প্রথমে আমারা দেখবো এই ব্যপারে কোরআন সুন্নাহর নির্দেশনা অতঃপর সাহাবায়ে কেরামের কর্মপন্থা। তাহলে আমল করতে সহজ হবে, অন্যথায় আমরা বিভ্রান্তির শিকার হতে পারি।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, فَمَنۡ شَہِدَ مِنۡکُمُ الشَّہۡرَ فَلۡیَصُمۡہُ অর্থ: অতএব তোমাদের মধ্যে যে কেউ এ মাস পাবে সে যেন তাতে রোজা পালন করে। (সুরা বাকারা,আয়াত ১৮৫)
বর্ণিত আয়াতে শাহিদা অর্থ সাক্ষ্য দেওয়ার নয়, বরং মাস পাওয়া বা মাসে উপনীত হওয়া। সুতরাং যে ব্যক্তি রমজান মাস পাবে কিংবা রমজান মাসে উপনীত হবে তার উপর রোজা ফরজ হয়ে যাবে। এখন মাসে উপনীত হওয়াটা কিভাবে হবে? হাদিস শরিফে নবীজি সা. এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। সেটাই নির্ভূল এবং স্বতঃসিদ্ধ।
হাদিস শরিফে এসেছে, عَنْ نَافِعٍ عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَأَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم ذَكَرَ رَمَضَانَ فَقَالَ لاَ تَصُومُوا حَتَّى تَرَوْا الْهِلاَلَ وَلاَ تُفْطِرُوا حَتَّى تَرَوْهُ فَإِنْ غُمَّ عَلَيْكُمْ فَاقْدُرُوا لَهُ অর্থ: হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমার রা. হতে বর্ণিত, নবীজি সা. রমজানের কথা আলোচনা করে বললেন, চাঁদ না দেখে তোমরা রোজা পালন করবে না এবং চাঁদ না দেখে ইফতার বন্ধ করবে না। যদি আকাশ মেঘাচ্ছন্ন থাকে তাহলে তার সময় (ত্রিশ দিন) পরিমাণ পূর্ণ করবে। (সহিহ বুখারি, হাদিস নং১৯০৬)
সাহাবা যুগের আমল
সাহাবাগণ হলেন ইসলামের শুরু যামানার মানুষ। তাদেরকে নবীজি সবকিছু হাতে কলমে শিক্ষা দিয়েছেন। তারা শরিয়তকে যেভাবে অনুধাবন করেছেন সেটাই শরিয়তের মূল প্রতিপাদ্য। তাদের প্রশংসা করে আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে বলেছেন লোকেরা যেভাবে ঈমান আনে সেভাবে ঈমান আনো। (সুরা বাকারা, আয়াত ১৩)
আসুন জেনে নেই সাহাবারা কিভাবে রোজার মাস শুরু করতেন?
আবুল আব্বাস শামসুদ্দিন সারুজি বলেন,
لم ينقل عن عمر ولا عن غيره من الخلفاء انهم كانوا يبعثون البرد ويكتبون الى الاقطار بان قد رايناه فصوموا بل كانوا يتركون الناس مع مرائيهم فيصير هذا كالمجمع عليه
অর্থ: আমিরুল মোমেনিন হজরত ওমর রা. সহ খোলাফায়ে রাশেদিন ও পরবর্তী খলিফাগন, কারো থেকেই এ কথা বর্ণিত নেই যে, তাদের কেউ দারুল খিলাফা থেকে আশেপাশের অঞ্চলগুলোতে চাঁদ দেখার বার্তা পাঠাতেন; বরং তারা সকলে লোকদেরকে নিজেদের স্থানীয় চাঁদ দেখা অনুযায়ী আমল করতে দিতেন। এটি স্থানীয় চাঁদ দেখা ধর্তব্য হওয়ার উপর এক ধরনের ইজমা। (আল-গায়াহ শরহুল হেদায়া, ৭/ ৩১৩ ; আয-যাখীরাহ ক্বারাফি ২/৪৯১)
ইমাম আবদুল ওয়াহহাব শারানি রহ. বলেন,
وكانت الصحابه رضي الله عنهم لا يامرون اهل بلد بعيد بالصوم لرؤيه اهل بلد اخر ، كالمدينه ومصر والمغرب ونحو ذلك وكانوا لا يرون باسا بتقديم اهل بلد بيوم على اهل بلد اخر،
