এইমাত্র
  • দেশ ছেড়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী
  • বঙ্গভবন নয়, এবার জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় হবে মন্ত্রিসভার শপথ
  • ১৭ ফেব্রুয়ারি সকালে এমপি, বিকেলে মন্ত্রিসভার শপথ
  • মন্ত্রিপরিষদ সচিব হলেন এম সিরাজ উদ্দিন মিয়া
  • ফলাফল বাতিল ও পুনর্নির্বাচন চান বিএনপি সমর্থিত ট্রাক প্রতীকের প্রার্থী
  • মার্চেই শুরু হচ্ছে ইয়ুথ ক্রিকেট লিগ
  • সাইবেরিয়ায় তেলের বড় খনির সন্ধান পেয়েছে রাশিয়া
  • ভবিষ্যতের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান: মির্জা ফখরুল
  • তারেক রহমানের শপথে শেহবাজ শরিফকে আমন্ত্রণের পরিকল্পনা
  • ডা. শফিকুর রহমান ও নাহিদ ইসলামের বাসায় যাবেন তারেক রহমান
  • আজ রবিবার, ১ ফাল্গুন, ১৪৩২ | ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
    দেশজুড়ে

    রোদে শুকানো মাছেই রপ্তানির নতুন দিগন্ত

    শাহীন মাহমুদ রাসেল, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট (কক্সবাজার) প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:২৯ এএম
    শাহীন মাহমুদ রাসেল, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট (কক্সবাজার) প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:২৯ এএম

    রোদে শুকানো মাছেই রপ্তানির নতুন দিগন্ত

    শাহীন মাহমুদ রাসেল, স্টাফ করেসপন্ডেন্ট (কক্সবাজার) প্রকাশ: ২৯ জানুয়ারি ২০২৬, ১১:২৯ এএম

    ভোরের আলো ফোটার আগেই কক্সবাজার শহর ছাড়িয়ে সমুদ্রপাড়ের পথ ধরে এগোলে নাকে প্রথম ধাক্কা দেয় তীব্র, চেনা এক গন্ধ। কারও কাছে অস্বস্তিকর, কারও কাছে জীবিকার ঘ্রাণ। সেই গন্ধ অনুসরণ করলেই পৌঁছে যাওয়া যায় নাজিরারটেকের বিশাল শুঁটকি মহালে যেখানে সূর্য, লবণহাওয়া আর মানুষের ঘামে তৈরি হয় হাজার কোটি টাকার উপকূলীয় অর্থনীতির এক অনন্য গল্প।


    সমুদ্রতীর ঘেঁষে প্রায় ১০০ একরজুড়ে বিস্তৃত নাজিরারটেক এখন দেশের সবচেয়ে বড় শুঁটকি উৎপাদনকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত।


    স্থানীয় ব্যবসায়ী ও উৎপাদকদের হিসাবে, শুধু চলতি মৌসুমেই এই মহালকে ঘিরে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকার বেশি বাণিজ্য হচ্ছে। পর্যটননির্ভর কক্সবাজারের অর্থনীতিতে শুঁটকি শিল্প যে কত বড় ভূমিকা রাখছে, মাঠে না এলে তা বোঝা কঠিন।


    শীতের মৌসুম শুরু হলেই নাজিরারটেক যেন এক বিশাল উন্মুক্ত কারখানায় পরিণত হয়। সারি সারি বাঁশের মাচা, জালের চাটাই আর খোলা বালুচরে ছড়িয়ে রাখা মাছ। কোথাও সদ্য ধোয়া মাছ রোদে তোলা হচ্ছে, কোথাও অর্ধশুকনো মাছ উল্টে দিচ্ছেন শ্রমিকেরা, আবার কোথাও বস্তাবন্দী হয়ে ট্রাকে উঠছে প্রস্তুত শুঁটকি।


    এখানে প্রতিদিনের কাজ শুরু হয় ভোরেরও আগে। অন্ধকার থাকতে থাকতে ট্রলার ও উপকূলীয় নৌকা থেকে মাছ নামানো হয়। শ্রমিকেরা দল বেঁধে মাছ বাছাই, কাটা, ধোয়া ও মাচায় তোলার কাজে নেমে পড়েন। সূর্য উঠতে না উঠতেই পুরো এলাকা হয়ে ওঠে কর্মচঞ্চল।


    শিল্প সংশ্লিষ্টরা জানান, নাজিরারটেকের শুঁটকি মূলত সনাতন পদ্ধতিতে তৈরি। গভীর সমুদ্র ও উপকূল থেকে ধরা মাছ পরিষ্কার করে রোদে শুকানো হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে একটি মাছ পুরোপুরি শুকাতে সাধারণত পাঁচ দিনের মতো সময় লাগে। টানা রোদ না থাকলে সময় আরও বাড়ে, আর অকাল বৃষ্টি হলে পুরো চালানই নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে।


    জানা গেছে, এখানে প্রায় ২৫টির বেশি প্রজাতির মাছ শুঁটকি করা হয়। এর মধ্যে রুপচাঁদা, ছুরি, কোরাল, লইট্টা, চিংড়ি, ফাইস্যা, শিলা ও নানা প্রজাতির ছোট সামুদ্রিক মাছ উল্লেখযোগ্য। প্রতিটি মাছের শুঁটকির আলাদা বাজার, আলাদা দাম।


