স্বাধীনতার পর থেকে উত্তরবঙ্গকে সৎ ভাই করে রাখা হয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, উত্তরবঙ্গ কোনোভাবেই গরীব নয়, বরং ইচ্ছাকৃতভাবে এই অঞ্চলকে গরীব করে রাখা হয়েছে। সেই বঞ্চনারই স্বাক্ষী হতে তিনি উত্তরবঙ্গে এসেছেন।
শুক্রবার (২৩ জানুয়ারি) সকালে পঞ্চগড় চিনিকল মাঠে অনুষ্ঠিত ১০ দলীয় নির্বাচনী ঐক্য সমর্থিত জনসভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, উত্তরবঙ্গ দেশের খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তার অন্যতম প্রধান যোগানদাতা। অথচ এই অঞ্চলকে সৎ মায়ের সন্তানের মতো আচরণ করা হয়েছে। আমাদের কলিজার অংশ এই উত্তরবঙ্গ। এখানকার মানুষ সারা দেশের মানুষের জন্য খাদ্য উৎপাদন করে, কিন্তু বিনিময়ে পেয়েছে অবহেলা ও বঞ্চনা।’
তিনি জানান, আগামী দিনে উত্তরবঙ্গ থেকে আর কোনো বেকারের মুখ দেখতে চান না। যুবক-যুবতীদের হাতে মর্যাদার কাজ তুলে দিয়ে প্রত্যেক নাগরিককে দেশ গড়ার কারিগর হিসেবে তৈরি করার অঙ্গীকার করেন তিনি। গোটা উত্তরবঙ্গকে কৃষিভিত্তিক শিল্পের রাজধানী বানানোর পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে বলেন, বন্ধ চিনিকলগুলো পুনরায় চালু করে শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে ফিরিয়ে আনা হবে।
রাজনীতির নামে দয়ার সংস্কৃতির সমালোচনা করে তিনি বলেন, জনগণের ট্যাক্সের টাকায় ‘পরের ধনে পোদ্দারি’ করা হবে না। আমাদের কাছে কোনো কার্ড নেই, আপনারাই আমাদের কার্ড। আপনাদের ভালোবাসা ও সমর্থনই আমাদের শক্তি।
নারী ও পুরুষের সমন্বয়েই পরিবার ও সমাজ গড়ে উঠে উল্লেখ করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, নারী-পুরুষ মিলেই বাংলাদেশকে এগিয়ে নিতে হবে। যুবক যেমন দেশের শক্তি, তেমনি যুবতীর হাতও সমানভাবে শক্তিশালী করা হবে।
টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত উন্নয়নের সমতা নিশ্চিত করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, এতদিন টেকনাফের উন্নয়নের জোয়ার তেঁতুলিয়ায় পৌঁছায়নি। এই ধারাকে উল্টে দিয়ে তেঁতুলিয়া থেকে টেকনাফ পর্যন্ত উন্নয়ন পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে।
উত্তরবঙ্গের নদীগুলোর বর্তমান চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, তিস্তা, ধরলা ও করতোয়ার মতো নদীগুলো আজ নদী নয়, মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। নদীকে মানুষের শরীরের রক্তনালীর সঙ্গে তুলনা করে তিনি বলেন, রক্তনালী বন্ধ হয়ে গেলে মানুষ যেমন মারা যায়, তেমনি নদী শুকিয়ে গেলে মানুষের জীবনও অচল হয়ে পড়ে। নদীগুলোর এই অবস্থার জন্য দায়িত্বশীলদের কঠোর সমালোচনা করেন তিনি।
স্বাস্থ্যসেবা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, চিকিৎসার জন্য উত্তরবঙ্গের মানুষকে রাজধানীর দিকে ছুটতে হয়। সেই সামর্থ্য সবার নেই। অনেক সময় যাওয়ার পথেই মানুষের মৃত্যু হয়। এই অবস্থা আর দেখতে চান না জানিয়ে তিনি প্রতিশ্রুতি দেন, ক্ষমতায় গেলে দেশের ৬৪ জেলায় মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠা করা হবে। পঞ্চগড়েও একটি মেডিকেল কলেজ স্থাপন করা হবে বলে ঘোষণা দেন তিনি।
অর্থনৈতিক বিষয়ে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের বাইরে পাচার হওয়া বিপুল পরিমাণ অর্থ ফেরত এনে জনগণের কল্যাণে ব্যবহার করা হবে। ভবিষ্যতে কাউকে আর লুটপাটের সুযোগ দেওয়া হবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, দীর্ঘদিন মানুষ ভোট দিতে পারেনি। মানুষের মন আজ পিপাসার্ত হয়ে আছে। ভোট যদি আবার ডাকাতি করতে আসে, তা রুখে দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। যুবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কাজ শেষ হয়নি, কেবল শুরু হয়েছে।
ডা. শফিকুর রহমান আরও বলেন, বৈষম্য, অবিচার, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি, দখলদারি ও স্বৈরতন্ত্রমুক্ত ন্যায়ভিত্তিক মানবিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত তাদের আন্দোলন চলবে। তারা দেশের মালিক হতে নয়, সেবক হতে চান বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
শহীদ পরিবার, জুলাই যোদ্ধা ও মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার গঠনের সুযোগ পেলে সর্বশক্তি দিয়ে তাদের ঋণ পরিশোধের চেষ্টা করা হবে।
বক্তব্য শেষে জামায়াত আমীর পঞ্চগড়-১ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী সারজিস আলমের হাতে শাপলা কলি এবং পঞ্চগড়-২ আসনের সংসদ সদস্য প্রার্থী সফিউল আলমের হাতে দাঁড়িপাল্লা প্রতীক তুলে দেন।
উল্লেখ্য, সকাল ৯টায় জনসভা শুরু হয়। জেলা জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মো. ইকবাল হোসাইনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন জামায়াতে ইসলামী সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা আব্দুল হালিম, জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম এবং জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী সফিউল আলম, জাগপা মুখপাত্র রাশেদ প্রধান প্রমুখ। সকাল থেকে পঞ্চগড় চিনিকল মাঠে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের ব্যাপক উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।