আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বরিশাল-৫ আসন নিয়ে জামায়াতসহ ১১-দলীয় জোটের ভিতরে দেখা দিয়েছে গভীর টানাপোড়েন। নির্বাচনি আসন বণ্টন নিয়ে জোটে থাকা কয়েকটি দলের মধ্যে চলছে স্নায়ুযুদ্ধ। বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ আসন বণ্টন নিয়ে অসন্তুষ্টি রয়েছে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমীর মোহাম্মদ ফয়জুল করীম তিনি কাঙ্খিত আসনটি না পাওয়ায় তারা একক নির্বাচন করার কথাও জানিয়েছে দলটি। ইতোমধ্যে ২৭২ আসনে মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছেন ইসলামী আন্দোলনের প্রার্থীরা।
এ ছাড়া বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টিসহ কয়েকটি দল আসন নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। সব মিলিয়ে ইসলামী সমনা ৮ দলীয় জোটের প্রার্থীদের মধ্যে চলছে টানপোড়ন।
বরিশাল সদর-৫ আসনটিতে প্রতিদ্বন্দিতা করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে ইসলামী ৮ দলীয় জোটের প্রধান দুটি দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ।
তবে জোটের প্রশ্নে এ আসনটি ইসলামী আন্দোলনই পাবে বলে দাবী করেন সংগঠনটির নায়েবে আমীর মুফতি মুহাম্মদ ফয়জুল করিম। কয়েকদিন আগে বরিশাল প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভায় তিনি এ আসনটি নিয়ে দলের অবস্থান ও নিজেকে আসনটির প্রর্থীতা হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করেন। তবে মর্যাদার এ আসনটি নিজেদের ঘরেই রাখতে চাইছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী।
জামায়াতের নেতৃবৃন্দরা বলেন, ১৯৭০ সালেও জামাতের প্রার্থী ছিলো বরিশাল সদর আসনে। তখন ইসলামী আন্দোলনের কোন প্রার্থী ছিলো না এখানে। এমনকি পীর সাহেব এ আসন থেকে কখনোই নির্বাচন করেনি বলে দাবী করেন তারা। তবে আসনটি ইসলামী আন্দোলন পাবে নাকি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলাম পাবে তা জোটের বৈঠকে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি বলে দাবী করে সূত্রটি।
সূত্র জানায়, বরিশাল সদর-৫ আসনটি বরিশালের সবচেয়ে মর্যাদার আসন হিসেবেই ধরা হয়। এ আসনটি এক সময়ে বিএনপির ঘাঁটি হিসেবে চিহ্নিত হলেও ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে এ আসনটি নিজেদের দখলে রেখেছে দলটি। ওই সময়ে বিরোধী দলের নেতা কর্মীদের উপর হামলা,মামলা ও নির্যাতনে অনেকটা কোনঠাসা হয়ে পরে বিএনপিসহ বিরোধী দলের নেতা কর্মীরা। তবে ৫ আগস্টের পর পরিস্থিতি অনেকটাই পাল্টে যায়। বর্তমানে বিএনপির পাশাপাশি ইসলামী দলগুলোর কর্মী ও সমর্থকদের সংখ্যাও বাড়ছে।
এছাড়া বিএনপির আভ্যন্তরীন বিরোধ ও একক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে সোচ্ছার হচ্ছে ইসলামী দলের নেতা কর্মীরা। যে কারনে এ আসনে ৮ দলীয় ইসলামী জোটের ভোটার ও কর্মী সমর্থকদের সংখ্যা বাড়ছে। নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, ১৯৯১ সালে প্রথমবারের মতো বরিশাল সদর আসনে নির্বাচনে অংশ নেয় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের প্রার্থীরা।
এ সময় ইসলামী ঐক্য জোটের ব্যানারে রশিদ আহম্মেদ ফেরদৌস পেয়েছিলেন ৪ হাজার ১৭৭ ভোট। ওই বছর বিএনপির প্রার্থী আব্দুর রহমান ৫২ হাজার ৯৫ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই সময় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের মনোনীত প্রার্থী আবুল হাসনাত মো. নুরুল্লাহ পেয়েছিলেন ৫ হাজার ৪শ ৭ ভোট।
এছাড়া ৯৬ সালে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মো. নাছিম বিশ্বাস ৭০ হাজার ৮শ ৪ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামের মনোনীত প্রার্থী মুয়াযযম হোসাইন হেলাল পেয়েছিলেন ৪ হাজার ৬শ ৬৭ ভোট। ওই সময়ে ইসলামী ঐক্য জোটের প্রার্থী সৈয়দ নাশির আহমেদ কাওসার পেয়েছিলেন ৪ হাজার ৬শ ৪৭ ভোট।
২০০১ সালের নির্বাচনে চারদলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার ১ লাখ ৮ হাজার ৪শ ১২ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে ইসলামী ঐক্য ফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে সংসদ সদস্য পদে নির্বাচনে অংশ নেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের নায়েবে আমীর ফয়জুল করীম।
