যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ওষুধ সামগ্রীর মারাত্মক সংকট চলছে। ইতোমধ্যে প্রয়োজনীয় অনেক ইনজেকশন ও স্যালাইন শেষে হয়ে গেছে। ফলে চিকিৎসার জন্য বাইরের ফার্মেসি থেকে ওষুধ সামগ্রী কিনতে হচ্ছে। ওষুধের এই অভাব এবং বাইরে থেকে কেনার বাধ্যবাধকতা দরিদ্র রোগীদের জন্য বড় ধরনের আর্থিক বোঝা তৈরি করছে।
কর্তৃপক্ষ বলছে, কয়েক অর্থ বছরে চাহিদার তুলনায় মাত্র সাড়ে ৭ ভাগ অর্থ বরাদ্দ রয়েছে। আবার অতিরিক্ত বরাদ্দ বন্ধ। ১০০ শয্যার চাহিদার বরাদ্দে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল চলছে। গত কয়েক অর্থ বছরে এভাবে কম অর্থ বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহ থাকায় কয়েক মাস পরই ওষুধ ফুরিয়ে যায়। ফলে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ওষুধ সামগ্রী সরবরাহ করা সম্ভব হয় না।
জানা গেছে, যশোরসহ নড়াইল, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ ও মাগুরার বহু মানুষ এই হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে আসেন। সরকারিভাবে এই হাসপাতালে মোট ১১২ প্রকারের ওষুধ সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে ইডিসিএল থেকে আসে ৮২ প্রকার ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং স্থানীয় অর্থে টেন্ডারের মাধ্যমে অবশিষ্ট ৩০ প্রকার ওষুধ কেনা হয়। কিন্তু বর্তমানে অতি প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ ও চিকিৎসা সামগ্রী নেই। যেগুলোর সরবরাহ আছে সেগুলো দিয়ে জোড়াতালির মাধ্যমে চিকিৎসা চালানো হচ্ছে। ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম সংকট থাকায় চিকিৎসা নিতে আসা বেশির ভাগ রোগীকেই বাইরের ফার্মেসির দ্বারস্থ হতে হয়।
হাসপাতালের সার্জারি, মেডিসিন, হৃদরোগ, গাইনি, অর্থোপেডিকস, শিশু, পেইং ও লেবার ওয়ার্ডের একাধিক রোগী স্বজনরা জানিয়েছেন, হাসপাতাল থেকে যৎসামান্য ওষুধ দেয়া হচ্ছে। বেশির ভাগ ওষুধ ও আনুষাঙ্গিক জিনিসপত্র বাইরে থেকে কিনে আনতে হয়।
চান্দুটিয়া গ্রামের সাইফুল ইসলাম জানান, গত ২১ ফেব্রুয়ারি তার পিতাকে ইউনুস সর্দারকে পুরুষ সার্জারী ওয়ার্ডে ভর্তি করা হয়। ভর্তির পর ওয়ার্ড থেকে বিনামূল্যে কোন ওষুধ দেয়া হয়নি। গ্যাস ও হাইড্রোকরটিসন ও সেফুরএক্সিম ৭৫০ ইনজেকশনসহ সকল ওষুধ বাইরের ফার্মেসি থেকে কিনে আনহে হয়েছে।
করোনারি কেয়ার ইউনিটের চিকিৎসাধীন রোগীর স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, হৃদরোগে আক্রান্তদের নাভির ইনজেকশন কার্ডিনেক্স বিনামূল্যে সরবরাহ করা হচ্ছে না।
হাসপাতালের প্রশাসনিক সূত্র জানিয়েছে গত অর্থবছরে যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে ওষুধের চাহিদা ছিলো ৫৯ কোটি ৯৫ লাখ ৫ হাজার ৫০০ টাকার। এরমধ্যে বহির্বিভাগের ফার্মেসীতে চাহিদা ১৭ কোটি ৬৫ লাখ ৭৯ হাজার ৫৭৫ টাকা ও অন্তবিভাগের ১৯ ওয়ার্ডে চাহিদা ছিলো ৪২ কোটি ৩০ লাখ ২৫ হাজার ৪৭৫ টাকা। কিন্তু সরকারি প্রতিষ্ঠানটি ৮ কোাটি ২৩ লাখ ৯৪ হাজার টাকার ওষুধ ক্রয় করে। সামান্য পরিমাণে ওষুধ দিয়ে এত বড় হাসপাতালে রোগীদের প্রয়োজনীয় ওষুধ সরবরাহ রীতিমতো অসম্ভব হচ্ছে।
