চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড উপজেলার জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় অভিযানে গিয়ে দুর্বৃত্তদের সংঘবদ্ধ হামলার শিকার হয়েছেন র্যাবের সদস্যরা।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বিকেলে ঘটে যাওয়া এ ঘটনায় র্যাবের এক সদস্য গুরুতর আহত হয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। একই ঘটনায় র্যাবের আরও তিন সদস্য দুর্বৃত্তদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
ঘটনার পর থেকে জঙ্গল সলিমপুর এলাকা ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সেখানে র্যাব ও পুলিশের অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে। সবশেষ পাওয়া তথ্যে জানা যায়, জিম্মি র্যাব সদস্যদের উদ্ধারে যৌথ বাহিনী অভিযান অব্যাহত রেখেছে।
চট্টগ্রাম র্যাব ও চট্টগ্রাম পুলিশের ঊর্ধ্বতন দুজন কর্মকর্তা পৃথকভাবে গণমাধ্যমকে হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
চট্টগ্রাম র্যাবের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে সময়ের কন্ঠস্বর-কে জানান, সোমবার বিকেলে র্যাব-৭ (পতেঙ্গা ব্যাটালিয়ন) এর একটি টিম নিয়মিত অভিযানের অংশ হিসেবে জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় প্রবেশ করে। অভিযানের একপর্যায়ে আগে থেকে অবস্থান নেওয়া দুর্বৃত্তরা র্যাব সদস্যদের লক্ষ্য করে হামলা চালায়। পাহাড়ি দুর্গম অবস্থানের সুযোগ নিয়ে তারা চারদিক থেকে চড়াও হয়। এতে এক র্যাব সদস্য গুরুতর আহত হন এবং তিনজন সদস্য দুর্বৃত্তদের হাতে আটকা পড়েন। আহত সদস্যকে উদ্ধার করে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মহিনুল ইসলাম বলেন, র্যাবের ওপর হামলার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
জঙ্গল সলিমপুর দীর্ঘদিন ধরেই চট্টগ্রামের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে পরিচিত। সীতাকুণ্ড উপজেলার সলিমপুর ইউনিয়নের এই পাহাড়ি অঞ্চলে প্রায় চার দশক ধরে সরকারি পাহাড় ও খাস জমি দখল করে গড়ে উঠেছে কয়েক হাজার অবৈধ বসতি। দুর্গম ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এলাকাটি পরিণত হয়েছে পাহাড়খেকো, ভূমিদস্যু ও সশস্ত্র সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রশাসন সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, জঙ্গল সলিমপুরে এখনো সশস্ত্র পাহারার মাধ্যমে এলাকা নিয়ন্ত্রণ করা হয়। বহিরাগতদের প্রবেশ কার্যত নিষিদ্ধ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো গাড়ি বা টিম এলাকায় ঢুকলেই পাহারাদারদের মাধ্যমে মুহূর্তের মধ্যে খবর পৌঁছে যায় সন্ত্রাসীদের কাছে। এরপর পাহাড়ের ওপর থেকে শুরু হয় ইট-পাটকেল, ককটেল কিংবা আগ্নেয়াস্ত্রের হামলা।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জঙ্গল সলিমপুরের মোট আয়তন প্রায় তিন হাজার একশ একর। লিংক রোড সংলগ্ন এই এলাকায় প্রতি শতক জমির বাজারমূল্য ৯ থেকে ১০ লাখ টাকা। সেই হিসেবে বর্তমানে দখল হয়ে থাকা সরকারি খাস জমির আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা।
এই বিপুল অর্থনৈতিক স্বার্থকে কেন্দ্র করেই এলাকাটিতে দীর্ঘদিন ধরে আধিপত্য বিস্তার, সংঘর্ষ, খুনোখুনি ও সন্ত্রাসী তৎপরতা চলে আসছে। বিভিন্ন সময় দখলদার গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে।
গত বছরের ৫ আগস্ট দেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জঙ্গল সলিমপুর এলাকায় সশস্ত্র সংঘর্ষ আরও তীব্র আকার ধারণ করে। পাহাড় ও জমির নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে একের পর এক হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। সবশেষ দুটি পক্ষের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনায় একজন নিহত হন। ওই ঘটনার পরদিন এলাকায় সংবাদ সংগ্রহে গেলে সন্ত্রাসীদের হামলার শিকার হন দুই সাংবাদিক, যা দেশজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করে।
জঙ্গল সলিমপুরে উচ্ছেদ অভিযান কিংবা পাহাড় কাটা বন্ধে এর আগেও একাধিকবার প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ভয়াবহ হামলার মুখে পড়েছে। ২০২৩ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর উচ্ছেদ অভিযান শেষে ফেরার পথে জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট, থানার ওসি ও পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ২০ জন আহত হন। ২০২২ সালেও র্যাব, পুলিশ ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ওপর একাধিকবার হামলার ঘটনা ঘটে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, জঙ্গল সলিমপুরের ভৌগোলিক অবস্থান এমন যে একক বাহিনীর পক্ষে সেখানে অভিযান চালিয়ে দীর্ঘ সময় অবস্থান করা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। পাহাড়ি ঢাল, ঘন জঙ্গল ও সংকীর্ণ চলাচলপথ সন্ত্রাসীদের পক্ষে সুবিধাজনক অবস্থান তৈরি করে দেয়। ফলে অভিযান পরিচালনায় বাড়তি জনবল, সমন্বিত কৌশল ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ছাড়া পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
জঙ্গল সলিমপুরের সরকারি খাস জমিতে কারাগার, আইটি পার্কসহ অন্তত ১১টি বড় রাষ্ট্রীয় প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে জমি উদ্ধার সম্ভব না হওয়ায় এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন আলোর মুখ দেখেনি। এতে একদিকে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ দখলদারদের নিয়ন্ত্রণে থেকে যাচ্ছে, অন্যদিকে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পরিকল্পিত উন্নয়ন।
পিএম