মরুভূমির পাথুরে ফাঁকে বসবাসকারী ছোট্ট এক সরীসৃপ লেপার্ড গেকো। শান্ত স্বভাব, সহজ পরিচর্যা এবং দাগযুক্ত শরীরের কারণে এটি এখন বিশ্বের নানা দেশে জনপ্রিয় পোষ্য প্রাণী। তবে পোষ্য হিসেবেই নয়, প্রকৃতিতে লেপার্ড গেকোর জীবনচক্রও বেশ বিস্ময়কর।
দক্ষিণ এশিয়ার শুষ্ক ও আধা-শুষ্ক অঞ্চলে—বিশেষ করে পাকিস্তান, ইরান, ভারত ও আফগানিস্তানের মরুভূমি ও তৃণভূমিতে এদের প্রাকৃতিক আবাস। সাধারণত ৭ থেকে ১০ ইঞ্চি লম্বা এই গেকোর শরীরে থাকে কালো বা গাঢ় বাদামি দাগ, যা চিতাবাঘের চামড়ার মতো দেখায় বলেই নামের সঙ্গে ‘লেপার্ড’ যুক্ত হয়েছে।
মোটা লেজে শক্তির ভাণ্ডার
লেপার্ড গেকোর অন্যতম বৈশিষ্ট্য তাদের মোটা, চর্বিযুক্ত লেজ। খাদ্যের অভাব হলে এই লেজে সঞ্চিত চর্বিই শক্তির জোগান দেয়। বিপদের সময় শত্রুর দৃষ্টি অন্যদিকে ফেরাতে তারা লেজ ঝরিয়ে দিতে পারে। পরে লেজ আবার গজালেও তা আগের মতো নিখুঁত হয় না।
চোখের পাতা আছে, ঘুমায় চোখ বন্ধ করে
অনেক গেকোর চোখে স্বচ্ছ স্থির পর্দা থাকলেও লেপার্ড গেকোর রয়েছে চলমান চোখের পাতা। তারা চোখ বন্ধ করতে পারে এবং ঘুমায়ও চোখ বুজে। নিশাচর প্রাণী হওয়ায় সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত এরা বেশি সক্রিয় থাকে। দিনের বেলায় পাথরের ফাঁক বা গর্তে লুকিয়ে থাকে।
খাদ্য ও স্বভাব
এদের খাদ্যতালিকায় থাকে ঝিঁঝিঁ পোকা, মিলওয়ার্ম, তেলাপোকাসহ বিভিন্ন কীটপতঙ্গ। পানির প্রয়োজন কম হলেও আর্দ্র পরিবেশ তাদের সুস্থতার জন্য জরুরি। প্রকৃতিতে তারা সাধারণত একাকী থাকে এবং নিজের এলাকা রক্ষা করে চলে।
ডিম থেকে শুরু জীবন
লেপার্ড গেকোর জীবন শুরু হয় ডিম থেকে। স্ত্রী গেকো বছরে একাধিকবার ডিম পাড়ে, প্রতিবারে সাধারণত এক বা দুইটি। তাপমাত্রার ওপর নির্ভর করে প্রায় ৩৫ থেকে ৯০ দিনের মধ্যে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়।
আকর্ষণীয় বিষয় হলো, ডিমের ইনকিউবেশনের তাপমাত্রা অনেক ক্ষেত্রে বাচ্চার লিঙ্গ নির্ধারণে ভূমিকা রাখে। তুলনামূলক বেশি তাপমাত্রায় পুরুষ এবং কম তাপমাত্রায় স্ত্রী বাচ্চা জন্মানোর প্রবণতা দেখা যায়।
খোলস বদলানো: বেড়ে ওঠার নিয়মিত অংশ
খোলস বদলানো বা মোল্টিং লেপার্ড গেকোর জীবনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। বেড়ে ওঠার সময় এটি ঘন ঘন ঘটে, প্রাপ্তবয়স্ক হলে ব্যবধান বাড়ে। খোলস ছাড়ার পর অনেক সময় তারা পুরোনো খোলস খেয়ে ফেলে—এতে পুষ্টি পুনরুদ্ধার হয় এবং শত্রুর চোখে উপস্থিতির চিহ্নও কমে যায়।
তবে আর্দ্রতার অভাবে কখনও আঙুল বা লেজে খোলস আটকে থাকতে পারে, যা পরিচর্যার ঘাটতির ইঙ্গিত।
আয়ু ও পরিচর্যা
প্রকৃতিতে আয়ু তুলনামূলক কম হলেও সঠিক যত্নে বন্দিদশায় লেপার্ড গেকো ১৫ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। কম জায়গায় থাকার সক্ষমতা, শান্ত স্বভাব এবং সহজ খাদ্যাভ্যাসের কারণে এটি নতুন পোষ্যপ্রেমীদের কাছেও জনপ্রিয়।
তবে উপযুক্ত তাপমাত্রা, আলো-আঁধারি চক্র, পুষ্টিকর খাদ্য ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রকৃতির অভিযোজনের গল্প
মরুর কঠিন পরিবেশে টিকে থাকা এই ছোট্ট সরীসৃপ আমাদের শেখায় অভিযোজনের গল্প। পাথুরে মরুভূমি থেকে ঘরের টেরারিয়াম—দুই জগতেই সে টিকে থাকে নিজের স্বভাব ও বৈশিষ্ট্য নিয়ে। ক্ষুদ্র দেহের ভেতর লুকিয়ে আছে এক দীর্ঘ জীবনচক্রের বিস্ময়কর অধ্যায়।
ইখা