চট্টগ্রাম নগরীতে একযোগে ৩৩০ জনকে ‘দুষ্কৃতিকারী’ আখ্যা দিয়ে বহিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ (সিএমপি)। নগরের শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার যুক্তি দেখিয়ে জারি করা এই বহিষ্কার আদেশকে ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গন, প্রশাসন ও সাধারণ মানুষের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র আলোচনা, বিতর্ক এবং বিভ্রান্তি।
একই তালিকায় রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতা, সাবেক সংসদ সদস্য, সাবেক মেয়র, কাউন্সিলর, ছাত্র ও যুব সংগঠনের নেতা, বিএনপির নেতাকর্মী এবং চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম একসঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, এই তালিকা কি আদৌ যথাযথ যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে তৈরি হয়েছে, নাকি আসন্ন নির্বাচন ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দিতে তড়িঘড়ি করে নেওয়া একটি প্রশাসনিক উদ্যোগ?
সিএমপির গণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৮-এর ৪০, ৪১ ও ৪৩ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করে এই বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। আদেশ অমান্য করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।
আইন অনুযায়ী, কোনো ব্যক্তি জনশৃঙ্খলা ভঙ্গ বা অপরাধ সংঘটনের সম্ভাব্য কারণ হলে তাঁকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মহানগর এলাকা থেকে বহিষ্কার করা যায়। বহিষ্কৃত ব্যক্তি পুনরায় এলাকায় প্রবেশ করতে পারবেন না এবং জননিরাপত্তার স্বার্থে এসব আদেশের মেয়াদ প্রয়োজনে বাড়ানো যায়।
বহিষ্কার তালিকার বড় অংশজুড়ে রয়েছেন আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠন ছাত্রলীগ ও যুবলীগের নেতাকর্মী এবং নগরের সাবেক জনপ্রতিনিধিরা। তাঁদের অনেকের নাম এমন সময়ে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যখন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা গত অন্তত এক বছর ধরে প্রকাশ্যে রাজনীতি বা নগরীতে সক্রিয় নন বলে দাবি তাঁদের ঘনিষ্ঠদের।
তালিকায় ‘দুষ্কৃতিকারী’ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মুহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল, সাবেক সংসদ সদস্য ফজলে করিম চৌধুরী, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র ও চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছির উদ্দিন, মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী, যুবলীগ নেতা হেলাল আকবর চৌধুরী বাবর, যুবলীগ নেতা দিদারুল আলম মাসুম, আওয়ামী লীগ নেতা খলিলুর রহমান নাহিদ।
এ ছাড়া তালিকায় রয়েছে চসিকের সাবেক কাউন্সিলর নুর মোস্তফা টিনু, শৈবাল দাশ সুমন, গাজী শফিউল আজম, শাহেদ ইকবাল বাবু, শফিকুল ইসলাম, এসরারুল হক, মোহাম্মদ কাজী নুরুল আমিন, মোবারক আলী, মোরশেদ আলম, জহুরুল আলম জসিম, নিছার উদ্দিন আহমেদ, মোহাম্মদ ইসমাইল, ওয়াসিম উদ্দিন চৌধুরী, আবুল হাসনাত মোহাম্মদ বেলাল, গিয়াস উদ্দিন, শহিদুল আলম, হারুনুর রশিদ, নুরুল আলম, চৌধুরী হাসান মাহামুদ হাসানি, মোহাম্মদ সলিম উল্লাহ, নাজমুল হক ডিউক, মোহাম্মদ জাবেদ, আব্দুর সবুর লিটন, মোহাম্মদ ইলিয়াছ, শেখ জাফরুল হায়দার চৌধুরী, নজরুল ইসলাম বাহাদুর, মোহাম্মদ জুবায়ের, আতা উল্লাহ চৌধুরী, আব্দুস সালাম, বাবু জহুর লাল হাজারী, হাসান মুরাদ বিপ্লব, পুলক কাস্তগীর, হাজী নুরুল হক, মোর্শেদ আলী, আব্দুল মন্নান, গোলাম মোহাম্মদ চৌধুরী, জিয়াউল হক সুমন, আবদুল বারেক, সালেহ আহমদ চৌধুরী, যুবলীগ নেতা দেবাশীষ পাল দেবু, ছাত্রলীগ নেতা নুরল আজিম রনি, জাকারিয়া দস্তগীরসহ আরও অনেকে।
