চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলা কর্ণফুলী নদী, পাহাড় ও সমতলের এক অনন্য ভৌগোলিক পরিবেশে অবস্থিত। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই উপজেলায় রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।
বিশেষ করে চট্টগ্রাম–৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী একে অপরের সঙ্গে কঠোর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত। বিগত চট্টগ্রাম সাত এই আসনটি ২০০৮ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামীলীগের এমপি হাসান মাহমুদের কব্জায় ছিল। সর্বশেষ ২০২৪ সালে জানুয়ারি ডামি নির্বাচনে ইসলামী ফ্রন্ট মোমবাতির প্রার্থী ইকবাল হাসানকে বিপুল ভোটে হারিযে অধিপতি ধরে রাখেন।
এবার আওয়ামীলীগ না থাকার কারনে বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে হারানো ঘাটি ফেরত পেতে সক্রিয় প্রস্তুতি নিচ্ছে, আর জামায়াতে ইসলামী তার সংগঠিত ভোট ব্যাংক কাজে লাগিয়ে আসন জয় করার জন্য জোর প্রচেষ্টা চালাচ্ছে। এছাড়া সুন্নি তরিকা মোমবাতি ও অন্যান্য ইসলামী দলও নির্বাচনে শক্তিশালী লড়াই চালাতে প্রস্তুত।
নির্বাচনের উত্তাপের প্রেক্ষাপটে ৬ ফেব্রুয়ারি দাঁড়িপাল্লা প্রতীকের প্রার্থী ডা. এটিএম রেজাউল করিমের সমর্থকদের গাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে। এই ঘটনায় নারী ও পুরুষসহ চারজন আহত হন। হামলার দায় বিএনপির উপর চাপানো হলেও, দলটি অভিযোগ অস্বীকার করেছে। ঘটনার পর উভয় পক্ষই রাতে পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ মিছিল আয়োজন করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে তীব্র বাকযুদ্ধ Election পরিবেশকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে। সব প্রার্থী আশা করছেন, যদি ভোট সুষ্ঠু হয়, তাদের দল জয়ী হবে।
রাঙ্গুনিয়া আসনে মোট আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন-বিএনপি থেকে হুমাম কাদের চৌধুরী,জামায়াতে ইসলামী: ডাক্তার এটিএম রেজাউল করিম,ইসলামী ফ্রন্ট অ্যাডভোকেট ইকবাল হাসান,ইসলামী আন্দোলন অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ হারুন, জাতীয় পার্টি মেহেদী রাশেদ, গণঅধিকার পরিষদ বেলাল উদ্দীন, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টি প্রমোদ বরণ বড়ুয়া, এবি পার্টি আব্দুর রহিম মনির।
মোট ভোটার সংখ্যা ৩১,০৩,১৬৪ জন, যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ১৬,০২,০৪৫ জন, নারী ভোটার ১৫,০১,১১৮ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের একজন ভোটার রয়েছেন। ভোটগ্রহণের জন্য মোট ৮৯টি কেন্দ্র নির্ধারণ করা হয়েছে।
ভৌগোলিক অবস্থান, অতীত নির্বাচন এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে কিছু ভোটকেন্দ্রকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। নির্বাচন কমিশন ও স্থানীয় প্রশাসন এসব কেন্দ্রের নিরাপত্তা জোরদার করতে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রগুলোতে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে এবং পুলিশের বিশেষ টহল দলকে সক্রিয় রাখা হয়েছে।
বিশেষ নজরদারি রাখা হচ্ছে নিম্নলিখিত ইউনিয়নগুলোর ভোটকেন্দ্রে: পোমরা, বেতাগী, চন্দ্রঘোনা, দক্ষিণ রাজানগর, হোসনাবাদ, ইসলামপুর, কোদালা, লালানগর, মরিয়মনগর, পদুয়া, পারুয়া, রাজানগর, স্বনির্ভর রাঙ্গুনিয়া, সরফভাটা ও শিলক।
ভোটারদের মধ্যে এখনও কিছু উদ্বেগ বিরাজ করছে। অতীতে বালু উত্তোলন কেন্দ্রিক সংঘর্ষ, চাঁদাবাজি, আধিপত্য বিস্তার এবং অস্ত্র উদ্ধারের মতো ঘটনায় প্রশাসনের ব্যর্থতা এই উদ্বেগের মূল কারণ। বাংলাদেশের ইতিহাসে নির্বাচনকালীন সহিংসতা নতুন নয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ সালের নির্বাচনে ছয়জন নিহত হন, ২০১৮ সালের রাতে ভোটের ঘটনায় ২২ জনের মৃত্যু ঘটে, আর ২০১৪ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক সহিংসতায় অন্তত ১১৫ জন প্রাণ হারান।
স্থানীয় তরুণ ভোটার সাদিক সালমান বলেন, “দীর্ঘ ১৭ বছর পর নির্বাচনের আমেজ ফিরে এসেছে। আমরা আশা করি ভোটকেন্দ্রে প্রশাসনের কড়া নজরদারি থাকলে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোট সম্ভব হবে।”
সব মিলিয়ে, প্রার্থী সংখ্যা, বিপুল ভোটার উপস্থিতি এবং বাড়তি নিরাপত্তা ব্যবস্থা এই নির্বাচনের গুরুত্ব বহুগুণ বৃদ্ধি করছে। চট্টগ্রাম–৭ (রাঙ্গুনিয়া) আসনের ফলাফল শুধুমাত্র স্থানীয় নয়, জাতীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
এনআই