    উৎপাদকরা বলেন, যেসব শুঁটকিতে লবণ কম ব্যবহার করা হয় বা একেবারেই দেওয়া হয় না, সেগুলোর চাহিদা এখন বেশি। এসব শুঁটকি তুলনামূলক স্বাস্থ্যসম্মত এবং স্বাদেও আলাদা- এমন ধারণা ভোক্তাদের মধ্যে তৈরি হয়েছে। ফলে দামও বেশি পাওয়া যায়। প্রতি মৌসুমে নাজিরারটেকে আনুমানিক ৫০ হাজার থেকে ৬০ হাজার টন শুঁটকি উৎপাদিত হয় বলে জানান ব্যবসায়ীরা। এই বিশাল উৎপাদন শুধু স্থানীয় বাজারের জন্য নয়, দেশের নানা প্রান্ত এবং বিদেশেও যায়।


    নাজিরারটেকের শুঁটকি মহালকে ঘিরে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে কয়েক লাখ মানুষের জীবিকা জড়িত। জেলে, শ্রমিক, পরিবহনকর্মী, আড়তদার, পাইকার, প্যাকেটজাতকারী- একটি বড় শৃঙ্খল এখানে কাজ করে। শ্রমিকদের বেশির ভাগই উপকূলীয় দরিদ্র পরিবার থেকে আসা নারী ও পুরুষ। তীব্র রোদে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মাছ উল্টানো, বাছাই করা, শুকনো মাছ গুছিয়ে বস্তাবন্দী করা- কাজগুলো সহজ নয়। অনেক সময় হাত-পা লবণাক্ত পানিতে ভিজে থাকে, ত্বকের সমস্যা হয়, তবু কাজ থামে না।


    অন্যদিকে জেলেদের জীবনও কম কষ্টের নয়। পর্যাপ্ত মাছের আশায় তারা দিনের পর দিন গভীর সমুদ্রে অবস্থান করেন। ঝড়ো হাওয়া, উঁচু ঢেউ, যান্ত্রিক ত্রুটি- সব ঝুঁকি নিয়েই মাছ ধরতে হয়। সেই মাছই পরে নাজিরারটেকের মাচায় শুকিয়ে রূপ নেয় শুঁটকিতে।


    একসময় শুঁটকির বাজার মূলত সীমাবদ্ধ ছিল প্রথাগত পাইকারি বিক্রিতে। কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ঢাকাসহ বড় শহরের আড়তে যেত পণ্য। কিন্তু গত কয়েক বছরে বাজারের ধরন বদলেছে।


    ব্যবসায়ীরা জানান, এখন অনলাইন প্ল্যাটফর্মেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ শুঁটকি বিক্রি হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমভিত্তিক ব্যবসা, ই-কমার্স সাইট- সবখানেই কক্সবাজারের শুঁটকির আলাদা চাহিদা তৈরি হয়েছে। পর্যটন মৌসুমে কক্সবাজারে আসা ভ্রমণকারীদের অনেকেই শুঁটকি কিনে নিয়ে যান। দেশীয় বাজারের পাশাপাশি রপ্তানিতেও বাড়ছে গুরুত্ব। 


    রপ্তানিকারকদের আশা, এ মৌসুমে হংকং, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, শ্রীলঙ্কা, সিঙ্গাপুর এবং মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে বড় চালান পাঠানো যাবে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের পাশাপাশি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশেই শুঁটকির বাজার রয়েছে।


    তাদের মতে, সম্ভাবনা যত বড়, চ্যালেঞ্জও কম নয়। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আবহাওয়ার অস্থিরতা শুঁটকি শিল্পের জন্য বড় উদ্বেগ। অকাল বৃষ্টি, ঘন কুয়াশা বা দীর্ঘসময় মেঘলা আকাশ থাকলে মাছ ঠিকমতো শুকায় না। এতে উৎপাদন ব্যাহত হয়, মানও কমে যায়।


    আরেকটি বড় বিষয় মান নিয়ন্ত্রণ। আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে স্বাস্থ্যসম্মত প্রক্রিয়াজাতকরণ, পরিষ্কার পরিবেশ, সঠিক সংরক্ষণ- এসব নিশ্চিত করা জরুরি। অনেক উৎপাদক এখন আধুনিক শুকানোর চাতাল, নেট কভার ও উন্নত প্যাকেজিংয়ের দিকে ঝুঁকছেন। তবে সবাই এখনো সেই সুবিধা পাননি।


    উপকূলীয় অর্থনীতির শক্ত ভিত্তি সব মিলিয়ে নাজিরারটেকের শুঁটকি শিল্প এখন শুধু একটি মৌসুমি কর্মকাণ্ড নয়, বরং উপকূলীয় অর্থনীতির একটি শক্ত ভিত্তি। পর্যটনের পাশাপাশি এটি কক্সবাজারের পরিচিতিকে দিয়েছে আরেকটি বাণিজ্যিক মাত্রা। রোদে শুকানো মাছের সারির দিকে তাকালে হয়তো অনেকেই শুধু গন্ধ বা দৃশ্যটাই দেখেন। কিন্তু এই মাচার নিচে লুকিয়ে আছে হাজারো পরিবারের স্বপ্ন, ঋণ শোধের লড়াই, সন্তানের পড়াশোনার খরচ আর নতুন ঘর তোলার আশা।


    সমুদ্রের ঢেউ যেমন থামে না, নাজিরারটেকের এই কর্মযজ্ঞও তেমনি চলতে থাকে মৌসুমের পর মৌসুম। সঠিক পরিকল্পনা, মান নিয়ন্ত্রণ এবং সহায়ক নীতি থাকলে ঐতিহ্যবাহী এই শুঁটকি খাত ভবিষ্যতে দেশের রপ্তানি আয় বাড়ানো এবং উপকূলীয় দারিদ্র্য কমাতে আরও বড় ভূমিকা রাখতে পারে।



    এসআর

    সম্পর্কিত:

    সম্পর্কিত তথ্য খুঁজে পাওয়া যায়নি

    Loading…