তালিকা প্রকাশের পর সবচেয়ে বিস্ময় ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে একটি বিষয়, তালিকায় এমন একজন ব্যক্তির নাম রয়েছে, যিনি ইতোমধ্যে মারা গেছেন। চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের ৩০ নম্বর মাদারবাড়ি ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর আতাউল্লাহ চৌধুরী গত বছরের নভেম্বর মাসে মৃত্যুবরণ করলেও বহিষ্কার তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে ২২৭ নম্বরে। বিষয়টি তালিকা প্রণয়নে প্রশাসনিক গাফিলতি ও তথ্য যাচাইয়ের অভাবের অভিযোগকে আরও জোরালো করেছে।
তালিকায় বিএনপির নেতাদের নামও যুক্ত হওয়ায় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। তিন নম্বরে রয়েছে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির বর্তমান যুগ্ম আহ্বায়ক (দপ্তরের দায়িত্বপ্রাপ্ত) শওকত আজম খাজা। এ ছাড়া ৩৫ নম্বরে চকবাজার থানা ছাত্রদলের সাবেক সাহিত্য বিষয়ক সম্পাদক মো. বোরহান উদ্দিন এবং ২৯১ নম্বরে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা ছাত্রদলের সাবেক সদস্য নজরুল ইসলাম সোহেলের নাম রয়েছে।
বিএনপি নেতাদের একাংশের দাবি, এটি রাজনৈতিক ভারসাম্য দেখানোর একটি কৌশল, অন্যদিকে কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচনের প্রাক্কালে বিরোধী রাজনৈতিক তৎপরতা নিয়ন্ত্রণেরই অংশ এই তালিকা।
তালিকায় নগরের বহু আলোচিত ও চিহ্নিত শীর্ষ সন্ত্রাসীর নামও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে রয়েছেন সাজ্জাদ আলী প্রকাশ সাজ্জাদ, সাজ্জাদ প্রকাশ ছোট সাজ্জাদ, ছোট সাজ্জাদের স্ত্রী শারমিন আক্তার তামান্না, বার্মা সাইফুল, রায়হান, বোরহান, মোবারক হোসেন ইমন, হাড্ডি জনি, চুক্কু, ডেনডাইয়া, গিট্টু মানিক, টারজেন, গলাকাটা রইন্যা, অস্ত্র মিলন, নলা কাসেম, বাইক বাবু, সুমন চন্দ্র দাশ, পিচ্চি জাহিদ, হাত কাটা ইদু, কালা জাহিদ, কট নাজিম, ডাকাত ইউসুফ, বুইশ্যা, কার মাসুদ, কানা কুদ্দুস, সোর্স আনোয়ার, লাল বাদশা, পিচ্ছি কাওসার, লাল সাগর, পিচ্চি সাবু, কালা নোমান, মাছ কাদের, কানা মাসুদ, ঢাকাইয়া সুমন, ব্লেড রুবেল, ডাইল জাহেদ, কসাই সোহেল, ডিবি ফয়সালসহ আরও অনেকে। এদের কেউ বর্তমানে পলাতক, কেউ কারাবন্দি।
রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি, সন্ত্রাসী, চোর ও ছিনতাইকারীদের নাম একই তালিকায় থাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। অনেকের মতে, এতে প্রকৃত অপরাধীদের চিহ্নিত করার বদলে তালিকাটি এক ধরনের বিশ্বাসযোগ্যতা সংকটে পড়েছে।
নগরবাসীর একটি অংশ প্রশ্ন তুলেছেন, থানা থেকে অস্ত্র লুটের মতো গুরুতর ঘটনার আসামিরা এখনো গ্রেপ্তার না হলেও ২০২৪ সালের পর দায়ের হওয়া বহু বিতর্কিত মামলার আসামিদের দুষ্কৃতিকারী হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যেগুলোর অনেক ক্ষেত্রে এখনো তদন্ত সম্পন্ন হয়নি বা চার্জশিট দেওয়া হয়নি।
তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো দাবি করছে, পুলিশের ক্রিমিনাল ডাটাবেইজ বিশ্লেষণ করেই তালিকাটি তৈরি করা হয়েছে এবং তালিকাভুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো না কোনো অপরাধ সংশ্লিষ্টতার তথ্য রয়েছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ সূত্র জানিয়েছে, নগরবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অপরাধ দমনই এই বহিষ্কার কার্যক্রমের মূল উদ্দেশ্য। পরিস্থিতি বিবেচনায় এ ধরনের প্রশাসনিক পদক্ষেপ ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে এবং প্রয়োজনে তালিকা হালনাগাদ ও আদেশের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হবে।
এফএস