অর্থ: সাহাবায়ে কেরাম কোন অঞ্চলে চাঁদ দেখা গেলে এ কারণে অন্য দূরবর্তী অঞ্চলের লোকদেরকে রোজা রাখার আদেশ দিতেন না। যেমন মদিনা, মিশর ও মরক্কো (পশ্চিমের দেশসমূহ) ইত্যাদি। (অর্থাৎ এসব অঞ্চল যেহেতু একটি আরেকটি থেকে খুব দূরে, তাই এগুলোর কোন এক অঞ্চলে চাঁদ দেখা গেলে অন্য অঞ্চলে তা ধর্তব্য হতো না।)
আর সাহাবায়ে কেরাম একেও দোষনীয় মনে করতেন না যে, কোন অঞ্চলের অধিবাসীগণ (চাঁদ দেখার কারণে) আগে রোজা শুরু করবে আবার অন্য অঞ্চলের অধিবাসীগণ (পরে চাঁদ দেখার কারণে) পরে রোজা শুরু করবে। (মিনাহুল মিন্নাহ ফিত্তালাব্বুসি বিস সুন্নাহ, পৃ. ২২৬)
ইমাম আবু সুলাইমান খাত্তাবি রহ. বলেন,
في حديث عمر ان اناسا كانوا بين الجبال، فاتوه، فقالوا: يا امير المؤمنين ان ناس بين الجبال، لا نهل الهلال اذا اهله الناس، فبما تامرنا؟ قال الوضح الى الوضح ،فان خفي عليكم فاتموا العده ثلاثين يوما ثم انسكوا
অর্থ: কিছু লোক পাহাড়ের মাঝে বসবাস করত। তারা হজরত ওমর এর নিকট এসে বলল, হে আমিরুল মোমেনিন আমরা পাহাড়ে বসবাস করি। অন্য লোকেরা (সমতলে অবস্থানকারীরা) যখন (যে রাতে) নতুন চাঁদ দেখে তখন (সে রাতে) আমরা নতুন চাঁদ দেখতে পাই না। (বরং পরবর্তী রাতে নতুন চাঁদ আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়) আপনি আমাদেরকে কি হুকুম করেন?
হজরত ওমর বললেন, নতুন চাঁদ থেকে নতুন চাঁদ। (অর্থাৎ তোমরা নতুন চাঁদ দেখে মাস শুরু করো এবং নতুন চাঁদ দেখেই (পূর্ববর্তী) মাস শেষ কর) আর যদি (২৯ তারিখের রাতে) চাঁদ না দেখা যায়, তাহলে (চলতি মাসের) ৩০ দিন গণনা করো। এরপর এবাদত (রোজা-ঈদ ইত্যাদি) পালন করো। (গরিবুল হাদিস, খাত্তাবি,২/১০২)
রমজান মাসের রোজা নামাজের মতোই। নামাজ যেমন সময়মতো আদায় করতে হয়, তেমনি রোজাও সময় অনুযায়ী রাখতে হয়। আর অন্যান্য ফরজ ইবাদতের ন্যায় রোজার জন্যও শরিয়ত কতৃক পরিষ্কারভাবে সময় সুনির্ধারিত। পৃথিবীর সকল মুসলিম যেন স্বস্থানে সহজেই সময় বুঝে রোজা রাখতে পারে, সেজন্য সময় চেনার এক কুদরতি ব্যবস্থা স্বয়ং আল্লাহ তাআলাই করে দিয়েছেন তা হলো চাঁদ। চাঁদ রমজান সহ সকল মাসের ঘড়িস্বরূপ।
পৃথিবীর সকল অঞ্চলের মানুষ যেন নিজ নিজ দেশে সন্ধ্যা বেলায় চাঁদ দেখেই বারোটি মাস গণনা করতে পারে সেজন্য তিনি চাঁদের জন্য বানিয়েছেন নির্ধারিত কক্ষপথ। এতে ছোট বড়, ধনী গরীব, শিক্ষিত শিক্ষাহীন, শহর, গ্রাম, মরু বা পাহাড়ে অবস্থানকারী সবাই অতি সহজে চাঁদ দেখে রোজার মাস শুরু করতে পারে। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিক বিষয় বুঝে আমল করার তৌফিক দান করুন,আমিন।
লেখক: শিক্ষক, জামিয়া কোরবানি আরাবিয়া লালবাগ ঢাকা, খতিব, আজিমপুর ছাপড়া মসজিদ, পরিচালক, দাওয়াতুস সুন্নাহ বাংলাদেশ।
এইচএ