গত কয়েক দশক ধরে শহরে কিংবা গ্রামে দেখা যায় শিশুদের ডায়াপার পরানোর প্রবণতা। অস্বীকার করার উপায় নেই যে এগুলি অত্যন্ত সুবিধাজনক এবং এই প্রজন্মের বাবা-মায়ের জীবনকে সহজ করে তুলেছে। কিন্তু এই ডায়াপার পরানোর কারণে শিশুর মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে। শিশুদের শরিরের গঠন ও বৃদ্ধির রোধে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। তাই ডায়াপার না পরানোই ভালো।
ডায়াপার ব্যবহার করা সুবিধাজনক হলো ধোয়ার কোনও ঝামেলা নেই, এগুলি সহজেই পাওয়া যায় এবং অবশ্যই, ফুটো হওয়ার কোনও চিন্তা নেই। তবে, শিশুদের জন্য ডায়াপার ব্যবহারের কিছু অসুবিধা রয়েছে যা সম্পর্কে আপনার সচেতন থাকা উচিত। ত্বকের ফুসকুড়ি থেকে শুরু করে পোটি প্রশিক্ষণ পর্যন্ত, নির্দিষ্ট সুরক্ষা সতর্কতা ছাড়াই ব্যবহার করা হলে ডায়াপার ব্যবহার শিশুর স্বাস্থ্যের অনেক ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলতে পারে।
শিশুকে ডায়াপার পরিয়ে রাখলে সবচেয়ে বেশি সুবিধা হচ্ছে বাবা মায়ের বা শিশুকে যারা দেখাশোনা করেন তাদের। কারণ হঠাৎ শিশু প্রস্রাব বা পায়খানা করলে তাদের গায়ে বা বিছানায় লাগার আশঙ্কা থাকে না। বিশেষ করে রাতের বেলায় শিশুকে ডায়াপার পরিয়ে রাখলে মা বাবা নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারেন। কিন্তু অনেক সময় ডায়াপার লিক করে এতে শিশু দীর্ঘ সময় ভিজে থাকে। আবার পায়খানা করে দীর্ঘ সময় ওই অবস্থায় থাকলে শিশুর শরীরে অ্যালার্জিসহ নানা সমস্যা দেখা দিতে পারে।
এ ব্যাপারে শিশু বিশেষজ্ঞরা বলেন, শিশুকে যদি ডায়াপার পরাতেই হয় তাহলে রাতে পরাতে পারেন। তাও ৬ ঘণ্টার জন্য। এর বেশি সময় শিশুকে ডায়াপার পরিয়ে রাখবেন না। কারন এতে শিশু গঠন প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।
বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট এর সহযোগী অধ্যাপক ডা. মাকছুদুর রহমান জানান, ডায়াপার পরালে শিশুর শরীরে বিভিন্ন সমস্যা দেখা দিতে পারে। যেমন— র্যাশ হতে পারে, অ্যালার্জি হতে পারে এবং শিশুর পায়খানা ও প্রস্রাবের জায়গাতে লাল লাল দাগ দেখা দিতে পারে।
অনেক সময় শিশুকে পরিষ্কার করার জন্য বাবা মায়েরা ভেজা টিস্যু ব্যবহার করেন। এতে শিশুর চর্মরোগ দেখা দিতে পারে। কারণ টিস্যুপেপারগুলোতে কেমিকেল থাকে। এসব টিস্যুপেপার দিয়ে শিশুর প্রস্রাব পায়খানা পরিষ্কার করালে অনেক সময় সঠিকভাবে পরিষ্কারও হয় না। এ কারণে শিশুর শরীরে অ্যালার্জি দেখা দিতে পারে।
সব থেকে ভালো উপায় হচ্ছে কুসুম গরম পানি দিয়ে শিশুকে ভালোভাবে পরিষ্কার করে এরপর সুতি নরম কাপড় দিয়ে শিশুর শরীর মুছে দিতে হবে। টিস্যুপেপারের কোয়ালিটি নিয়ে অনেক সময় প্রশ্ন থেকে যায় তাই শিশুকে মোছানোর জন্য এগুলো ব্যবহার না করাই ভালো। আর যদি ব্যবহার করতেই হয় তাহলে ভালো মানের ভালো টিস্যু ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
একজন অভিভাবক হিসেবে, আপনার শিশুর স্বাস্থ্য এবং সুস্থতার যত্ন নেওয়া আপনার দায়িত্ব। কোন সন্দেহ নেই যে ডায়াপার আপনার জীবনকে সহজ করে তোলে, তবে ডায়াপারের কিছু অসুবিধা রয়েছে যা সম্পর্কে অভিভাবকদের অবহিত করা উচিত।
শিশুদের জন্য ডায়াপার ব্যবহারের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া ও অসুবিধাগুলো হলো-
১) অ্যালার্জির প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতে পারে: শিশুদের ত্বক নরম এবং কোমল থাকে এবং কঠোর যেকোনো কিছু তাদের ত্বকের ক্ষতি করতে পারে। কিছু ডায়াপার প্রস্তুতকারক কোম্পানি প্রায়শই ডায়াপার তৈরিতে সিন্থেটিক ফাইবার, রঞ্জক বা অন্যান্য কঠোর রাসায়নিক পণ্য ব্যবহার করে। এই সমস্ত কঠোর রাসায়নিক আপনার শিশুর সংবেদনশীল ত্বকের ক্ষতি করতে পারে এবং অ্যালার্জির কারণ হতে পারে। এমন একটি ডায়াপার বেছে নিন যা নরম এবং ত্বক-বান্ধব উপকরণ দিয়ে তৈরি।