তিনি ওই নির্বাচনে ২০ হাজার ৫শ ৫৩ ভোট পান। ২০০৮ সালের নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মনোনীত প্রার্থী হিসেবে মো. ফয়জুল করীম নির্বাচনে অংশ নিয়ে ২৭ হাজার ১৫৬ ভোট পান। ওই নির্বাচনে জামাত কোন প্রার্থী দেয়নি। এসময় বিএনপির প্রার্থী মজিবর রহমান সরোয়ার ১ লাখ ৫ হাজার ৬৯৪ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।
২০১৪ সালের নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি সহ অন্যান্য দলগুলো। একক ভাবে নির্বাচনে অংশ নিয়ে সাবেক মেয়র হিরন এ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী অংশ নেননি।
২০১৮ সালের ওই নির্বাচনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মনোনীত প্রার্থী মো. ফয়জুল করিম ৩০ হাজার ভোট পেয়েছিলেন। ওই নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী কর্নেল অব জাহিদ ফারুক ২ লাখ ১৫ হাজার ৮০ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ওই নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী অংশ নেয়নি।
২০২৩ সালের ১২ জুন বরিশাল সিটি নির্বাচনে অংশ নিয়ে ৩৫ হাজার ভোট পান ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মনোনীত প্রার্থী মুফতি সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করিম। ২০২৪ সালের নির্বাচনে নৌকার প্রর্থী কর্নেল জাহিদ ফারুক শামীম ৯৭ হাজার ৭০৬ ভোট পেয়ে সংসদ সদস্য নির্ববাচিত হন। আওয়ামী লীগের সর্বশেষ নির্বাচনে ইসরামী ঐক্যজোট ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামের কোন প্রার্থী নির্বাচনে অংশ নেয়নি।
এ বিষয়ে বরিশাল মহানগর জামায়াতের আমীর মুহাম্মদ জহির উদ্দীন বাবর বলেন, স্থানীয়ভাবে আমাদের চাওয়া-পাওয়ার কিছুই থাকেনা। কেন্দ্র আমাদের কাজ করতে বলেছে, সে মোতাবেক আমরা কাজ করছি। কেন্দ্রীয় কমিটি যা বলবে আমরা তা পালন করবো।
তিনি বলেন, বরিশাল সদর আসনে আমাদের হাজার হাজার কর্মী ও সমর্থক রয়েছে। আমরা দু’বার এ আসন থেকে নির্বাচন করেছি। এবারও আমরা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিচ্ছি।
এবিষয় নিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের বরিশাল বরিশাল মহানগরের সহ-সেক্রেটারী মো. নাছির উদ্দীন নাইস আমার সংবাদকে বলেন, বরিশাল নগরীর ৩০টি ওয়ার্ড সদর উপজেলার ১০টি ইউনিয়ন ও ৯০ টি ওয়ার্ডে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের কমিটি আছে। এছাড়া এ আসনে পীর সাহেব চরমোইর জন্ম। তাই এ আসন কেই দাবী করলে তা হবে অযৌক্তিক।
এদিকে বরিশাল প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের সাথে মতবিনিময় সভায় বরিশাল সদর আসনে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মনোনীত প্রার্থী মুফতি সৈয়ম মুহাম্মদ ফয়জুল করিম বলেন, বরিশাল সদর আসনটি তাদেরই প্রাপ্য। এ আসনটি দলের আমীরের আসন, আমীর নিজের আসন না পেলে কিসের জোট।
তিনি আরো বলেন, যে আসনে যোর অবস্থান ভালো সে আসনে তারাই নির্ববাচন করবে। দক্ষিনাঞ্চলের দু’ একটি ছাড়া প্রায় প্রতিটি আসনেই আমাদের অবস্থান ভালো।
বরিশাল সদর আসনের জামায়াত ইসলামের মনোনীত প্রার্থী মুয়াযযম হোসাইন হেলাল বলেন, এ আসনটি জামায়াতে ইসলামের অন্যতম ঘাঁটি। নগরীর প্রতিটি ওয়ার্ডে আমাদের সক্রিয় কমিটি ও হাজার হাজার নেতা কর্মী ও সমর্থক রয়েছে।
তিনি আরো বলেন, ১৯৭০ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে এ আসনে জামায়াতের প্রার্থিরা নির্বাচন করেছে। ১৯৯১ ও ৯৬ সালে এখানে আমরা নির্বাচন করেছি। পরবর্তিতে চারদলীয় জোটের সরিক থেকেও আমরা নির্বাচন করেছি। আসন্ন সংসদ নির্বাচনেও জামায়াতে ইসলাম নির্বাচনের প্রস্তিুতি নিচ্ছে।
মুয়াযযম হোসেন হেলাল বলেন, ৮ দলের ভিতরে এখনও কোন আসন বন্টনের সমঝোতার খবর আসেনি। আসন বন্টনের আগে এ নিয়ে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ মনোনীত প্রার্থী সাংবাদিকদের যা বলেছেন এটা তার নিজের বক্তব্য, জোটের বক্তব্য নয়। বরিশাল সদর আসনে তারা নির্বাচনী প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
শীর্ষ নেতাদের সমঝোতার ভিত্তিতে এখানে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী নির্বাচন করবে বলে আমরা আশাবাদী। তবে সমঝোতা হয়ে গেলে জোটভিত্তিক নির্বাচনে যাব। আমি মনে করি আলোচনার মাধ্যমে সমঝোতায় যাওয়া সম্ভব।’
আরডি