বিশ্বজুড়ে হাসপাতালগুলোতে আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সংক্রমণ, যা আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের জন্য এক ভয়াবহ বার্তা নিয়ে আসছে।
সম্প্রতি যুক্তরাজ্যের দ্য গার্ডিয়ান পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) বারবার সতর্ক করছে যে প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক দিয়ে যেসব সাধারণ সংক্রমণ একসময় সহজেই সারিয়ে তোলা যেত, এখন আর সেগুলোতে কাজ হচ্ছে না। চিকিৎসকদের বড় একটি অংশ আশঙ্কা করছেন যে, আগামী কয়েক বছরের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের কারণে সাধারণ রোগের চিকিৎসাও দুঃসাধ্য হয়ে পড়বে।
২০২৩ সালের এক বৈশ্বিক সমীক্ষায় দেখা গেছে, পরীক্ষাগারে শনাক্ত হওয়া প্রতি ছয়টি সংক্রমণের মধ্যে একটি এখন অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী।
বিশেষ করে রক্ত, অন্ত্র, মূত্রনালি এবং প্রজননতন্ত্রের প্রায় ৪০ শতাংশ সংক্রমণের ক্ষেত্রে সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিক অকার্যকর হয়ে পড়ছে। ই. কোলাই এবং সালমোনেলার মতো ‘গ্রাম-নেগেটিভ’ ব্যাকটেরিয়ার ক্রমবর্ধমান প্রতিরোধ ক্ষমতা সবচেয়ে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্ট্যান্সের হার ৭০ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা চিকিৎসাবিজ্ঞানের কয়েক দশকের অর্জনকে ধূলিসাৎ করে দিতে পারে।
২০১৭ সালেই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছিল যে বিশ্বের অ্যান্টিবায়োটিক ভাণ্ডার ফুরিয়ে আসছে। যক্ষ্মাসহ বিভিন্ন জটিল রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত অ্যান্টিব্যাকটেরিয়াল এজেন্টের আবিষ্কারে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে বাজারে থাকা অধিকাংশ ওষুধ মূলত পুরোনো অ্যান্টিবায়োটিকেরই সামান্য পরিবর্তিত সংস্করণ, যা ব্যাকটেরিয়ার দ্রুত মিউটেশনের সাথে পাল্লা দিতে পারছে না। নতুন ও কার্যকর ওষুধ আবিষ্কৃত না হলে ছোটখাটো অস্ত্রোপচারও সংক্রমণের কারণে প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। বর্তমানে ই-কোলাই এবং মাইকোব্যাকটেরিয়াম টিউবারকুলোসিসসহ ১২টি ব্যাকটেরিয়াকে ডব্লিউএইচও অগ্রাধিকার তালিকায় রেখেছে, যেগুলোর বিরুদ্ধে লড়াই করার মতো কোনো কার্যকর ওষুধ চিকিৎসকদের হাতে প্রায় নেই বললেই চলে।
বর্তমানে গবেষণাধীন ৫১টি অ্যান্টিবায়োটিকের মধ্যে মাত্র ৮টি চিকিৎসাক্ষেত্রে প্রকৃত অবদান রাখতে পারবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ডব্লিউএইচও-এর অ্যাসেনশিয়াল মেডিসিন বিভাগের পরিচালক ডা. সুজান হিল জানিয়েছেন, প্রাণঘাতী জীবাণুদের বিরুদ্ধে মানুষের আত্মরক্ষার ঢাল ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছে। বিখ্যাত চিকিৎসা সাময়িকী ‘ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত এক নিবন্ধে শীর্ষস্থানীয় ২৬ জন বিজ্ঞানী সতর্ক করেছেন যে, আগামী দুই-তিন দশকের মধ্যে মানবজাতি হয়তো সেই ‘প্রাক-অ্যান্টিবায়োটিক যুগে’ ফিরে যাবে, যেখানে সাধারণ সংক্রমণেই গণহারে মানুষের মৃত্যু হতো।
এই সংকটের মূলে রয়েছে বাণিজ্যিক সীমাবদ্ধতাও। একটি নতুন অ্যান্টিবায়োটিক তৈরিতে কোটি কোটি ডলার খরচ হলেও দীর্ঘমেয়াদি ওষুধের তুলনায় এর মুনাফা অনেক কম। এছাড়া নতুন ওষুধ বাজারে আসার দ্রুততম সময়ের মধ্যে ব্যাকটেরিয়া তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলায় বড় ওষুধ কোম্পানিগুলো এই গবেষণায় আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে।
এইচএ