শ্বাসনালি বন্ধ হয়ে একই পরিবারের তিনজনসহ ছয়জন মারা গেছে। গতকাল শুক্রবার সকাল সাড়ে ৭টায় উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ১৮ নম্বর রোডের ৩৪ নম্বর বাসায় ওই অগ্নিকান্ড ঘটে।
ফায়ার সার্ভিসের মিডিয়া কর্মকর্তা তালহা বিন জসিম জানান, শুক্রবার সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরে একটি ছয়তলা ভবনের দ্বিতীয়তলায় আগুন লাগার খবর পায় ফায়ার সার্ভিস। খবর পেয়ে উত্তরা ফায়ার স্টেশনের দুটি ইউনিট সেখানে গিয়ে ৮টা ২৫ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে নেয়। সকাল ১০টার দিকে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুনের সূত্রপাত কীভাবে হয়েছে তদন্ত সাপেক্ষে তা জানাবে ফায়ার সার্ভিস। ঘটনাস্থল থেকে ১৬ জনকে উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠিয়েছে ফায়ার সার্ভিস।
উদ্ধারকৃতদের মধ্যে ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে জানিয়ে উত্তরা পশ্চিম থানার ওসি রফিক আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, নিহতরা দুই পরিবারের সদস্য। তারা পঞ্চম ও ষষ্ঠতলার দুটি ফ্ল্যাটে থাকতেন। আগুনের সূত্রপাত দুই ও তিনতলা থেকে। দুই ও তিনতলা নিয়ে ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট ছিল। ভবনের মালিক সেখানে বাস করতেন। তবে অগ্নিকান্ডের সময় তারা বাসায় ছিলেন না।
জানা গেছে, পঞ্চমতলার ফ্ল্যাটের নিহতরা হলেন কাজী ফজলে রাব্বি রিজভী (৩৮), তার স্ত্রী আফরোজা আক্তার সুবর্ণা (৩৭) এবং তাদের ছেলে কাজী ফাইয়াজ রিশান (২)। মৃত রাব্বির বাড়ি কুমিল্লা সদর উপজেলার নানুয়ার দীঘিরপাড়ে। তিনি এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসে চাকরি করতেন। তার স্ত্রী সুবর্ণা চাকরি করতেন স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসে। তাদের আরেক ছেলে কাজী রাফসান উত্তরায় নানির বাসায় থাকায় বেঁচে গেছে বলে পরিবারের সদস্যরা জানান।
সুবর্ণাকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। রাব্বির মরদেহ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং রিশানের মরদেহ ঢাকা স্পেশালাইজড হাসপাতালে রয়েছে। চিকিৎসকের বরাতে পরিবারের সদস্যরা বলেছেন, ওই তিনজনের কেউ দগ্ধ হননি। ধোঁয়ার কারণে অক্সিজেনের অভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্য পরিবারের নিহতরা হলেন মো. হারিছ উদ্দিন (৫২), তার ছেলে মো. রাহাব (১৭) এবং হারিছের ভাতিজি রোদেলা আক্তার (১৪)। তাদের গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে। হারিছ ও রাহাবের মরদেহ মনসুর আলী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং রোদেলার মরদেহ লুবনা জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড কার্ডিয়াক সেন্টারে রয়েছে। প্রতিবেশীরা জানিয়েছেন, ফল ব্যবসায়ী হারিছ দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন। তাকে নিয়মিত ডায়ালাইসিস করাতে হতো।
মৃত সুবর্ণার মামাতো ভাই আবু সাইদ জানান, রাব্বি ও সুবর্ণার দুই ছেলে ফাইয়াজ ও রাফসান। স্বামী-স্ত্রী দুজনই কর্মজীবী হওয়ায় তাদের দুই ছেলে উত্তরার ১১ নম্বর সেক্টরের ২০ নম্বর রোডের ১৮ নম্বর বাসায় থাকত। শুক্রবার অফিস বন্ধের দিন হওয়ায় বৃহস্পতিবার রাতে ছোট ছেলেকে নানির বাসা থেকে মায়ের বাসায় নিয়ে আসা হয়। শুক্রবার সকালে ওই বাসায় আগুনের সংবাদ পান স্বজনরা।
