এক সময় উত্তরবঙ্গগামী যানবাহনের প্রধান প্রবেশদ্বার ছিল টাঙ্গাইলের ভূঞাপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী গোবিন্দাসি ফেরিঘাট। যমুনা সেতু নির্মাণের আগে উত্তরবঙ্গের ট্রাক, বাস ও পণ্যবাহী যানবাহন এই ঘাট দিয়েই পারাপার হতো। প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ঘাট এলাকা ছিল সরগরম। মানুষ ও যানবাহনের চাপ সামলাতে হিমশিম খেত স্থানীয় প্রশাসন।
কিন্তু যমুনা সেতু চালু হওয়ার পর বদলে গেছে সেই চিত্র। এখন গোবিন্দাসি ঘাটে কেবল নদীর হাওয়া আর নীরবতা।
প্রযুক্তির উন্নয়নে সারা দেশ এগিয়ে গেলেও গোবিন্দাসি ফেরিঘাট আজও রয়ে গেছে অবহেলার আঁধারে। নদীর নাব্যতা কমে যাওয়া, যমুনা সেতুর বিকল্প রুট তৈরি হওয়া এবং চর জেগে ওঠার কারণে ঘাটের গুরুত্ব অনেকটাই হারিয়েছে। এখন সেখানে নেই ফেরি, নেই বড় নৌযান। ঘাট দখল করে নিয়েছে ছোট নৌকা ও ইঞ্জিনচালিত ট্রলার।
ভূঞাপুরের চরাঞ্চলের হাজারো মানুষ এখনো নৌকা পারাপারের ওপর নির্ভরশীল। তাদের জন্য এই ঘাটই এখন একমাত্র যাতায়াতের পথ। কিন্তু ঘাটে নেই কোনো পাকা জেটি, নেই বসার জায়গা, নেই আলো বা নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
শুকনো মৌসুমে ঘাট চলে যায় অনেকটা ভেতরে, আর বর্ষাকালে পাহাড়ি ঢল ও ভারত থেকে আসা পানির তোড়ে ডুবে যায় পারাপারের স্থান। তখন চরাঞ্চলের শত শত মানুষকে শহরে আসতে ঝুঁকি নিতে হয়। বয়স্ক ও শিশুদের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের ভোগান্তিও চরমে পৌঁছে যায়।
দেশখ্যাত গোবিন্দাসি গরুর হাট থেকে সরকার প্রতিবছর ৪ থেকে ৫ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করত। কিন্তু ঘাট না থাকায় গরু নামানোর সুষ্ঠু ব্যবস্থা না থাকায় বর্তমানে আদায় হয় মাত্র ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা। এক সময় উত্তরবঙ্গ থেকে হাজার হাজার গরু এই ঘাট দিয়েই আসত। তাই এলাকাবাসী দ্রুত ফেরিঘাট সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় প্রবীণ আবদুল হালিম (৭০) বলেন, “যমুনা সেতু হওয়ার আগে এখানে কী যে কোলাহল ছিল! সারারাত লঞ্চ-ফেরি চলত। মানুষ, গাড়ি, পণ্য—সব একসঙ্গে গিজগিজ করত। এখন শুধু চর আর নীরবতা।”
দুর্গম চরাঞ্চলের যুবক নাসির উদ্দিন বলেন, গোবিন্দাসি ফেরিঘাট না থাকায় পানিতে নেমে ঘাটে উঠতে হয়, আবার নৌকায় উঠতেও পানিতে নামতে হয়। এতে নারী ও ছাত্রীদের বেশি ভোগান্তি হয়। অনেক সময় কাপড় ভিজে যায়। এখানে একটি পাকা জেটি অত্যন্ত জরুরি।
স্থানীয়দের দাবি, গোবিন্দাসি ফেরিঘাট শুধু একটি ঘাট নয়, এটি ভূঞাপুরের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অংশ। এখানে পর্যটন সুবিধা বা আধুনিক অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে একদিকে চরাঞ্চলের মানুষ উপকৃত হতো, অন্যদিকে সংরক্ষিত থাকত এক টুকরো ইতিহাস।
সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে উত্তরবঙ্গের সেই পুরোনো প্রবেশদ্বার—গোবিন্দাসি ফেরিঘাট।
ইখা