নথিপত্রের তথ্য অনুয়ায়ী, গত অর্থ বছরে ট্যাবলেট অ্যামোক্সিসিলিন+ক্যালভুল্যানিক অ্যাসিড ৬২৫ মিলিগ্রাম, অ্যাসপিরিন ৭৫ মিলিগ্রাম, বিসোপ্রোল ২.৫ মিলিগ্রাম, সেফুরোক্সিম ৫০০ মিলিগ্রাম, ট্যাব সেফুরোক্সিম+ক্যালভুল্যানিক অ্যাসিড ৫০০ মিলিগ্রাম, ক্লোপিডোগ্রেল প্লাস ৭৫ মিলিগ্রাম, ডক্সোফাইলিন ২০০ মিলিগ্রাম,মিসোপ্রোস্টল ২০০ মিলিগ্রাম, নাইট্রোগ্লিসারিন ২.৬ মিলিগ্রাম, ক্যাপ প্রেগাবালিন ৫০ মিলিগ্রাম, অ্যামিট্রিপটিটিন ২৫ মিলিগ্রাম র্যাবিপ্রাজল ২০ মিলিগ্রাম, টিমোনিয়া ম মিথাইলসালফেট ৫০ মিলিগ্রাম, ইনজেকশন অ্যাড্রেনালিন ২ মিলিগ্রাম, বুপিভাকেন হাইড্রোক্লোরাইড ২০ মিলিগ্রাম, ডোপামিন ২০ মিলিগ্রাম, হাইড্রোকর্টিসন (পানির সাথে), আইসোফ্লুরেন ১০০ মিলি,ক্যাটামিন ১০ মিলি, ন্যালেপসিন , অক্সিটোসিন, প্রোপোফল, প্যান্টোপ্রাজল ৪০ মিলিগ্রাম (পানির সাথে),সাক্সামেথোনিয়াম ২ মিলি, ভেনকুরন ১০ মিলিগ্রাম ৭.১% ক্লোরহেক্সিডিন, পোভিডোন আয়োডিন সলিউশন, সিরাপ. অ্যামব্রক্সল ১৫ মিলি/৫ মিলি , ডম্পেরিডন ৬০ মিলি ও ফেক্সোফেনাডিন ৬০ মিলি টেন্ডারের মাধ্যমে কেনা হয়। কিন্তু একটিও সরবরাহ নেই।
হাসপাতালের স্টোর কিপার গৌতম কুমার জানান, প্রতি অর্থ বছরে ‘ইডিসিএল’ থেকে ৮২ প্রকারের ওষুধ সামগ্রী সরবরাহ মেলে। তাও মাত্র চাহিদার সাড়ে ৭ ভাগ। আর টেন্ডারের (দরপত্র) মাধ্যমে (এমএসআর) ১ কোটি ৫৬ লাখ টাকায় ৩০ প্রকারের ওষুধ কেমিক্যাল ক্রয় করা হয়। টেন্ডারে কেনা ওষুধ সামগ্রী দেড় থেকে দুই মাসের মধ্যে শেষ হয়ে যায়। ফলে কিছু করার থাকে না। তিনি আরও জানান, ‘ইডিসিএল’ সরবরাহ ওষুধ শেষ হয়ে গেলে বিভিন্ন হাসপাতালে মজুদ রাখাগুলো সংগ্রহ করে আনা হয়। সরকারি বরাদ্দ কম থাকায় সব সময় বিনামূল্যে ওষুধ সরবরাহ করা সম্ভব হয়না।
হাসপাতালের হিসাব রক্ষক ইসরাফিল হোসেন জানান, এত সামান্য পরিমাণ বরাদ্দের টাকায় কেনা ওষুধ দিয়ে রোগীদের মন জয় করা কখনো সম্ভব হবে না। সরকারের সরবরাহ ওষুধ দিয়ে রোগীদের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হলে বরাদ্দ বাড়াতে হবে।
হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. হুসাইন শাফায়াত জানান, গত কয়েক অর্থ বছর চাহিদার তুলনায় খুবই কম অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়। আবার অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দ বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে রোগীদের বিনামূল্যে দেয়া হচ্ছে চাহিদার মাত্র ৩ শতাংশ ওষুধ। বাকি ৯৭ শতাংশ ওষুধ রোগীদের কিনতে হচ্ছে বাইরে থেকে। ১০০ শয্যার বরাদ্দ দিয়ে ২৫০ শয্যার হাসপাতাল পরিচালনা করা হচ্ছে। যে কারণে ওষুধ সামগ্রী ও কেমিক্যালের সংকট লেগে থাকে। এক্সরে ফ্লিম ও প্যাথলজি পরীক্ষার রি-এজেন্ট কেনার জন্য যে অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয় তা দিয়ে সামাল দেয়া খুবই কষ্টকর।
ইখা