“বল বীর, বল উন্নত মম শির!
শির নেহারি’ আমারি, নত-শির ওই শিখর হিমাদ্রির!”
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের বিদ্রোহী কবিতার এই পঙ্ক্তিগুলো যেন শহীদ শরীফ ওসমান হাদীর জীবন ও চেতনার সঙ্গেই মিলে যায়। আপসহীন রাজনৈতিক অবস্থান, ভারতীয় আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে স্পষ্ট উচ্চারণ এবং প্রথাগত রাজনীতির ভণ্ডামির বিরুদ্ধে দৃপ্ত প্রতিবাদ—সব মিলিয়ে হাদী ছিলেন এক সাহসী বিপ্লবী কণ্ঠস্বর।
শরীফ ওসমান হাদী শুধু একটি নাম নয়। তিনি ছিলেন একজন জুলাই যোদ্ধা, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম ‘ইনকিলাব মঞ্চ’-এর আহ্বায়ক, একজন শিক্ষক ও একজন বাবা। তাঁর শহীদ হওয়া দেশের জন্য বড় ধরনের ক্ষতি বলে মনে করছেন অনেকে। তাঁর মাথার দিকে ধেয়ে আসা বুলেট শুধু একজন মানুষকেই হত্যা করেনি, বরং রাষ্ট্র ও সমাজে সৃষ্টি করেছে গভীর ক্ষত।
‘জান দেব, তবু জুলাই দেব না’—হাদীর এই উচ্চারণ আজ আরও বেশি জীবন্ত। জীবন দিয়ে তিনি প্রমাণ করে গেছেন, জুলাই চেতনার বিনাশ তিনি হতে দেননি।
এই বিপ্লবী চেতনাকে শিক্ষার্থীদের মাঝে ছড়িয়ে দিতে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাকৃবি) আঁকা হয়েছে শহীদ হাদীর সাহসী ভঙ্গিমার দুটি বড় গ্রাফিতি। কৃষি অনুষদের শিক্ষার্থী হৃদয় হাসান ও তাঁর দল এই চিত্রকর্মগুলো অঙ্কন করেন।
একটি চিত্রকর্ম আঁকা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র–শিক্ষক কেন্দ্র (টিএসসি) ও পূবালী ব্যাংকের সামনের দেয়ালে, অন্যটি পশুপালন অনুষদের দেয়ালে। লাল রঙের পটভূমিতে সাদা ও কালোর মিশেলে আঁকা এসব চিত্রকর্ম যেন নীরব অথচ তীব্র প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছে।
চিত্রে দেখা যায়, হাদী দুই হাত প্রসারিত করে আহ্বানের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁর উঁচু করা আঙুল যেন অন্যায় ও অশুভ শক্তির বিরুদ্ধে শপথের প্রতীক। লাল রঙ তাঁর রক্তের বিনিময়ে বাংলার জমিনে ঝরে পড়া রক্তের ইঙ্গিত দেয়। সাদা রঙে ফুটে উঠেছে তাঁর সাদামাটা জীবনযাপন ও মানুষের কল্যাণে নির্মল চিন্তা।
চিত্রকর্মের পাশে লেখা রয়েছে একটি উক্তি—
“যে জমিনের দাসত্ব নিশ্চয় নিয়তি, লড়াই সেখানে ইবাদত সর্বোত্তম।”
গ্রাফিতিগুলো দেখতে প্রতিদিন ভিড় করছেন শিক্ষার্থী ও দর্শনার্থীরা। কেউ ছবি তুলছেন, কেউ সেলফি, কেউ দলগতভাবে দাঁড়িয়ে স্মৃতি ধরে রাখছেন। অনেকের মতে, এই চিত্রকর্ম শুধু শিল্প নয়, এটি এক ধরনের চেতনার দলিল।
চিত্রশিল্পী হৃদয় হাসান বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী করে তুলতেই আমরা এই চিত্রকর্ম এঁকেছি। হাদী আজ আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর ন্যায় ও ইনসাফের ভাবনা বেঁচে আছে। একজন হাদী শহীদ হয়েছেন, কিন্তু লক্ষ হাদী তৈরির লক্ষ্যেই এই আয়োজন।’
চিত্রাঙ্কনে সহযোগী সংগঠন বাকৃবি সলিডারিটি সোসাইটির সদস্য ছাব্বির হোসেন রিজন বলেন, ‘একজন শিক্ষার্থী শুধু পরীক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তোলাই তার দায়িত্ব। অন্যায় দেখে চুপ থাকাও এক ধরনের অন্যায়। এই চিত্রকর্ম ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর মানসিকতার প্রতীক।’
পশুপালন অনুষদের শিক্ষার্থী মোতমাইন্না আক্তার মুন্নী বলেন, ‘এটি শুধু একটি চিত্রকর্ম নয়, এটি আমাদের সাহস ও প্রতিবাদের প্রতীক। দেয়ালে আঁকা হলেও এটি খুব জীবন্ত মনে হয়। যেন আমাদের সঙ্গে কথা বলে, প্রশ্ন তোলে এবং জাগিয়ে তোলে।’
কৃষি প্রকৌশল ও প্রযুক্তি অনুষদের শিক্ষার্থী সাইয়্যেদা গালিবা রুহী বলেন, ‘হাদী বলতেন, বুলেট ছাড়া তাঁকে থামানো যাবে না। বাস্তবে তাই হয়েছে। এই চিত্রকর্ম এখন শুধু শিল্প নয়, ক্ষোভ, প্রতিবাদ ও নীরব আর্তচিৎকারের প্রতীক। মানবিকতার পক্ষে দাঁড়ানো এখন দায়িত্ব।’
ইখা