ইরানে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র যৌথভাবে হামলা চালিয়ে পুরো মধ্যপ্রাচ্যে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারির ওই আগ্রাসনের পর হাতের মুষ্ঠি ছেড়ে দিয়েছে তেহরানও। ঝাঁকে ঝাঁকে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ছুড়ছে উগ্র ইহুদিবাদী ভূখণ্ড ও উপসাগরীয় দেশগুলোয় মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনা লক্ষ্য করে।
সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে সমগ্র অঞ্চলে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জ্বালানি মার্কেট। ইরান বিশ্বের তেল ও গ্যাস সরবরাহের প্রধান রুট হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ায় হাহাকার শুরু হয়েছে ইউরোপ ও আমেরিকায়। সামগ্রিক বিবেচনায় এ যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষতি হতে পারে ২১ হাজার কোটি ডলার। যা বাংলাদেশি টাকায় দাঁড়ায় ২৫দশমিক ৬৯ ট্রিলিয়ন বা ২৫ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকা। বর্তমান মুদ্রা বাজার অনুযায়ী, প্রতি ডলার ১২২ দশমিক ৩৫২ টাকা ধরলে এ সংখ্যা পাওয়া যায়।
পেন হোয়ার্টন বাজেট মডেলের পরিচালক ও রাজস্ব বিশ্লেষক কেন্ট স্মেটার্সের মতে, ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের কারণে মার্কিন অর্থনীতির ২১০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত ক্ষতি হতে পারে।
স্মেটার্স সম্প্রতি বলেন, চলমান সংঘাত ইতোমধ্যে বাণিজ্য, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ও গ্যাসোলিনের দামে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে, যদিও অর্থনীতির ওপর এই যুদ্ধের প্রভাব কতটা সুনির্দিষ্টভাবে পড়বে তা অনুমান করা কঠিন। তার বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ১১৫ বিলিয়ন ডলার, তবে সংঘাতের ধরণ ও স্থায়িত্বের ওপর ভিত্তি করে এই অংক ৫০ বিলিয়ন থেকে ২১০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত হতে পারে।
তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেন, যুদ্ধব্যয় গণনার ক্ষেত্রে আমার একটি সমস্যা হলো—তারা বিকল্প পরিস্থিতি বা ‘কাউন্টারফ্যাকচুয়াল’ বিষয়টিকে পুরোপুরি উপেক্ষা করে। ইরান যদি সত্যিই পারমাণবিক অস্ত্র পেয়ে যেত, তবে পরে আমাদের সামরিক খাতে এবং এমনকি শহরগুলো পুনর্গঠনে আরও অনেক বেশি অর্থ ব্যয় করতে হতো।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে যুদ্ধের অর্থনৈতিক হুমকির কথা স্বীকার করেছেন এবং পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলো দিয়ে চলাচলকারী জ্বালানি ট্যাঙ্কারগুলোর জন্য সরকারি বীমা ও প্রয়োজনে নৌ-এসকর্ট দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন।
মঙ্গলবার (৩ মার্চ) ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প ঘোষণা করেন, প্রয়োজন হলে মার্কিন নৌবাহিনী যত দ্রুত সম্ভব হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী ট্যাঙ্কারগুলোকে পাহারা দিতে শুরু করবে। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বে জ্বালানির অবাধ প্রবাহ নিশ্চিত করবে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ।
ওয়াশিংটনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প স্বীকার করেন, যুদ্ধের কারণে তেলের দাম ‘কিছু সময়ের জন্য’ বেশি থাকতে পারে, তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন যে সংঘাত শেষ হলে ‘এই দাম আগের চেয়েও নিচে নেমে আসবে বলে আমি বিশ্বাস করি।’
মঙ্গলবার (৩ মার্চ) লেনদেন শেষে বেঞ্চমার্ক ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট অপরিশোধিত তেলের দাম ৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে এবং আমেরিকান অটোমোবাইল অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, জাতীয় পর্যায়ে প্রতি গ্যালন গ্যাসোলিনের গড় দাম ১০ সেন্টের বেশি বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব কতটা হবে তা মূলত সংঘাত কতদিন স্থায়ী হয় তার ওপর নির্ভর করবে। গ্রাউন্ডওয়ার্ক কোলাবোরেটিভ-এর নীতি ও অ্যাডভোকেসি প্রধান এবং বাইডেনের সাবেক অর্থনৈতিক উপদেষ্টা অ্যালেক্স জ্যাকুয়েজ বলেন, বাজার বর্তমানে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের ঝুঁকিকে বেশ অবমূল্যায়ন করছে—এমন একটি সংঘাত যা দ্রুত শেষ হবে না, হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচল স্বাভাবিক হবে না এবং সবকিছু সময়মতো স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরবে না।
অর্থনৈতিক ক্ষতির পাশাপাশি, এই বিশাল সামরিক অভিযানে আরও ৬৫ বিলিয়ন ডলারের বাজেট ব্যয় হতে পারে, যার জন্য যুক্তরাষ্ট্র ওই অঞ্চলের বিভিন্ন ঘাঁটি থেকে বিমান ও নৌবাহিনী মোতায়েন করেছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের এই অভিযান, যার নাম দেওয়া হয়েছে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’, কতদিন চলবে তা ‘এই মুহূর্তে জানা সম্ভব নয়’ বলে কংগ্রেসকে লেখা এক চিঠিতে ট্রাম্প জানিয়েছেন। তিনি গত ২ মার্চ লিখেছেন, যদিও যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত এবং টেকসই শান্তি চায়, তবে প্রয়োজনীয় সামরিক অভিযানের পূর্ণ পরিধি ও স্থায়িত্ব এই মুহূর্তে জানা সম্ভব নয়।
তিনি এর আগে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে এই বোমাবর্ষণ ‘চার থেকে পাঁচ সপ্তাহ’ স্থায়ী হতে পারে।
এমআর-২