রাতের আঁধারেও যেন দিনের আলো। সন্ধ্যা নামলেই যশোরের শার্শা উপজেলার এক মাঠজুড়ে জ্বলে ওঠে শত শত এলইডি বাতি। কৃত্রিম আলোর এই ব্যতিক্রমী ব্যবস্থায় অমৌসুমে ড্রাগন চাষে তিন গুণ ফলন নিশ্চিত করে নজর কেড়েছেন তরুণ উদ্যোক্তা মনিরুজ্জামান মনির। আধুনিক ‘লাইট ইনডোর্স’ প্রযুক্তির প্রয়োগে তাঁর এই উদ্যোগ শার্শার কৃষি খাতে সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে।
শার্শা উপজেলার বাগআঁচড়া ইউনিয়নের বসতপুর গ্রামের কৃষক মনিরুজ্জামান মনির এই প্রযুক্তির সফল প্রয়োগকারী হিসেবে ইতিমধ্যে আলোচনায় এসেছেন। শুরুতে পরীক্ষামূলকভাবে সাত বিঘা জমিতে ড্রাগন চাষ শুরু করলেও বর্তমানে তাঁর খামারের পরিধি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৪ বিঘায়। এর মধ্যে শীতকালীন অমৌসুমে ফলন ধরে রাখতে ২০ বিঘা জমিতে স্থাপন করা হয়েছে কৃত্রিম আলোর ব্যবস্থা।
মনিরুজ্জামান জানান, সাধারণত শীতকালে দিন ছোট হয়ে যাওয়ায় সূর্যালোকের অভাবে ড্রাগন গাছে ফুল ও ফল কম আসে। এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে তিনি বিদ্যুৎ সাশ্রয়ী শত শত এলইডি বাল্ব বসিয়েছেন ড্রাগন বাগানে। প্রতিদিন সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গে বাগানজুড়ে আলো জ্বলে ওঠে, যা গাছের সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়া সচল রাখে এবং ফুল ও ফল ধরতে সহায়তা করে।
তিনি বলেন, ‘প্রতিদিন সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা এবং ভোর ৩টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত দুই দফায় এই আলো জ্বালানো হয়। এতে শীতের প্রতিকূল পরিবেশেও গাছে ফুল আসছে এবং অমৌসুমে ফলন মিলছে। তাঁর ভাষায়, ‘ভরা মৌসুমের তুলনায় অমৌসুমে ড্রাগনের বাজারদর কয়েক গুণ বেশি। তাই উৎপাদন খরচ বেশি হলেও লাভের সম্ভাবনাও বেশি।’
আলোকসজ্জায় মোড়া এই ড্রাগন বাগান এখন শুধু উৎপাদনের ক্ষেত্রই নয়, দর্শনার্থীদের জন্যও আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। সারিবদ্ধ ড্রাগন গাছ আর মাথার ওপর ঝুলে থাকা এলইডি বাতির আলো মাঠজুড়ে তৈরি করেছে এক নান্দনিক দৃশ্য। অনেক দর্শনার্থীর কাছে এটি ইউরোপের উন্নত দেশগুলোর কৃষি খামারের কথা মনে করিয়ে দেয়। প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে শতাধিক মানুষ এই দৃশ্য দেখতে ভিড় করছেন।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দীপক কুমার সাহা বলেন, বর্তমানে শার্শা উপজেলায় প্রায় ৮৫ হেক্টর জমিতে ড্রাগনের আবাদ হচ্ছে। অমৌসুমে উৎপাদিত ড্রাগনের বাজারমূল্য বেশি হওয়ায় কৃষকরা আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন। আধুনিক প্রযুক্তির এই ব্যবহার কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে।
তবে এই পদ্ধতির বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে ব্যয়। মনিরুজ্জামান জানান, ২০ বিঘা জমিতে লাইটিং সিস্টেম চালাতে প্রতি মাসে প্রায় আড়াই লাখ টাকা খরচ হচ্ছে, যার বেশির ভাগই বিদ্যুৎ বিল।
তিনি বলেন, ‘বিদ্যুৎ খরচ যদি কৃষি খাতের আওতায় বিশেষ সুবিধা হিসেবে বিবেচনা করা হতো, তাহলে আরও অনেক কৃষক এই প্রযুক্তিতে আগ্রহী হতেন।’ কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, পরিকল্পিত সহায়তা ও নীতিগত সুবিধা দেওয়া গেলে ‘লাইট ইনডোর্স’ পদ্ধতিতে ড্রাগন চাষ শুধু শার্শা নয়, দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও অমৌসুমে ফল উৎপাদনের নতুন দিগন্ত খুলে দিতে পারে।
ইখা