কুমিল্লা নগরসহ আশপাশের উপজেলাগুলোতে এলপি গ্যাসের অঘোষিত সংকটে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। প্রয়োজনের সময় টাকা থাকলেও গ্যাসের সিলিন্ডার না পেয়ে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন অনেকেই। বাসাবাড়ি থেকে শুরু করে হোটেল–রেস্তোরাঁ পর্যন্ত রান্নার কাজ ব্যাহত হচ্ছে। এক দোকান থেকে আরেক দোকানে ঘুরেও অনেককে খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে।
সরকার ১২ কেজি ওজনের এলপি গ্যাস সিলিন্ডারের দাম এক হাজার ৩০৬ টাকা নির্ধারণ করলেও কুমিল্লার বাজারে সেই দামে গ্যাস মিলছে না। ক্রেতাদের অভিযোগ, খুচরা পর্যায়ে সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার টাকায়। তাদের দাবি, অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অতিরিক্ত দাম আদায় করছেন। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো।
নগরের টমছমব্রিজ এলাকার গৃহিণী রোকেয়া বেগম বলেন, ‘তিন দিন ধরে গ্যাস খুঁজছি। কোনো দোকানেই সিলিন্ডার নেই। এক দোকানে পেলেও ১ হাজার ৯০০ টাকা দাম চেয়েছে। এত টাকা দিয়ে কীভাবে কিনব? বাধ্য হয়ে কাঠের চুলায় রান্না করছি।’
ঝাউতলা এলাকার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সোহেল মিয়া জানান, তার ছোট খাবারের দোকানটি গ্যাস না পাওয়ায় দুই দিন বন্ধ রাখতে হয়েছে। তিনি বলেন, ‘বেশি দামে কিনলে লাভ থাকে না, আবার না কিনলে দোকান বন্ধ রাখতে হয়। দুই দিক থেকেই আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।’
তবে এলপি গ্যাসের খুচরা বিক্রেতারা বলছেন ভিন্ন কথা। তাদের দাবি, কোম্পানি ও ডিলার পর্যায় থেকেই নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস কিনতে হচ্ছে। সরবরাহ কম থাকায় চাহিদা অনুযায়ী সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না। চকবাজার এলাকার এক বিক্রেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘আমরা বেশি দামে কিনলে কম দামে কীভাবে বিক্রি করব? ডিলাররা দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে, অথচ দায় পড়ছে আমাদের ওপর।’
ডিলারদের দাবি, কোম্পানিগুলো থেকে তাদের চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে না। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক ডিলার বলেন, ৫০০ সিলিন্ডারের চাহিদা থাকলেও তারা পাচ্ছেন ২০০টির মতো। এতে সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হচ্ছে না। পাশাপাশি গ্যাস আনার গাড়ি দেরিতে ছাড়ার কারণে পরিবহন খরচও বেড়ে যাচ্ছে। ফলে বাধ্য হয়ে দাম বাড়াতে হচ্ছে বলে তাদের দাবি।
এদিকে নগরের কান্দিরপাড় এলাকার বাসিন্দা কলেজছাত্র রায়হান বলেন, ‘বাসায় গ্যাস না থাকায় প্রতিদিন হোটেলে খেতে হচ্ছে। এতে দৈনন্দিন খরচ দ্বিগুণ হয়ে গেছে।’ তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষের কষ্ট দেখার যেন কেউ নেই।’
স্থানীয় প্রশাসন জানিয়েছে, অতিরিক্ত মূল্য আদায় ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টির অভিযোগ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বাজার মনিটরিং জোরদার করার পাশাপাশি দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার প্রস্তুতি চলছে।
কুমিল্লা জেলা ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. কাউসার মিয়া বলেন, ‘ডিলারদের সঙ্গে এ বিষয়ে ইতিমধ্যে কথা বলা হয়েছে। তাদের দাবি, কোম্পানিগুলো চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করছে না।’ তিনি বলেন, ‘জেলা প্রশাসকসহ ডিলার, খুচরা বিক্রেতা ও কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। পাশাপাশি নিয়মিত অভিযানও চলছে।’
দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে কুমিল্লাবাসীর দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা। সচেতন মহলের মতে, কঠোর নজরদারি ও সরকারি সিদ্ধান্তের কার্যকর বাস্তবায়নই এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ।
ইখা