সুবর্ণার বোন আফরিন জাহান জানান, সুবর্ণাকে জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের জরুরি বিভাগে নিয়ে যাওয়ার পর চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরিবারের বাকি দুজনের মরদেহ কুয়েত মৈত্রী হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। সবাই ধোঁয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। দগ্ধ হয়নি কেউ।
জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন ডা. শাওন বিন রহমান জানান, সুবর্ণাকে মৃত অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। তার শরীরে পোড়া ক্ষত ছিল না। ধোঁয়ার কারণে তিনি মারা গেছেন বলে ধারণা। তবে মৃত্যুর সংবাদ জানার তার মরদেহ আবার উত্তরা নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
গতকাল দুপুর ১২টায় সরেজমিনে দেখা গেছে, ভবনটির দ্বিতীয় ও তৃতীয়তলা ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন। জানালা ও বারান্দার কাচের দরজাগুলো ভেঙে গেছে। ভবনটির সামনের সড়কে উৎসুক জনতার ভিড়। ভবনের ভেতরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অবস্থান করছেন। উৎসুক জনতার প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে সিআইডির ক্রাইম সিন টেপ দিয়ে ভবনটির প্রধান ফটক ঘিরে রাখা হয়েছে।
দুপুরের পরও পোড়া ভবনের সামনে উৎসুক জনতার ভিড়। এ কারণে ভবনে প্রবেশের প্রধান দরজায় ক্রাইম সিন হিসেবে ঘিরে রেখেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। ভবনের ভেতরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য ও সিআইডির সদস্যরা অবস্থান করছেন। স্থানীয়রা বলেন, রাতে সবাই একইসঙ্গে ঘুমিয়েছে। আর সকালে সূর্য ওঠার আগেই লাশ। ভবনে আটকেপড়া মানুষের আর্তচিৎকার এখনো কানে বাজছে। চোখের সামনে এখনো সেই ভয়াবহতা ভাসছে। রাতে এই স্মৃতি নিয়ে কীভাবে ঘুমাতে যাব।
পাশের ভবনের নিরাপত্তাকর্মী জসিম ও আব্দুর রহমান জানান, ফায়ার সার্ভিস আগুন লাগার অনেক পর ঘটনাস্থলে আসে। তারা আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগে আসলে প্রাণহানির মতো ঘটনা ঘটত না। তাদের গ্রিল কাটার কোনো যন্ত্র নিয়ে আসতে দেখা যায়নি। ভেতরে মানুষজন বাঁচার জন্য চিৎকার করছে। আর তারা হাতুড়ি দিয়ে গ্রিল ভাঙার চেষ্টা করছেন। এ ছাড়া জনবলও কম আসছেন বলে অভিযোগ করেন স্থানীয়রা। আবাসিক ভবনের আগুনের ভয়াবহতা জেনেও ফায়ার সার্ভিসের প্রস্তুতিতে ছিল কমতি।
তারা বলেন, ফায়ার সার্ভিস যেই মই নিয়ে আসে সেটা দিয়ে চার তলার বেশি রেসকিউ করতে পারেনি। পরে ফায়ার সার্ভিসকর্মীরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ভবনের ভেতরে প্রবেশ করে আটকেপড়া মানুষজনকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন।
উত্তরা ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের সিনিয়র স্টাফ অফিসার আলম হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভবন মালিকের ২-৩ তলা জুড়ে হাই-ডেকোরেশন ডুপলেক্স ফ্ল্যাটে বৈদ্যুতিক গোলাযোগ থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ওই ফ্ল্যাটে আগুন লাগার দীর্ঘক্ষণ পর ফায়ার সার্ভিসকে খবর দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ঘটনাস্থলের পাশের বাসার এক প্রতিবেশী ৭টা ৫৪ মিনিটে ফোন করে অগ্নিকা-ের বিষয়টি জানান। খবর পাওয়ার চার মিনিট পর ৭টা ৫৮ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ শুরু করি। ঘটনাস্থলে পৌঁছে দেখা যায়, ভবনের ২-৩ তলায় আগুন ছড়িয়ে পড়েছে। আর পুরো ভবনে ধোঁয়া। এদিকে ছাদে ওাার চেষ্টা করে অনেকে ব্যর্থ হয়েছেন। ওই সময় ছাদের দরজা বন্ধ ছিল। ভবনের ছাদের দরজা খোলা থাকলে এত প্রাণহানির ঘটনা ঘটত না।
এসআর