আপনি কেমনভাবে বড় হয়েছেন, তা জীবনের পরবর্তী ধাপেও প্রভাব ফেলে। বিশেষজ্ঞরা এখনও বিতর্ক করেন, প্রকৃতি না লালন-পালনের মধ্যে কোনটি বেশি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু স্পষ্টভাবে বলা যায়, পরিবার এবং বেড়ে ওঠার পরিবেশ আমাদের ব্যক্তিত্ব গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
কঠিন পরিবেশে বড় হওয়া অনেক সময় এমন মানসিক ও আবেগগত চ্যালেঞ্জ তৈরি করে, যা অন্যরা পুরোপুরি বুঝতে পারে না। নিজের অতীত ও তার প্রভাব বোঝার চেষ্টা করলে আপনি আরও শান্ত, আত্মবিশ্বাসী ও স্বাধীনভাবে জীবনযাপন করতে পারবেন। একবার এ বিষয়টি বুঝে নিলে এবং গ্রহণ করলে, অতীতের ছায়া থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। কঠিন শৈশব কাটিয়ে ওঠা সময়সাপেক্ষ হতে পারে, কিন্তু থেরাপি এবং সচেতন প্রচেষ্টার মাধ্যমে নিজেকে আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।
এখানে কিছু ট্রমা উল্লেখ করা হলো, যা টক্সিক পরিবারে বড় হওয়ার কারণে দেখা দিতে পারে-
নিজের পরিচয় বোঝা যায় না: যদি আপনার শৈশব অস্থির হয় বা সবসময় অন্যদের চাহিদা আগে পূরণ করতে হতো, তবে হয়তো আপনি জানেন না আসলে আপনি কে। এ ধরনের পরিবেশে মানুষ নিজের সঙ্গে পরিচিত হতে পারে না এবং নিজের মত করে বাঁচতে ভয় পায়।
সবাইকে দূরত্বে রাখেন: যদি পরিবারে আবেগিক সংযোগ কম থাকে, তাহলে বড় হয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলা কঠিন হতে পারে। অনুভূতি প্রকাশ করা অস্বস্তিকর মনে হতে পারে, তাই মানুষকে দূরে রাখা যায়, যাতে হয়তো হতাশা বা আঘাত কম হয়।
সবসময় সাবধান থাকা: টক্সিক পরিবেশে আবেগিক অস্থিরতা সাধারণ। রাগ বা মানসিক সমস্যা থাকা অভিভাবকের মধ্যে বড় হওয়া মানে আপনি ছোট ভুলেও ভয় পেতে পারেন। তাই অনেক সময় আপনি দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলেন এবং নিজের মত কথা বলতে ভয় পান।
সবকিছুর জন্য নিজেকে দোষারোপ করা: কিছু পরিবারে অভিভাবক ছোটখাটো ভুলেও সন্তানকে দোষারোপ করেন। এতে আপনি মনে করতে পারেন সব দায়িত্বই আপনার কাঁধে, এমনকি যখন সেটা যুক্তিসঙ্গত নয়।
ব্যর্থতা সহ্য করা কঠিন: যদি অভিভাবক কঠোর এবং সর্বদা নিখুঁত হওয়ার আশা রাখতেন, তাহলে ব্যর্থতা মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে যায়। বড় হয়ে এমন মানুষ হয়তো সবসময় নিখুঁত হওয়ার চেষ্টা করেন এবং ভুল মেনে নিতে ভয় পান।
অন্যের সামনে নিজেকে প্রকাশ করতে ভয় পাওয়া: যদি বাড়িতে সবসময় ঝগড়া চলত, আপনি বড় হয়ে দ্বন্দ্ব এড়িয়ে চলতে পারেন। নিজের মতামত প্রকাশ করা বা অন্যের সঙ্গে বিতর্কে অংশ নেওয়া কঠিন হয়ে ওঠে।
পরিবারের সঙ্গে সময় কাটালে ক্লান্তি অনুভব করা: বড় হয়ে টক্সিক পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো মানসিক বা আবেগিক ক্লান্তি তৈরি করতে পারে। মূলত পরিবার হওয়া উচিত সমর্থন ও সান্ত্বনার জায়গা, কিন্তু টক্সিক পরিবেশে এটি প্রায়ই বোঝা বা চাপের মতো মনে হয়।
বিবাহিত জীবন: এরা বিবাহিত জীবনে পা রাখার কয়েক সপ্তাহ বা মাস পর থেকে তার পার্টনারের কাছ থেকে দূরে থাকতে পছন্দ করে। এরা তার পার্টনারের আবেগ অনুভূতিকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে অনেক পছন্দ করে। যার ফলে দাম্পত্য জীবনে তারা তার পার্টনারকে দূরে রাখতে পছন্দ করে। ছেলেদের ক্ষেত্রে তার স্ত্রীর দায়িত্ব নিতে চায় না। এমন কি সে বাবা হওয়ার পরেও তার বাচ্চার জন্য কিছুই করতে চায় না। সে চায় তার পার্টনারের পক্ষ থেকে সব দায়িত্ব বহন করুক। যার ফলে এদের আক্রোশের বলি হয়ে একসময় বিচ্ছেদও হয়।
টক্সি পরিবারের সবার আচরণের ধরন প্রায় এক: এ ধরনের পরিবারে দাওয়াতে গেলে তারা সবার আগে মানুষের আচরণে চেয়ে খাবারের দিকে বেশি খেয়াল করে। তাদের মূল উদ্দেশ্য হলো তাদের জন্য কেমন আয়োজন করলো। অপরদিকে এর বিপরিতের মানুষজন মানুষের আচরণের দিকে বেশি খেয়াল করে। তাকে কেমন সম্মান করলো, কি করলো না।
টক্সি পরিবারের সদস্যরা দোষ ধরা: এরা সব সময় মানুষের সমালোচনা করতে পছন্দ করে। এমন কি এরা সবসময় অন্যের সঙ্গে তাল দিয়ে চলতে অনেক স্বাচ্ছন্দবোধ করে।
টক্সিক পরিবারের মধ্যে বড় হয়ে ওঠা জীবনের নানা ধাপকে প্রভাবিত করে। নিজের অতীতকে বোঝা ও গ্রহণ করা, থেরাপি বা সচেতন প্রচেষ্টার মাধ্যমে মানসিক সুস্থতা অর্জন সম্ভব। এমন পরিস্থিতিতে নিজেকে ভালোবাসা, সীমা নির্ধারণ করা এবং প্রয়োজন হলে সাহায্য নেওয়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। স্মরণ রাখুন, অতীত আপনাকে সংজ্ঞায়িত করে না - আপনি এখনও নিজের জীবনের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেন।
এইচএ