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। তাদের দাবি, তার চিকিৎসা ও মানসিক কাউন্সেলিং প্রয়োজন।
স্থানীয়দের প্রশ্ন, একটি কিশোরকে সীমান্ত পার করে নিয়ে যাওয়া, জঙ্গলে আটকে রাখা এবং পরে দেশে এনে প্রকাশ্যে একটি বাড়িতে জিম্মি করে রাখার ঘটনা কীভাবে এতদিন নজরের বাইরে রইল।
ইখা