২) এটি ত্বকে র্যাশ সৃষ্টি করতে পারে: ডায়াপার র্যাশ শিশুদের মধ্যে খুবই সাধারণ। যদি একটি ভেজা ডায়াপার স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি সময় ধরে শিশুর গায়ে রাখা হয়, তাহলে ভেজা ময়লা ডায়াপারে ব্যাকটেরিয়া বংশবৃদ্ধি করতে পারে এবং র্যাশ হতে পারে। র্যাশের ঝুঁকি কমাতে আপনার ছোট্টটির র্যাশ নিয়মিত পরিবর্তন করতে ভুলবেন না।
৩) এটি বিষাক্ততার দিকে পরিচালিত করতে পারে: ডায়াপার রাসায়নিক এবং কৃত্রিম উপকরণ দিয়ে তৈরি; আপনার শিশুকে দীর্ঘ সময় ধরে এই ধরণের জিনিসের সংস্পর্শে রাখলে তার ক্ষতি হতে পারে। এটি ঘটে কারণ গড়ে, আপনি দিনে আট থেকে দশটি ডায়াপার ব্যবহার করতে পারেন এবং রাতে আরও বেশি সময় ধরে ব্যবহার করতে পারেন। আপনার শিশুর নাজুক ত্বককে কঠোর রাসায়নিকের সংস্পর্শে আনার ফলে এর কিছু অংশ আপনার শিশুর শরীরেও প্রবেশ করতে পারে, যার ফলে বিষাক্ততা দেখা দিতে পারে। তবে, মাঝে মাঝে ব্যবহার করলে এটি খুব বেশি উদ্বেগের বিষয় নয়।
৪) সংক্রমণের সম্ভাবনা বেশি: ডায়াপার এমন একটি উপাদান দিয়ে তৈরি যা আপনার শিশুর প্রস্রাব শোষণ করতে সাহায্য করে। একই পদার্থ আপনার শিশুর ডায়াপারের ভেতরে বাতাসের সহজ প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে এবং ব্যাকটেরিয়া এবং অন্যান্য জীবাণুর বংশবৃদ্ধির জন্য উপযুক্ত পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। অতিরিক্ত ডায়াপার ব্যবহার আপনার শিশুর ত্বকে আক্রান্ত হওয়ার এবং অন্যান্য সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ায়। আপনার শিশুর ডায়াপার ঘন ঘন পরিবর্তন করতে ভুলবেন না।
৫) ডায়াপার ব্যয়বহুল: আপনি যদি কেবল ডায়াপারের উপর নির্ভর করেন, তাহলে এটি আপনার পকেটে একটি বড় গর্ত তৈরি করতে পারে। গড়ে, আপনাকে দিনে আট থেকে দশটি ডায়াপার পরিবর্তন করতে হতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে আরও বেশি। তবে, ভালো উপকরণ দিয়ে তৈরি অনেক ডায়াপার আছে যা সাশ্রয়ী মূল্যেরও, তাই আপনার গবেষণা করুন।
৬) টয়লেট প্রশিক্ষণে অসুবিধা: আপনার শিশুকে বেশিরভাগ সময় ডায়াপার পরতে দিলে আপনার শিশুকে টয়লেট প্রশিক্ষণে সমস্যা হতে পারে। এর কারণ হল শিশুরা ডায়াপারে প্রস্রাব করতে এবং মলত্যাগ করতে অভ্যস্ত হয়ে যায় এবং বাবা-মাও এটি সুবিধাজনক বলে মনে করেন। তবে, যখন আপনি আপনার শিশুকে পটি ট্রেনিং করার চেষ্টা করেন, তখন আপনার শিশুটি কান্নাকাটি করতে পারে এবং ঝগড়া করতে পারে। সাধারণত জীবনের প্রথম দিকে শুরু হওয়া টয়লেট ট্রেনিং পাঠগুলি সম্ভবত আজকের বিশ্বে তার গুরুত্ব হারাচ্ছে কারণ ডায়াপারের উপর অত্যধিক নির্ভরতা রয়েছে। আপনি আপনার শিশুকে আগে টয়লেট ট্রেনিংয়ের জন্য সময় বের করতে পারেন।
৭) ডায়াপার পরিবেশ-বান্ধব নয়: ডাইপারের ব্যবহার বৃদ্ধি পাচ্ছে, তবে এটি পরিবেশের জন্য ভালো নয়। প্রচুর সংখ্যক ডায়াপার রয়েছে যা প্লাস্টিক, সিন্থেটিক ফাইবার এবং অন্যান্য রাসায়নিকযুক্ত পরিবেশে ফেলে দেওয়া হয়। এই সমস্তগুলি পচন করা কঠিন এবং পরিবেশের জন্য হুমকিস্বরূপ। কিছু কোম্পানি পরিবেশ-বান্ধব ডায়াপারও তৈরি করেছে, তাই সেগুলি খুঁজে বের করুন।
৮) এটি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দমন করতে পারে: একটি শিশুর বৃদ্ধির সাথে সাথে তার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়, যা তাকে অল্প বয়সে সংক্রমণের জন্য সংবেদনশীল করে তোলে। ডায়াপার মূত্রনালীর বা ছত্রাকের সংক্রমণের কারণ হতে পারে এবং শিশুরা যত বেশি সংক্রমণে আক্রান্ত হয়, তাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তত বেশি দমন করা হয়, যা তাদের আরও সংক্রমণের জন্য সংবেদনশীল করে তোলে। দুষ্ট চক্র, তাই না? এর সাথে ডায়াপারে উপস্থিত উদ্বায়ী জৈব যৌগগুলি যোগ করুন, যা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে আরও প্রভাবিত করে।
এইচএ